রোহিণী চোখ খুলল। হাত বাড়িয়ে টেবল থেকে হাতঘড়িটা তুলে চোখের কাছে আনল। ছ—টা দশ! প্রায় লাফ দিয়ে খাট থেকে সে নামল। এত বেলা পর্যন্ত বিছানায় থাকা জীবনে পাঁচ—ছ—বারের বেশি ঘটেনি। নিজের দিকে ঘাড় হেঁট করে তাকিয়ে সে গায়ের ম্যাক্সিটা নাড়িয়ে নিল। ভিতরে কিছু পরা নেই।
আবার বেল।
দরজার দিকে যেতে অপাঙ্গে আয়নায় নিজেকে দেখে নিয়ে রোহিণী চুল ঠিক করতে করতে আই—হোলে চোখ রাখল। কী আশ্চর্য, অফিসের বেয়ারা কমল, অর্থাৎ কমলদা! এত সকালে? ছ্যাঁত করে উঠল তার বুকের মধ্যে! কারোর কিছু হয়নি তো? ম্যাক্সির গলার কাছটা টেনেটুনে যতটা সম্ভব খোলা জায়গাটা ঢেকে সে লক ঘুরিয়ে দরজা খুলল।
‘আরে কমলদা, আপনি?’
রোহিণী আর কিছু বলার আগেই কমল মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, ‘দিদি, কাল একটা ভুল হয়ে গেছে। ঠিক ভুল নয়, গলদই বলতে পারেন। আপনাকে দেবার জন্য প্রশান্তবাবু একটা চিঠি দিয়েছিলেন, খুব জরুরি চিঠি। রাত্রেই আপনার কাছে পৌঁছে দিতে বলেছিলেন। কিন্তু আমি আসতে পারিনি।’ খামটা সে রোহিণীর হাতে দিল।
‘ভেতরে আসুন।’
রোহিণীর পিছনে কমল ভিতরে এল। দু—জনে ডাইনিং টেবলে বসল। চিঠিটা পড়তে পড়তে তার ভ্রূ কুঁচকে উঠল। কমল সেটা লক্ষ করে বলল, ‘লেখাটা যে কী করে হারাল, কেউ বলতে পারল না। অথচ পরশু আমার হাতেই দুপুরে দিয়ে গেল, আমিও সেটা উৎপলবাবুর টেবিলে রাখলাম। কাল প্রেসে পাঠাতে গিয়ে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। সারা অফিস তন্ন তন্ন করে সন্ধে পর্যন্ত খোঁজা হল। আজ সকাল এগারোটার মধ্যে প্রেসে পৌঁছে দিতেই হবে। প্রশান্তবাবু চিঠি লিখে আমাকে বললেন, তুমি তো মানিকতলার দিকে চালতাবাগানে থাক, তোমার অসুবিধে হবে না যেতে। সোজা আগে সল্টলেকে গিয়ে এখুনি এটা রোহিণী দিদিকে দিয়ে তারপর বাড়ি যেয়ো। উনি যেন রাতেই লিখে রেখে দেন। তুমি সকালে ওর কাছ থেকে লেখাটা নিয়ে বেলেঘাটায় প্রেসে দিয়ে আসবে। কিন্তু আমি কাল আর আসতে পারিনি।’
করুণ মুখে কমল তাকিয়ে রইল। রোহিণী আবার চিঠিটা পড়ল। বিব্রত কণ্ঠে এবং চাপা বিরক্তি নিয়ে সে বলল, ‘কিন্তু আমি গ্রহ নক্ষত্র রাশিফলের কী জানি? আমাকে এসব লিখতে বলা কেন? আমার তো সকালে কাজ রয়েছে। রাতে একজনকে খেতে বলেছি, এখন আমি বাজার যাব।’
‘প্রশান্তবাবুকে উৎপলবাবুই বললেন, রোহিণী রাশিফল রেগুলার পড়ে না, মাথাও ঘামায় না, ওকেই লিখে দিতে বলুন। মহারানির পুরোনো তিন—চারটে সংখ্যা আর ইংরিজি বাংলা ম্যাগাজিনের থেকে এটা ওটা নিয়ে আধ ঘণ্টাতেই নামিয়ে দিতে পারবে।’
‘উৎপলবাবু নিজেই তো অফিসে বসে করে দিতে পারতেন, ‘খাবার—দাবার’ তো উনি এইভাবেই লেখেন।’ রোহিণী একটু ঝাঁঝের সঙ্গেই বলল। সে শুনেছে, উৎপল প্রায়ই ক্ষোভ জানায় এই বলে যে, রোহিণীকে দিয়ে কোনো কাজই করানো হয় না, শুধু গ্ল্যামারাস কভারেজ ছাড়া। ‘গঙ্গাবাবুর স্নেহের ধারাটা শুধু একদিকেই প্রবাহিত হয়।’ কথাটা প্রথম শুনে রোহিণীর মাথা গরম হয়ে গেছিল। গঙ্গাদাকে সে কিছু বলেনি, তবে নিজের থেকেই সে সম্পাদক প্রশান্ত হালদারের কাছে কাজ চেয়ে নেয়। ‘বসিয়ে মাইনে দেওয়া হচ্ছে’, এই ধারণাটা অফিসে চাউর হয়ে গেছে। বোধ হয় উৎপলেরই কাজ।
‘দিদি, কাল আমার মেজোছেলে ইউনিভার্সিটি যাওয়ার সময় বাসের ধাক্কা লাগে। মেডিকেল কলেজে ভরতি হয়েছে। ওকে দেখতে গিয়েছিলাম, বড্ড রাত হয়ে গেল তাই আর আসতে পারিনি।’
‘সে কী! কখন হল? ছেলের বয়স কত?’ রোহিণী চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। হাত—পা শক্ত হয়ে গেছে।
‘এই তো চব্বিশে পড়ল গত পৌষে। ইংরিজিতে এম এ পড়ছে। অফিস থেকে বেরোচ্ছি, তখন হন্তদন্ত হয়ে মেয়ে এসে খবরটা দিল। দুপুরেই হয়েছে। খুব সিরিয়াস নয়, তিনটে পাঁজর ভেঙেছে। অপারেশন হয়েছে, ভালোই আছে। আপনি লিখে ফেলুন, ততক্ষণে আমি আপনার বাজার করে আনি।’
‘না না, সে কী কথা। আমি লিখে ফেলছি। আপনি বসুন, চা করি।’
কমল নাছোড়বান্দা। বার বার বলতে লাগল, ‘ছেলে ভালো আছে, তার জন্য কোনো দুশ্চিন্তা এখন আর নেই। থলেটা দিন আর কী কী আনতে হবে বলুন, বাসে করে মানিকতলা গিয়ে বাজার করে এনে দিচ্ছি। বড়োজোর এক ঘণ্টার মধ্যেই ফিরে আসব।’
মায়া হল রোহিণীর। রোগা, দুবলা, কাঁচাপাকা দাড়ি ভরা মুখ। আধ ময়লা ধুতি আর ফিকে নীল হাফ শার্ট। অফিসের জরুরি কাজটা করতে না পারার জন্য যেন মরমে মরে আছে। তার জন্যই রোহিণীদির বাজার করা হবে না, এটা যেন আরও বেশি ওকে অপরাধী করে তুলেছে। এখন যেন হালকা হবে দিদির জন্য কিছু একটা উপকার করে দিতে পারলে।
‘আচ্ছা, থলি দিচ্ছি।’
রোহিণী ডিক্সনারির মধ্য থেকে একশো টাকার একটা নোট বার করে কয়েক মুহূর্ত ভাবল। চর্ব্য—চোষ্য রাঁধার সময় নেই, সময় থাকলেও উপায় নেই, উপায় থাকলেও চীনে বা মোগলাই তিন—চারটের বেশি সে জানে না। ছিমছাম হলেই হবে। রাজেন তো ভোজ খেতে চায়নি, শুধু তার হাতের রান্না খেতে চেয়েছে।
‘কমলদা, মাছ আনবেন। ভাজা খাওয়া যায় এমন, ভেটকি, বাগদা কী পার্শে কী তপসে। ফাইন সরু চাল এক কিলো, কড়াপাকের সন্দেশ দশ টাকার, দই আড়াই শো। একজনকে খেতে বলেছি, খুব হালকা রান্না করব। বুঝতেই পারছেন এক হাতে বেশি তো করে উঠতে পারব না।’
