রোহিণী খবরের কাগজটা মেঝেয় ফেলে দিল। বেড সুইচ টিপে আলো নেভাল। জানলা দিয়ে বাইরের আলো এসে আবছা করেছে সিলিং।
ছ—বছর আগের একটা ঘরের সামনে থমকে গিয়ে সে ভিতরে ঢুকল।
.
ওল্ড বালিগঞ্জে হিমালয়ান পেইন্টসের গেস্ট হাউসের বিশাল অ্যাপার্টমেন্টে জামাইবাবু ককটেলে ডেকেছিল জনা চল্লিশ গণ্যমান্যকে। দোতলায় নীচু পাঁচিলঘেরা ছাদে সবাই জমায়েত। একদিকের দেওয়ালে ছ—সাতটা চীনা লণ্ঠনের টিমটিমে আলো ছাদটাকে আধো—অন্ধকার করে রেখেছে। টবের গাছে জোনাকির মতো হলুদ, নীল, টুনি জ্বলছে। উর্দিপরা বেয়ারারা কাবাব, চিজ, মাংসের শিঙাড়া, কাজুবাদাম আর সোডা, বরফ, রাম ও স্কচ হুইস্কির গ্লাস সাজানো ট্রে হাতে ঘুরছিল। হিমালয়ান পেইন্টসের কলকাতা অফিসের নানান স্তরের কর্তারা ছাড়াও ছিল সাংবাদিক, কবি, ছবির সমালোচক, ফিল্ম পরিচালক, ছবি আঁকিয়ে, ব্যবসায়ী এবং আরও কিছু লোক।
শোভনেশের ছবির প্রদর্শনীর সফল সমাপ্তির জন্য তার স্পনসরের দেওয়া পার্টি।
রঞ্জন আর সোহিনী অতিথিদের মধ্যে ঘুরে ঘুরে, যাদের কাউকেই প্রায় তারা চেনে না, হেসে হেসে, বহুকালের পরিচিত এমন মুখ করে আলাপ করে যাচ্ছিল। একদিকের পাঁচিলের ধারে আলো কম, ছায়া ছায়া একটা কোণে রোহিণী একা দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে ছিল টোম্যাটো জ্যুসের গ্লাস।
সকালেই মেধাকে শান্তিনিকেতন দেখার জন্য দিদি সেখানে তার এক বন্ধুর বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিল। দুদিন থেকে আসবে। মদ—টদ খেয়ে অনেকেই বেসামাল হয়ে বিশ্রী পরিস্থিতি তৈরি করে। যদিও সেসব ঝঞ্ঝাট সামলানোর জন্য লোক মজুত থাকে, তবু দিদি একদমই চায় না ছোটো ছেলেমেয়েরা এই ধরনের পার্টিতে থাকুক।
‘একা কেন?’
সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল শোভনেশ। রোহিণী একটু অপ্রতিভ হয়। যার জন্য আজকের অনুষ্ঠান, সেই লোকটি একধারে একা—দাঁড়ানো—হোস্টের শালি ছাড়া পরিচয় দেবার মতো কিছুই নেই—এমন একজনকে আলাপ করার জন্য বেছে নেওয়ায় সে কৃতার্থ বোধ করে। প্রদর্শনীতে ছবিটা তার হাত থেকে পড়ে যাওয়ার ঘটনাটা মনে তখনও টাটকা।
‘কাউকেই চিনি না জানি না, এই বেশ আছি।’ রোহিণী দুর্বল স্বরে কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে বলে।
‘সে কী! বিখ্যাত বিখ্যাত লোক সব এরা। চলুন আলাপ করিয়ে দিই।’ এই বলে রোহিণীর বাম বাহু মুঠোয় ধরে আকর্ষণ করে শোভনেশ।
‘না না।’ রোহিণী আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ‘আমার দরকার নেই আলাপ করে। হোস্টের শালি এই পরিচয়ে এঁদের সঙ্গে কথা বলে খুব স্বস্তি পাব না।’
শোভনেশের আঙুলগুলো জড়িয়ে রয়েছে তার বাহু। হয়তো ইচ্ছে করেই, কিন্তু রোহিণীর মনে হল ইচ্ছে করে নয়। পার্টি এখন প্রাথমিক স্তর ছাড়িয়ে ওঠার পথে। ছোটো ছোটো জটলায় ভাগ হয়ে গেছে এক—এক ধরনের মানসিকতার গণ্ডি। শুরুতে মৃদু নম্র কণ্ঠে যারা কথা বলছিল এখন তাদের গলা চড়ছে। বিলম্ব করে যারা গ্লাস মুখে তুলছিল, এখন তারা একটু ব্যস্ত হয়ে ট্রে থেকে ভরা গ্লাস তুলে খালি গ্লাস রাখছে।
‘আপনার দেবার মতো পরিচয় নিশ্চয় আছে, আর সেটা মুখে বলার দরকার হয় না। আপনি আপাদমস্তক একটি মেয়ে, এটাই সেরা পরিচয়।’
জবাব না দিয়ে রোহিণী স্মিতমুখে চুমুক দিল রসে। ‘আপনি কী খাচ্ছেন?’ শোভনেশ জানতে চায়। ‘টোমাটোর রস বোধহয়! কোনো মানে হয়?’
রোহিণী বুঝে ওঠার আগেই শোভনেশ তার গ্লাস থেকে খানিকটা হুইস্কি রসের মধ্যে ঢেলে দিল।
‘আগে কখনো খাননি তো?’
‘না।’ বিমূঢ় হয়ে গেছিল রোহিণী।
‘তাহলে আমার অনুরোধে আজ খাবেন।’
শোভনেশের স্বরে খানিকটা আবদার, খানিকটা অনুরোধ, খানিকটা হুকুম, ঘনভুরুর ছাউনির নীচে জ্বলজ্বলে চোখ, সাদা অসম্মান দাঁত এবং দীর্ঘ দেহটিকে সামনে ঝুঁকিয়ে ঝোড়ো চুলের মাথাটা তার মুখের কাছে রাখা। রোহিণীর আপত্তি অসাড় হয়ে গেছিল। সে গ্লাস তুলে চুমুক দেয়। একটু তেতো স্বাদ ছাড়া সেই রসের আর কিছু বদলায়নি।
‘ভালো মেয়ে।’ শোভনেশ তারিফ জানায় আর রোহিণীর মাথায় আলতো টোকা মারে, বন্ধুর মতো। ‘এইবার চোঁ চোঁ করে শেষ করে দিন।’
রোহিণী তাই করেছিল বলামাত্র। ‘আর একটা আপনার জন্য আনি, ধরুন এটা।’ শোভনেশ তার গ্লাসটা রোহিণীর হাতে গচ্ছিত রেখে চলে গেল এবং ফিরে এল দুটো গ্লাস হাতে। টোম্যাটোর রস আর নিজের জন্য হুইস্কি।
‘দিন গ্লাসটা আর এটা ধরুন।’
হুইস্কির গ্লাস তার সামনে এগিয়ে ধরা। সভয়ে রোহিণী প্রথমেই ভিড়ের দিকে তাকিয়ে দিদিকে খুঁজল। একবার যদি দেখতে পায়, তাহলে এই বয়সেও তাকে চড় খেতে হবে। তার হাতে ধরা শোভনেশের আধ—খাওয়া গ্লাসটা ছাদের পাঁচিলে রেখে চাপা স্বরে সে বলল, ‘না, সরিয়ে নিন।’
‘আচ্ছা আচ্ছা, এই দেখুন।’ গ্লাসে খানিকটা টম্যাটোর রস ঢেলে লাল করে দিয়ে শোভনেশ বলল, ‘ককটেল! কেউ আর বুঝতে পারবে না।’
‘না।’
কয়েক টন ওজনের দৃঢ়তা একটি শব্দের মধ্যে বোঝাই করে রোহিণী কঠিন চোখে তাকিয়ে থাকে। দিদির ভয়ে নয়। কেউ তাকে বাধ্য করবে, তা যতই মজা করে বলুক না কেন, এটা সে মন থেকে মানতে পারে না। তার ব্যক্তিত্বকে অগ্রাহ্য করে কেউ যদি ধরে নেয়, যা বলব তাই সে মানবে, তাহলে ভুল করবে।
শোভনেশও তাকিয়ে থেকেছিল তার চোখের দিকে, অবাক হয়ে। প্রায় তিরিশ সেকেন্ড এইভাবে ওরা ছিল। রোহিণী তার অপলক কাঠিন্য নরম করেনি। শোভনেশের চাহনিতে কিন্তু ক্রমশ প্রীতিভরা তারিফ ফুটে ওঠে। কথা না বলে সে প্রায় ছুটে গিয়ে আর একটা টোম্যাটো রস নিয়ে এসে এগিয়ে দিয়ে মৃদুস্বরে বলে, ‘নাও।’
