সেদ্ধ ডিম খেতে খেতে রোহিণী ভাবল, চাবিটা উপর থেকে চেয়ে এনে রজনীর কাছে রাখলে কেমন হয়! ওরা দু—জনে সন্ধ্যার মধ্যেই ফিরে আসে। দিনের বেলায় তো চাবির দরকার পড়বে না। নন্দার ভীষণ কৌতূহল আন্টির ব্যক্তিগত জীবন জানার জন্য। হয়তো ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে ফ্ল্যাটে ঢোকে। এটা ওটা ঘাঁটে।
আইসব্যাগ থেকে কিউবগুলো বার করে বাটিতে রেখেছিল। কিছুটা গলেছে। বাটি তুলে চুমুক দিয়ে জলটুকু খেয়ে সে স্নান করতে গেল। পশ্চিমে ছোটো বারান্দা, শোবার ঘর দিয়ে সেখানে যেতে হয়। অন্তর্বাসগুলো জলকাচা করে বারান্দার রেলিংয়ে মেলে দিয়ে সে রোজ যা করে না, বারান্দার দরজাটা আজ বন্ধ করে ছিটকিনি তুলে দিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াবার সময় ঘরের চারদিকে চোখ বুলিয়ে তার মনে হল, মেয়েদের বসবাসের জায়গা যতটা ছিমছাম পরিচ্ছন্ন হওয়া উচিত, ঘরটা মোটেই সেরকম অবস্থায় নয়। এতটা অগোছালো হয় না যদি দিন—রাতের জন্য কাজের লোক থাকত। একটু গুছিয়ে নিলে ভালো হয়। কিন্তু এখন আর শরীর বইছে না। চঞ্চলা মেয়েটা ঠিক কেন যে পালাল, কাল গৌরীর মা—র কাছ থেকে সেটা জেনে নিতে হবে।
কালকের জন্য আর কী কী করণীয় কাজ রইল? চিরুনি থেকে কয়েকটা চুল টেনে বার করে রোহিণী জানালায় গেল। ফুঁ দিয়ে আঙুল থেকে চুল উড়িয়ে জানলার পাল্লা বন্ধ করল। বিছানায় মাথার কাছেই জানালাটা, শীতকালে খুলে রাখলে ঠান্ডা লেগে যাবে। কিন্তু সব ঋতুতেই ঘরের জানালা খুলে সে বাইরে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
বাবাকে মনে পড়লেই ছোটোবেলার অনেক কথা, ঘটনা তার স্মৃতিতে জেগে ওঠে। মেয়েদের ইংরাজি বলা—কওয়া শেখানোর জন্য তাঁর চিন্তার আর শেষ ছিল না। রেডিয়োয় রাত ন—টার ইংরেজি খবর শোনা বাধ্যতামূলক ছিল। দুই বোনকে পুজোর অঞ্জলি দেবার ভঙ্গিতে রেডিয়োর সামনে বসতে হত, শুধু ইংরেজি উচ্চচারণ শেখার জন্যই নয়, পৃথিবীতে রোজ কত ঘটনা ঘটছে ওয়াকিবহাল থাকার জন্য। ‘শিক্ষিত লোকেদের সঙ্গে তা না হলে কথা বলবে কী করে? হাঁদা গ্র্যাজুয়েট হয়ে লাভ কী?’ খবর শেষ হলে বাবা ইংরেজিতে প্রশ্ন করতেন, ইংরেজিতেই উত্তর দিতে হত। অর্ধেক শব্দের মানেই বুঝত না রোহিণী, কিন্তু সোহিনী চমৎকার গুছিয়ে মেমসাহেবদের মতো উচ্চচারণে বলে দিত। বাবার চোখমুখ তখন জ্বলজ্বল করে উঠত গর্বে। ‘আমার এই মেয়েটারই হবে।’ কী হবে সেটা অবশ্য আর বলতেন না।
ইংরেজি খবরের পর, সাড়ে ন—টার মধ্যে শোওয়া আর ঠিক পাঁচটায় ঘুম থেকে ওঠা। তারপর পার্কে গিয়ে দৌড়ানো। বাবা হাঁটতেন জোরে জোরে, ডায়াবিটিস ছিল। ক্লাস এইটে পড়ার সময় স্কুল ম্যাগাজিনের জন্য রোহিণী প্রথম গল্প লিখে বাবাকে দেখায়, একটা ভিখারি মেয়ের ধনীগৃহে ভিক্ষা চাইতে গিয়ে তার লাঞ্ছনা ও অপমান ছিল বিষয়। বাবা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছিলেন, ‘আমার এই মেয়েটার ট্যালেন্ট আছে।’
মশা যেন আজ কমই মনে হচ্ছে। ঘরের আলো নিভিয়ে সে টেবল—ল্যাম্প জ্বালাল বেড সুইচ টিপে। খবরের কাগজটা নিয়ে বেডকভার সরিয়ে বিছানায় শুলো। মশারিটা আর টাঙাতে ইচ্ছে করছে না। বেডকভার দিয়ে গলা পর্যন্ত ঢেকে সে কাগজটা খুলে আবার সেই ছোটো খবরটায় চোখ রাখল।
গঙ্গাদা কাল সকালে বাসুদেবপুর থেকে ফিরে খোঁজ নেবেন। হয়তো রাইটার্সে যাবেন। যদি জেলভাঙা লোকটা সত্যিই শোভনেশ হয়, তাহলে? তিরিশ—চল্লিশ লাখ লোকের শহরে একজনকে খুঁজে বার করা সহজ নয় ঠিকই, কিন্তু গঙ্গাদাকে খুঁজে বার করতে তো ওর এক মিনিটও সময় লাগবে না। বাড়ি চেনে, অফিসও চেনে। গঙ্গাদা বলেছেন, তিনি কোনোরকম হদিশ দেবেন না, বরং পুলিশে ধরিয়ে দেবার ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেবেন। কিন্তু অফিসের অনেকেই তার এই ফ্ল্যাটের ঠিকানা জানে। তাদের কারোর কাছ থেকে তো জেনে নিতে পারবে। শোভনেশ তার সন্ধান পাবে অথবা পাবে না, এই উৎকণ্ঠাটাই সবথেকে ভয়ংকর। সারাক্ষণ কুরবে, মুহূর্তের জন্যও তাকে শান্তিতে থাকতে দেবে না।
‘যদি আপনি জানতেন, ওর মডেল মৃত বীণা চ্যাটার্জির সঙ্গে ওর দৈহিক সম্পর্ক আছে, তাহলে কী আপনি শোভনেশ সেনগুপ্তকে বিয়ে করতেন?’
‘না।’
এক সেকেন্ডও ভাববার জন্য সময় নেয়নি রোহিণী। উকিলের নয়, শোভনেশের মুখের দিকে চোখ রেখে সে জবাব দিয়েছিল কঠিন স্বরে।
‘কেন বিয়ে করতেন না? উনি তো ভারতখ্যাত আর্টিস্ট, ওনার ছবি তো বহু টাকায় বিক্রি হয়।’
‘হতে পারে, কিন্তু চরিত্রহীন লোকেদের আমি ঘৃণা করি।’ রোহিণী তখন দেখেছিল, তার কথা শুনেই দপ করে জ্বলে ওঠে শোভনেশের চোখ। হাত মুঠো করে বীভৎস দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বিড় বিড় করতে থাকে। সে ভয় পেয়েছিল। মনে হয়েছিল, কোর্ট ঘরটা যদি জনশূন্য হত শোভনেশ তাহলে ছুটে এসে তার গলা টিপে ধরত। ত্রাসের চাপেই সে একসময় জেরার মুখে বলে, ‘হ্যাঁ, আমার মনে হত, উনি আমাকেও গলা টিপে মারতে পারেন—একবার চেষ্টাও করেছিলেন।’
‘কেন করেছিলেন?’
কোর্টকে তা জানাবার আগে রোহিণী দেখেছিল, শোভনেশ দু—হাতের ফাঁদে আঙুলগুলো একটা অদৃশ্য গলায় জড়িয়ে, পিষে, ক্রমশই কঠিন করে ঝাঁকাচ্ছে।
মাথার মধ্যে উত্তাপ জমে উঠলে যা হয়, রোহিণীর চোখ থেকে ঘুম ছুটে পালাল। সে জানে, এখন আর ঘুমকে তাড়া করে ধরা যাবে না। সে জানে, কেননা এমন অশান্ত, উত্তেজক রাত সে বহুবার যাপন করেছে, এখন স্মৃতির দরজা খুলে তাকে ঢুকতে হবে একটা সুড়ঙ্গে। দু—ধারে সার দেওয়া ঘর। হাঁটতে হাঁটতে সে ঠিক করবে কোন ঘরটায় ঢুকবে। ঘরে ঘরে আলাদা আলাদা ঘটনা। আজও তো ঘটেছে অনেক কিছু। সেগুলোও নিশ্চয় কোনো ঘরে জমা হয়েছে, ভবিষ্যতে কোনো এক রাতে সেখানে সে ঢুকবে।
