রোহিণীর গ্লাসধরা মুঠিটা শোভনেশ চেপে ধরে রেখেছিল কিছুক্ষণ। ‘নিন’ না বলে ‘নাও’, রোহিণীর কাছে সম্বোধনের এই বদলটা এড়াল না। ধীরে ধীরে তার চোখ নরম হয়ে আসে। ঠোঁটে হাসি ফোটে।
‘একটু ঢেলে দিন।’ সে গ্লাস এগিয়ে দেয়। শোভনেশ মাথা নাড়ে অসম্মতি জানিয়ে, বলে, ‘তোমার ছবি আমি আঁকব!’
শোভনেশ পিঠে হাত রাখল। রোহিণীর তখন মনে হয় নাতিগরম সেঁকের মতো হালকা চাঞ্চল্যকর একটা অনুভব তার শরীর স্পর্শ করেছে। হাতটা পিঠ থেকে নীচে নামছে তার দেহের কোমল বর্তুলতা জরিপ করতে করতে। শোভনেশের লম্বা হাত যতদূর নীচে নামতে পারে ততটাই পৌঁছে নিতম্বের উপর সফর করে আবার একইভাবে ঘাড় পর্যন্ত উঠে এল।
রোহিণী প্রথমে এত অবাক হয়ে পড়ে যে, হাতটা ঠেলে সরিয়ে দেবে, বা নিজেকে সরিয়ে নেবে, দুটোর কোনোটাই করতে পারল না। বাবা মারা যাবার পর তার দেহে এমন নিশ্চিন্তে কোনো পুরুষ হাত দেয়নি। বিক্ষুব্ধ কোনো প্রতিক্রিয়া তার মধ্যে ঘটল না। মেয়েদের প্রকৃতিদত্ত বোধ থেকেই সে বুঝেছে হাতটা নোংরা নয়। তার দেহকে এই হাত অসম্মান করছে না।
‘অ্যাভারেজ বাঙালি মেয়ের তুলনায় তুমি অনেক লম্বা। কত হাইট?’
‘পাঁচ—আট।’
‘মাই গড! ওজন?’
‘মাস ছয়েক নিইনি। আটান্ন থেকে ষাট কেজির মধ্যে বোধ হয়।’
‘ভাইটাল স্ট্যাটিসটিক্স নিয়ে কৌতূহল যদিও খুব প্রবল, তবু প্রশ্ন করব না। অনুমান করে নিয়েছি।’
‘এবার কিন্তু আমার হাত থেকে গ্লাস পড়ে যাবে।’
‘গ্লাস তো ছবি নয়!’
‘দুটোতেই কাচ আছে, দুটোই ভঙ্গুর।’
‘কিন্তু ভঙ্গুরতার মধ্যেই তো আনন্দ রয়েছে। হুইস্কি বা টোম্যাটোর রস বা নিসর্গচিত্র কোনোটাই অদরকারি নয়। তুমি কোনটা বেছে নেবে?’
‘ছবিটাকে মানে নিসর্গচিত্রকে, আপনি কোনটা বাছবেন?’
‘তোমাকে।’
‘আপনি বোধ হয় একটু বেশি খেয়ে ফেলেছেন।’
ঠিক এই সময়ই বেঁটে এবং ভীষণ মোটা একটি লোক, রোহিণী যাকে ছবির প্রদর্শনীতে একটা চেয়ারে বসে থাকতে দেখেছিল, তাদের দিকে এগিয়ে এল। বরং বলা যায়, গড়িয়ে এল। পরনে খয়েরি স্যুট, হাতে গ্লাস।
‘ওরে ব্যাটা, তুই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ফুসুর ফুসুর চালাচ্ছিস আর—।’ লোকটি থেমে গেল। ফ্যালফ্যাল চোখে রোহিণীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এ তো আমার থেকেও লম্বা!’
‘আমার কলেজ—দিনের বন্ধু গঙ্গাপ্রসাদ ব্যানার্জি, প্রেস আছে, দু—তিনটে ম্যাগাজিন আছে। গঙ্গা কী নাম রে সেগুলোর?’
গঙ্গাপ্রসাদ স্থিরভাবে দাঁড়াতে পারছিল না। জিভ আড়ষ্ট হয়ে গেছে। চোখ বিস্ফারিত।
‘নাম দিয়ে কী হবে য়্যা, যে নামেই ডাক না কেন গোলাপকে—এই তো ইনি, এনার নাম কী আমি জানতে চেয়েছি?’
‘আমার নাম রোহিণী।’
‘গঙ্গা, আমি এর ছবি আঁকব।’
‘সে কী রে শোভু। তোর যে একজন কে আছে, যাকে ন্যাংটো করে শুইয়ে বসিয়ে ছবি আঁকিস, আবার এঁকে কেন?’
রোহিণী এই প্রথম শোভনেশকে বিব্রত এবং বিরক্ত হতে দেখল। কথার বিষয়টা এড়াবার জন্য তাড়াতাড়ি শোভনেশ বলল, ‘বেশি খেয়ে ফেলেছিস গঙ্গা, এবার বাড়ি যা। বরুণা আজ ঝাঁটার শক্তিপরীক্ষা করবে তোর পিঠে।’
‘সেইজন্যই তো তোর কাছে এলুম। বাড়ি পৌঁছে দিবি চল, নীচে গাড়ি রয়েছে। বরুণাকে তুই ফেস করবি। যা যা বানিয়ে বলার বলবি। এনার সঙ্গে…হ্যাঁ ভাই, কী যেন নাম বললে?’
‘রোহিণী।’
‘রোহিণী—নক্ষত্র, চন্দ্রপত্নী তাই তো? আপনার সঙ্গে—তোমার সঙ্গে, অনেক ছোটো তো, তুমিই বলি—পরে আলাপ করব, এই নাও আমার কার্ড, ঠিকানা ফোন নম্বর সব পাবে।’
কোটের পকেট হাতড়ে গঙ্গাপ্রসাদ কার্ড বার করে রোহিণীকে দিল। ওকে স্থিরভাবে দাঁড় করিয়ে রাখার জন্য শোভনেশ ওর দুটো কাঁধ শক্ত করে ধরল।
‘লাগছে লাগছে ছাড়, ওরে বাবা আমি ঠিক আছি। আমার বডি, সোল, মেমারি, ইন্টালিজেন্স সব ঠিক আছে। এই রোহিণীর হাত থেকেই তো সেদিন ছবিটা পড়ে ভাঙল। কী, ঠিক বলেছি? মেমারি। তুই বললি ছবিটা ওকে প্রেজেন্ট করবি, আজও করিসনি। কী, ঠিক আছে মেমারি?’
অপ্রতিভ শোভনেশ তখন গঙ্গাপ্রসাদকে ধাক্কা দিয়ে বলল, ‘চল এবার, অনেক হয়েছে। গাড়িতে তুলে দিয়ে আসি।’
‘অনেক মোটেই হয়নি। ছবিটা ওকে কবে দিবি বল? আমি গিয়ে দিয়ে আসব। রোহিণী তোমার বাড়ির ঠিকানাটা দাও, আমি গিয়ে দিয়ে আসব।’
‘আপনি এত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? রোহিণী বিব্রত অথচ হাসিমুখ করে বলে। গঙ্গাপ্রসাদকে তার মজার লোক মনে হচ্ছে।
‘ব্যস্ত হব না? অ্যাঁ, ব্যস্ত হব না? শোভু বলল, হোয়াট আ বডি! ছবিটাকে কত গভীরভাবে দেখছে দ্যাখ। বাহ্যজ্ঞান রহিত একেই বলে। ছবি এদের হাতেই তুলে দিতে ইচ্ছে করে, আমি বললুম, দিয়ে দে প্রেজেন্ট করে। মনে থাকে যেন, আমি বললুম। ও বলল, কিছু মনে করবে না তো? বললুম, হ্যাঁ রে কী বললুম বল তো?’ গঙ্গাপ্রসাদ তেরচা চাহনিতে তাকাল শোভনেশের দিকে।
‘আপনার মেমারি বোধ হয়—’। রোহিণী হাসি চেপে মুখে উদবেগ ফুটিয়ে কথাটা বলতেই গঙ্গাপ্রসাদ আড়ষ্ট হয়ে গেল। দুলুনি বন্ধ করল। মনে হল, খোলসের মতো শরীর থেকে অপ্রকৃতিস্থ ভাবটা খসিয়ে দিচ্ছে। তীক্ষ্ন চোখে তাকিয়ে সে বলল, ‘রোহিণী তুমি কী কোথাও চাকরি করো? বিয়ে হয়েছে?’
‘বিয়ে হয়নি আর একটা প্রাইভেট ফার্মে রিসেপশনিস্ট রয়েছি।’
‘কোথায়?’
‘এই কলকাতাতেই।’
‘বলবে না? ঠিক আছে। জেনে রাখো, ঠিকানা বার করে তোমার বাড়িতে গিয়ে ওই ছবি দিয়ে আসব।’
