ঠিক এইভাবেই সেদিন সে বসেছিল।
কলিং বেল একবার টুং করে বেজেই থেমে গেল। রোহিণী অবাক হল এবং অস্বস্তি বোধ করল। আবার! এত রাতে? কে হতে পারে? অপেক্ষায় রইল আবার বেজে ওঠার। একটা কিছু গায়ে চাপাতে হবে। ছেড়ে রাখা শাড়িটাই টেনে নিল।
ডিম অনেকক্ষণ সিদ্ধ হচ্ছে। বেশি শক্ত হলে খেতে বিশ্রী লাগবে। শাড়িটা জড়িয়ে রান্নাঘরে এসে বার্নার নিভিয়ে সে বেল বাজার জন্য আবার অপেক্ষায় রইল।
আর বাজছে না। এবার সে কৌতূহলী হয়ে পড়ল। এত রাতে তুষার দত্ত বাঁদরামো করবে না। তাহলে কে? পায়ে পায়ে দরজায় এসে আই হোলে চোখ রাখল। ফাঁকা সিঁড়ি, দেওয়াল। একটা লোকও নেই।
দরজা খুলে উঁকি দিল। তারপর নীচের দিকে চোখ পড়তেই হতভম্ব হয়ে বলে উঠল, ‘একি!’
তার খুঁজে না—পাওয়া ম্যাক্সিটা পাট করা অবস্থায় দরজার গোড়ায়। হৃৎপিণ্ডের ধড়ফড়ানিটা কমল, একটা বড়ো শ্বাস বেরিয়ে এল এবং ঠোঁট মুচড়ে হাসি ফুটল। এ কাজ অবশ্যই নন্দার। বেচারা লোভ সামলাতে পারেনি, বিবেকটাও। এখানকার সব ফ্ল্যাটেরই সদর দরজার লকটা এমনই ঝঞ্ঝাটের যে, বন্ধ করলে শুধু ভিতর থেকেই নব ঘুরিয়ে খোলা যায়। বাইরে থেকে দরজা খুলতে হলে চাবি চাই—ই। যদি ভিতরে কেউ না থাকে এবং চাবি সঙ্গে না নিয়ে তখন কেউ বাইরে আসে এবং দরজাটি যদি তখন বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সমূহ বিপদ। হয় দরজা ভেঙে ঢুকতে হবে কিংবা পাইপ বা কার্নিস বেয়ে বারান্দা দিয়ে ফ্ল্যাটে ঢুকে ভিতর থেকে দরজা খুলতে হবে নয়তো চাবিওয়ালা ডেকে চাবি বানিয়ে দরজা খুলতে হবে। এর প্রত্যেকটাই সময়সাপেক্ষ এবং ঝঞ্ঝাটের।
রোহিণী এখানে আসার পর একবার এইরকম ঘটনা ঘটেছিল। তার সামনের ফ্ল্যাটে বাসকারী এক তামিল দম্পতি, শ্রীনিবাসনরা চাবি সঙ্গে নিতে ভুলে গিয়ে সন্ধ্যায় বেরিয়েছিল। ভিতরে কেউ ছিল না। রাত্রে ফিরে বিপদে পড়ে। বিপদে রোহিণীও পড়ে, রাতের মতো তার ফ্ল্যাটে ওদের অতিথি হয়ে থাকতে বলে। একটিমাত্র বিছানা এবং মশারিও একটি। শ্রীনিবাসনরা শান্ত, ভদ্র, উচ্চচশিক্ষিত। রোহিণীর অসুবিধে বুঝে তারা রাতের মতো বেলেঘাটায় বন্ধুর বাড়িতে চলে যেতে চেয়েছিল। তাদের নিরস্ত করে সে উপরে যায়।
শোনামাত্র তুষার দত্ত খুশিতে টগবগিয়ে ওঠে।
‘দরজাটা ভেঙে দিলেই তো হয়, কিছু ভাববেন না, আমি ভেঙে দিচ্ছি।’
‘সে কী। দরজা ভাঙবেন?’
‘কেন আমি কি পারি না ভেবেছেন?’ খুবই উত্ত্যক্ত দেখাচ্ছিল তুষার দত্তকে। ‘শাল কাঠের তক্তা মাথা দিয়ে ভেঙেছি, লোহার পাটি দাঁতে চেপে দু—হাতে পাকিয়ে পাকিয়ে বিড়ে বানিয়েছি আর এ তো প্লাইউডের একপাল্লার দরজা! কাঁধ দিয়ে একটা ছোটো পুশ করব দেখবেন মড়াত করে একটা আওয়াজ হবে শুধু।’
‘দরজাটা রিপ্লেস করার টাকা দেবে কে?’
তুষার দত্ত গোলমালে পড়ে যায় রোহিণীর কথার টানে বাস্তব ভূমিতে নেমে এসে। চার—পাঁচ শো টাকা তো কম করে লাগবেই। তার পেশির বর্ম দুর্ভেদ্য হতে পারে কিন্তু টাকাপয়সা হিসাবের মল্লযুদ্ধে তুষার দত্ত সহজেই কুপোকাত হয়।
‘জানি, আপনি মড়াত কেন, পটাস করে দরজা ভাঙতে পারবেন কিন্তু আপনাকে এত রাতে আর কষ্ট করতে হবে না।’ রোহিণী প্রায় আবেদনই জানিয়েছিল। ‘মিসেস শ্রীনিবাসন আমার সঙ্গে থাকবেন, আপনি যদি মিস্টার শ্রীনিবাসনের একটু শোয়ার ব্যবস্থা করেন এখানে।’
‘নিশ্চয় নিশ্চয়, এতবড়ো সোফাটা তাহলে আছে কীজন্য। মশারি না টাঙালেও চলবে, মশা মারার ধূপ জ্বালিয়ে দিচ্ছি।’
ইংরেজির মতো বেশ ভালোই বাংলা বলতে পারে রজনী শ্রীনিবাসন। রাতে বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে রোহিণী এই শীর্ণকায়া তামিল বউটির সঙ্গে আলাপ করে জানতে পারে সে বি—কম, স্বামীর অফিসেই স্টেনোগ্রাফার আর সেই মাল্টি ন্যাশনাল সংস্থায় অ্যাকাউন্টসের একটা বিভাগের কর্তা কৃষ্ণমাচারি শ্রীনিবাসন। ফ্ল্যাট ভাড়ার এগারোশো টাকা দেয় অফিসই। ‘চাকরি না করলেও চলে, কিন্তু করবে না কেন, যদি আয় বাড়িয়ে কমফর্ট আর সিকিউরিটি বাড়াতে পারি। এখন ছেলেমেয়ে নেই, কিন্তু হবে তো। মেয়ের বিয়ের জন্য, আমাদের ব্রাহ্মণদের, অনেক টাকা লাগে।’ কোয়েম্বাটোরের মাঝারি সরকারি অফিসার রজনীর বাবা দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে জামাই সংগ্রহ করেছেন। ‘খুব সস্তাতেই বলতে হবে।’ রজনী আপ্লুত হয়ে বলেছিল। তখন রোহিণী মনে মনে ভেবেছিল, এই ফ্ল্যাট ভাড়া দিলে গঙ্গাদা এগারোশো টাকা মাসে মাসে পেতেন। তার জন্যই পাচ্ছেন না। সে কৃতজ্ঞ থাকল।
পরদিন সকালেই তুষার দত্ত চাবিওয়ালা ডেকে আনে। তখন একটা পরামর্শ সে রোহিণীকে দেয়: ‘দুটো চাবির একটা ফ্ল্যাটের বাইরে কোথাও রাখুন, তাহলে এইরকম দুর্ভোগে পড়তে হবে না।’
‘কোথায় রাখব?’
‘আমার কাছে রাখতে পারেন, অবশ্য যদি বিশ্বাস করেন।’
‘না না অবিশ্বাসের কী আছে। আমার চুরি করার মতো দামি জিনিস কিছুই নেই।’
.
একটা চাবি সে তুষার দত্তর বউয়ের হাতে দিয়ে এসেছিল। কিন্তু তারপর থেকে তার মনের গভীরে একটা অস্বস্তি মাঝে মাঝে খচখচ করে। সে কোথায় যেন অনাবৃত, অনিরাপদ হয়ে রয়েছে। যেকোনো সময় তার জীবনের ঢিলেঢালা গোপনীয়তা আক্রান্ত হতে পারে, ব্যক্তিগত অংশের অনেকটাই যেন হারিয়ে গেল। তার ব্যক্তিত্ব যেন এখন থেকে অন্যের হাতে কিছুটা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।
