‘পারবেন বাড়ির ঠিকানা বার করতে?’
‘আমার নাম গঙ্গা ব্যানার্জি। এই চল্লিশ লাখের শহরে একটা আলপিন হারিয়ে গেলে খুঁজে বার করে দিতে পারব, আর এ তো একটা আস্ত মানুষ। রিসেপশনিস্টকে খুঁজে বার করা কী খুব শক্ত, এইরকম ফিগার যার? ছোটোখাটো ফার্মে নিশ্চয় তুমি নেই?’
রোহিণী শুধু স্মিত হাসিতে প্রশ্নটা এড়িয়ে গেছিল। গঙ্গাপ্রসাদকে তারপর শোভনেশ টেনে নীচে নিয়ে যায়।
দিন দশেক পর রবিবার সকালে মা জানলা দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘রুনু, দ্যাখ তো গাড়ি করে কারা এল?’
রোহিণী জানলায় এসে দেখে, মোটর থেকে গঙ্গাপ্রসাদ নামছে, হাতে কাগজে মোড়া জিনিসটি বোধ হয় সেই ছবিটাই, গাড়ির মধ্যে বসে আছে শোভনেশ।
দরজা খুলে সত্যি সত্যিই বিস্মিত চোখে সে গঙ্গাপ্রসাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।
‘কী বলেছিলুম? কলকাতা শহরে তোমাকে খুঁজে বার করব ঠিক করলে, সেটা কারোর পক্ষেই এমন কিছু শক্ত কাজ হবে না।’
খাটে দুই হাঁটুতে মাথা রেখে অন্ধকারে রোহিণী বসে। স্মৃতির ঘর থেকে বেরিয়ে সে সুড়ঙ্গটায় এখন দাঁড়িয়ে। পা টিপে টিপে ছ—বছর আগের অতীত থেকে সে বেরিয়ে আসছে।
.
গঙ্গাদা আজ সকালে বললেন, ‘তাহলে তো ভয় পাওয়ার কথা নয়। এই তিরিশ চল্লিশ লাখ লোকের শহরে একজনকে খুঁজে বার করা কী সহজ ব্যাপার?’
আসলে বেশিরভাগ সাফল্যই হয়ে যাওয়ার ব্যাপার! সেদিন গঙ্গাদা তাদের বাড়িতে এসেছিলেন অনেকটা এইভাবেই। ঠিকানাটা পেয়ে গেছিলেন। হিমালয়ান পেইন্টসের কলকাতা অফিসে খোঁজ নিয়েছিলেন, রঞ্জন যোগলেকরের শ্বশুরবাড়িটা কোথায়? তার শালি কোথায় চাকরি করে? খুব সহজেই শুধু একটা টেলিফোনেই কাজটা হয়ে যায়। সুভাষ গায়েনের সঙ্গে দেখা, এটাও সেই হয়ে যাওয়ারই ব্যাপার। এমনকী, সিআইটি রোডটার নাম যে আচার্য সত্যেন বোস সরণি—এটা জানাও তো ওইভাবেই।
এখন ইচ্ছে করলে যে—কেউই তার ঠিকানা বার করে ফেলতে পারে। তাহলে তার নিরাপত্তাটা কোথায়?
রোহিণী অন্ধকার ঘরে পায়চারি শুরু করল। তার পায়ের শব্দে নীচের ফ্ল্যাটের লোকেরা, যদি ঘুমিয়ে না পড়ে থাকে, কী ভাববে? যা খুশি ভাবুক, তাতে তার কিছু আসে যায় না।
নিরাপত্তার কথা এবার ভাবতেই হবে, কিন্তু সেটা শোভনেশের ভয়ে নয়। বয়স, মেয়েদের যেটা সবথেকে বড়ো ঘাতক, একদিন তো দেখা দেবেই। ইদানীং মাঝে মাঝেই তার মনে হয়েছে, কতকাল সে একা এইভাবে চলতে পারবে? বয়স ক্রমশ বাড়বে। ধীরে ধীরে প্রৌঢ়ত্ব আসবে, তারপর বার্ধক্য, সে বুড়ি হবে। রোহিণী অবাক হতে হতেও ভয় পেল। তখন কে তাকে খাওয়াবে? এই ফ্ল্যাটে কতকাল আর গঙ্গাদা তাকে থাকতে দেবেন? কত বছর আর সে চাকরি করতে পারবে? ভাবতে ভাবতে রোহিণীর বুকের মধ্যে কনকনে একটা যন্ত্রণা উঠল। সে আবার বিছানায় শুয়ে পড়ল।
তাহলে আর রাজেনকে অপেক্ষায় রাখা ঠিক হবে না। এই শরীর সজীব তীক্ষ্ন সটান থাকতে থাকতেই নিরাপদ জায়গায় একে সরিয়ে রাখতে হবে। আজ ইডেনে বসে রাজেনকে সে যখন বলেছিল, ‘ধরে নিচ্ছি আমার কিছু ফিজিক্যাল অ্যাসেট আছে, কিন্তু কতদিন আর সেটা থাকবে? পদ্মপাতায় জলের মতোই তো মেয়েদের যৌবন।’ তখন সে দু—জনের মধ্যে বয়সের ব্যবধানটার কথা ভেবেই বলেছিল। পুরুষের লোভ তো মেয়েদের যৌবনের দিকেই। বউয়ের যৌবন ধসে পড়লে স্বামীরা ওপরের তুষার দত্তর মতো হয়ে যায়। রাজেনও হতে পারে, এইরকম আভাসই সে ওকে দিয়েছে।
কিন্তু এখন তার মনে হচ্ছে, বয়সটাকে বাধ্য হিসাবে দেখার কোনো যুক্তি নেই। তার থেকে কমবয়সি লক্ষ লক্ষ বাঙালি মেয়ের থেকেও সে বেশিদিন যৌবন ধরে রাখতে পারবে, এই প্রত্যয় তার আছে। রাজেনকে তার ভালো লাগে বললে কম বলা হবে, ওর সান্নিধ্য সে প্রার্থনা করে। রাজেনের ক্ষমতা আছে মন প্রসন্ন করে তোলার। স্ত্রী হিসাবে নিজেকে ভাবলে, ওর কাছে নিজেকে সমর্পণ করার চিন্তায় তার মনে আড়ষ্টতা আসে না, যেটা শোভনেশের সঙ্গে আসত।
রাজেনের শরীরে জোর আছে, পুরুষালি দেখতে, ভালো মাইনের চাকরি, শিক্ষিত তো বটেই। বনেদি বাড়ির ছেলে, সেটা চালচলনে বোঝা যায়। সবথেকে বড়ো কথা, সব কিছু জেনেই সে বিয়ে করতে চেয়েছে। কাল কি ওকে বলব রাতে খাবার জন্য? অনেক দিন সে গাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেছে, তিনতলায় উঠে দরজা পর্যন্তও এসেছে, কিন্তু ফ্ল্যাটের ভিতরে ঢোকেনি। রোহিণী তাকে একটু বসতে, এক কাপ চা খেয়ে যেতে অনুরোধ করেছে। রাজেন রাজি হয়নি। অদ্ভুত সংযমী প্রেমিক! ‘যতদিন না তুমি বউ হতে রাজি হচ্ছ, আমি ভেতরে যাব না।’ ছেলেমানুষের মতো অভিমান দেখিয়েছে। অথচ আমার হাতের রান্না খেতে চায়!
রোহিণী বালিশে মুখ চেপে হেসে ফেলল। রান্না খেতে গেলে যে ফ্ল্যাটে ঢুকতে হবে, বলার সময় সেই খেয়াল ওর ছিল না। কাল দুপুরে টেলিফোন করবে অফিসে। প্রথমেই ওকে এটা মনে করিয়ে দিতে হবে।
কাজের মেয়েটা পালিয়েছে, নিজেকেই কাল দোকান আর বাজার বয়ে আনতে হবে। কী রাঁধবে? নুডলসের কিছু? ভাতের কী ময়দার সঙ্গে খাওয়া যায় মাছের কী চিকেনের কোনো প্রিপারেশন? মহারানিতে ‘খাবার—দাবার’ বিভাগটা দেখে উৎপল। মেয়েদের নাম দিয়ে ও নাকি নিজেই লেখে। উৎপলের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
তার ঘুম আসছে এবার। শরীর আলগা হচ্ছে, চোখের পাতা ভারী হচ্ছে। উপরের ফ্ল্যাটে ঘড়ির কুক্কুটা দু—বার ডেকে উঠল। রোহিণী ঘুমিয়ে পড়ার আগে আগামীকালের জন্য করণীয় কাজগুলো পর পর মনে করতে চাইল। বাজার যাওয়া, অফিসে গঙ্গাদার কাছ থেকে জেনে নেওয়া, উনি পুলিশের কাছ থেকে যা জেনেছেন। রাজেনকে আর অপেক্ষা করানো নয়। এবং সব শেষে নিজেকে বলল, রোহিণী, ভয় পাচ্ছ কেন? এমন কিছু অসাধারণ নও যে, জীবন নিয়ে তোমাকে গোলমালে পড়তে হবে। লক্ষ লক্ষের মধ্যে নিজেকে মিশিয়ে দাও, তাহলে কেউ আর তোমায় খুঁজে পাবে না।
পাঁচ
কলিং বেল বাজছে।
