কমল থলি নিয়ে যাবার সময় বলে গেল, ‘পৌনে আটটার মধ্যেই আসছি।’
রোহিণী চিঠিটা চোখের সামনে ধরে দ্রুত ভেবে নিল। উৎপল তাকে মুশকিলে ফেলার জন্য রাশিফল তৈরি করার ঝামেলাটা ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে। ঠিক আছে, দেখিয়ে দেব ঝঞ্ঝাটে কাজ পারি কিনা। মহারানির পুরোনো সংখ্যা দেখে লাভ নেই। ধরা নাও পড়তে পারে, কিন্তু উৎপল যে বেনামা চিঠি সম্পাদককে লিখে তাকে অপদার্থ প্রমাণ করবে না তারও গ্যারান্টি নেই। ভালো করে টুকতেও জানে না, ভাষাটাসা বদলে, এটা ওখানে সেটা এখানে করে লেখা দাঁড় করাতেও শেখেনি—এই সব কথা যেন না শুনতে হয়।
সবথেকে ভালো হয় ইংরিজি ম্যাগাজিন থেকে টুকলে। মহারানি যারা পড়ে, তারা ইংরিজি অতশত বোঝে না, পড়ে না। কিন্তু তার কাছে যেসব ম্যাগাজিন আছে, তাতে তো রাশিফল থাকে না। তাহলে? আগে বাথরুম আর দাঁত মাজাটা তো সেরে নিই। ব্যায়াম করার জন্য আজ আর সময় দেওয়া যাবে না। দু—হাত তুলে শরীরটা টেনে, দু—পাশে বাঁকিয়ে আর হাঁটুতে নাক ঠেকিয়ে নমো নমো করে কাজটা সে সেরে নিল।
চায়ের জল বার্নারে চড়িয়ে রোহিণী দাঁত মাজতে মাজতে দরজা খুলে বারান্দায় এল। শুকিয়ে গেছে সায়া, ব্রা। এবার এ দুটো পরা দরকার। মুখ ধুয়ে চা বানিয়ে খেতে খেতে সে মনে করার চেষ্টা করল এই বাড়িতে, চটুল ধরনের কিন্তু গাম্ভীর্যের মুখোস— পরানো ইংরিজি ম্যাগাজিন কারা রাখতে পারে? সাতটি ফ্ল্যাটের থেকে ছাঁটাই করতে করতে অবশেষে দোতলার প্রৌঢ়া বিধবার ফ্ল্যাটটিকে সে অনুমানে প্রথম স্থান দিল।
বিধবার জন্য নয়, তাঁর যুবক বোনপো আর তার বউয়ের হাবভাবের, পোশাক—আশাকের কথা ভেবেই। টেপ ডেক আছে, প্রায় রাতেই পপ গান বাজায়। ঘরের মধ্যে হয়তো নাচে টাচেও। একটা সাদা মারুতি আছে। ভোরে দু—জনে জগ করতে বেরোয়। বোধ হয় কোনো মাল্টি ন্যাশনালে রাজেনের মতোই ম্যানেজমেন্টের জুনিয়র স্তরের একজিকিউটিভ। রাজেন ঠাট্টা করে এদের সম্পর্কেই বলে, ‘আওয়ার হোম—গ্রৌন ইউপ্পিস, ইয়াং আরবান প্রফেশ্যনালস অর্থাৎ এককথায় আপস্টার্ট, সোজা বাংলায় উঠাই—গিরাই।’ আপাতত, রাশিফল আছে এমন ইংরিজি ম্যাগাজিন যদি রাখে, তাহলে ওরা ইউপ্পি, উড়িপি, যা খুশি হোক, তাতে তার কিছু আসে যায় না।
ম্যাক্সি থেকে শাড়ি, চুলে ঝমাঝম চিরুনি, তারপর তিন মিনিটের মধ্যেই রোহিণী দোতলায় পিতলের পাতে ‘দত্তরায়’ লেখা দরজায় কলিং বেলের বোতামে আঙুল রাখল।
দরজা খুলল বউটিই। বয়স বাইশ—তেইশ, শীর্ণ দেহটি সোয়েট স্যুটে মোড়া। বোধ হয় জগিং সেরে কিছুক্ষণ হল ফিরেছে। কোমর পর্যন্ত খোলা চুল, লম্বাটে মুখ, গালে ব্রণর দাগ, সিঁথেয় অস্পষ্ট সিঁদুর, লম্বা নখে রং এবং চোখে প্রাথমিক বিস্ময় কাটিয়ে বিগলিত হাসি ফুটল। মেয়েটির মুখ তাতে মিষ্টি দেখাল।
রোহিণীর দ্বিতীয় একটা গলার স্বর আছে। খসখসে, চাপা, অনেকটা সর্দিধরা স্বরের মতো। শুনলে গা সিরসির করে। এই স্বরটা সে লোক বুঝে, খুব আধুনিক, উচ্চচ মহলে বিতরণ করে, সফিস্টিকেটেড, ইংরেজিতে কথা বলে গদগদ হয় এমন মানুষদের সঙ্গে কথা বলার সময় ব্যবহার করে। রাজেনের সঙ্গে প্রথম আলাপের সময় ব্যবহার করেছিল, পরে আর করেনি। ঠাট্টা করে রাজেন অনেক দিন বলেছে, ‘তোমার সেকেন্ড ভয়েসটা একটু বার করো তো, দারুণ সেক্সি লাগে।’
রাজেন যত ঠাট্টাই করুক, রোহিণী দেখেছে, শতকরা পঁচানব্বই ভাগ ক্ষেত্রে এই গলাটা কাজ দিয়েছে। যেমন এখন সে দ্বিতীয় গলায় বলল, ‘ভাই খুব মুশকিলে পড়ে গেছি, তোমাদের কাছে এমন কোনো ইংলিশ ম্যাগ আছে, যাতে স্টারস অ্যান্ড প্ল্যানেটসের পোজিশ্যনকে বেস করে ফোরকাস্ট, মানে…ইয়ে কী বলব…।’
‘রাশিফল?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ, আছে?’
‘আমি তো অত লক্ষ করি না, আপনি ভিতরে আসুন, আমি দেখছি।’
রোহিণী ভিতরে ঢুকল। এই বাড়ির সব ফ্ল্যাটের নক্সাই একরকম। ঘরের মাঝে নীচু টেবলটার নীচে তাক থেকে বউটি কতকগুলো ম্যাগাজিন বার করে রোহিণীর সামনে রাখল। প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল সে ওগুলোর উপর। সূচিপত্র দেখল, পাতা ওলটাল, কিন্তু বাঞ্ছিত জিনিসটি পেল না।
‘আচ্ছা, আমি ওকে জিজ্ঞাসা করে দেখি, বাথরুমে রয়েছে। ওর এসবে কিওরোসিটি আছে।’
অতঃপর একটা ম্যাগাজিনের পাতা ধীরে ধীরে ওলটাতে ওলটাতে রোহিণী কান খাড়া করে রইল। বাথরুমের দরজা দেখা যাচ্ছে না কিন্তু সে জানে ওটা কোথায়।
খট খট শব্দ এবং ‘এই শুনছ।’
বাথরুমের ভিতর থেকে হুসস ধরনের একটা শব্দ উঠল। তারপর চাপা স্বরে, ‘ওপরের সেই ভদ্রমহিলা এসেছেন।’ এবার সংক্ষিপ্ত একটা খ্যাক ধরনের শব্দ বেরিয়ে এল। ‘আরে সেই তিনতলার, যার হিপ সোফিয়া লোরেনের মতো সুইং করে বলেছিলে, সেই। …না না বেরোতে হবে না। উনি এসেছেন একটা জিনিসের খোঁজে, তুমি কী বলতে পারো…’
রোহিণীর কান ততক্ষণে বন্ধ হয়ে চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেছে। হাতের ম্যাগাজিনটার খোলা পাতায় তার দৃষ্টি আটকে।
একটা প্রবন্ধ, যার শিরোনাম অনুবাদ করলে দাঁড়ায়: ‘লালসার আগুনে ভস্মীভূত শিল্পীরা।’ লেখক সিধারথ সিনহা। কয়েকটা ছবি, তার মধ্যে একটা শোভনেশের আঁকা নগ্ন নারীর। ভারতের চারজন নামি নাট্যকার—পরিচালক, ফিল্ম অভিনেতা, ক্ল্যাসিকাল গায়ক আর শোভনেশকে নিয়ে লেখাটা। বোধ হয় উদাহরণ দেওয়ার জন্য এদের রাখা হয়েছে। তিনজনের ছবি রয়েছে শুধু শোভনেশেরই নেই। নিশ্চয় পায়নি, তাই নেই। বদলে ওরই আঁকা একটা ছবি ছেপেছে।
