শীলা মাথা নাড়ল।
‘দু—বছর আগে তিন হাজার।’
শীলার বিভ্রান্তি অব্যাহত। সে তাকাল অনন্তর দিকে।
‘কিছু জানিস?’
অনন্ত মাথা নাড়ল। বাবা খুব খরচে লোক নয়। ছেলেমেয়েদের জন্য কেনাকাটার বা খাওয়া—দাওয়ার বা বেড়ানোর জন্য খরচ করত না। নিজের জন্যও নয়। একজোড়া প্যান্ট আর একজোড়া হাওয়াই শার্ট, সারাবছর অফিসের জন্য ওই পোশাক। ফিতেওলা জুতো তিন বছর তো চলতই। মোজা থেকে সব ক—টা আঙুল বেরিয়ে থাকত।
.
বাবার এত টাকা তোলার কেন দরকার হল? ধার—দেনা ছিল কি?
অনন্তের কাছে সেটা তখন রীতিমতো রহস্যময় মনে হয়েছিল এবং বাড়ি ফিরে চেকটা আলমারির লকারে রাখতে গিয়ে প্লাস্টিকের মোড়কটা দেখে হঠাৎ তার মনে হয়েছিল বাবার পকেটে খামের মধ্যে যে চিঠিটা ছিল সেটা আজও দেখা হয়নি।
মোড়ক থেকে খামটা বার করে পকেটে রাখার সময় সে পিছন ফিরে দেখে ঘরে কেউ তাকে লক্ষ করছে কি না। ঘরে তখন অনু আর অলু ছাড়া কেউ ছিল না।
কেন যে তার মনে হয়েছিল চিঠিটা সবার সামনে পড়া উচিত নয়, তা সে আজ একুশ বছর পরও জানে না। কিন্তু অদ্ভুত অন্যায় খবর পাওয়া যাবে যেটা কাউকে বলার নয়, এমন একটা ধারণা সেই মুহূর্তে হয়েছিল। অন্যের চিঠি পড়া উচিত নয় এই বোধটাও তখন কাজ করছিল প্রবলভাবে।
বাড়ির কোথাও বসে সবার চোখ এড়িয়ে পড়ার জায়গা নেই। সন্ধ্যার পর পার্কের মাঝে আলোর নীচে গিয়ে বসল চিঠিটা পড়ার জন্য। দুটি তাসের আসর গোল হয়ে। তাদের থেকে কিছু দূরে সে বসেছিল। খামের উপর ঠিকানা ইংরেজিতে, অক্ষরগুলো মেয়েলি ছাঁদের। শেষবারের মতো সে ইতস্তত করেছিল চিঠিটা বার করার আগে।
চার ভাঁজ করা ছোটো চিঠি।
‘শক্তি,
আজও তোমার অফিসের সামনে রাস্তার ওপারে ছুটির সময় অপেক্ষা করেছি। এই নিয়ে পরপর চারদিন। তুমি বেরোলে দেখলাম, নিজের মনে হেঁটে স্টপে গিয়ে বাসে উঠে বাড়ি চলে গেলে। একবার মুখ তুলে তাকালেও না কোনোদিকে। তা হলে দেখতে পেতে এক অভাগিনীকে। আমি কী দোষ করলাম যে গত এক মাসে একবারও এলে না। লক্ষ্মীটি এসো। যদি অপরাধ করে থাকি পায়ে ধরে মাপ চাইব। এসো এসো এসো। ভালোবাসা নিয়ো। প্রণাম নিয়ো
ইতি
মিনু (১১ ডিসেম্বর)
এক নিশ্বাসে চিঠিটা পড়ে ফ্যালফ্যাল করে অক্ষরগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকেছিল মিনিট দুই। তারপর প্রথমেই সে ভেবেছিল, কে এই মিনু? বাবার সঙ্গে এর কী সম্পর্ক?
চিঠিটা সে তিনবার পড়েছিল আর ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারল এই পত্র—লেখিকার সঙ্গে তার বাবার কিছু একটা গোপন সম্পর্ক রয়েছে যার সম্পর্কে ঘুণাক্ষরেও তারা কিছু জানে না। ‘মিনু’ নামটি কখনো তাদের সংসারে উচ্চচারিত হতে সে শোনেনি। চিঠির বিষয় থেকে মনে হয় দু—জনের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক। এটা ভাবতেই সে মনে মনে অপরাধীর মতো কুণ্ঠায় জড়সড় হয়ে যায়। বাবার ব্যক্তিগত জীবনের একটা আড়াল করা দিক হঠাৎ পর্দা সরিয়ে দেখে ফেলার মতো লজ্জায় সে ভরে গেছল। আর সেই কুণ্ঠা এবং লজ্জার কারণ, চিঠিটা ছিঁড়ে ফেলতে গিয়েও সে কিন্তু ছিঁড়তে পারেনি। সে ভাবতে পারছিল না তার মা ছাড়াও আর কোনো মেয়েলোক বাবার জীবনে থাকতে পারে। তার মনে হয়েছিল বাবার এটা জঘন্য কাজ।
চিঠিটা তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়ে গেছল। পার্কে বসে তাসুড়েদের চেঁচামেচির মধ্যে বাবাকে দুশ্চরিত্র ভাবতে তার বাধছিল অথচ মন থেকে সায়ও পাচ্ছিল না। তখন তার কৈশোর বয়স। সে বার বার বাবার আচরণ, কথাবার্তার মধ্য দিয়ে খুঁজতে চাইল কোনো অসংগতি, অযৌক্তিক কাজ কিংবা মা—র সঙ্গে ঝগড়া, মনোমালিন্য পাওয়া যায় কি না।
কিছুই পায়নি। মা—র সঙ্গে কোনোদিন উঁচুস্বরে বাবা কথা বলেছে বা বিরক্তি প্রকাশ করেছে বা অবহেলা দেখিয়েছে এমন কোনো উদাহরণ সে সংগ্রহ করতে পারল না। খুব রেগে উঠলে তার চোয়ালের পেশি দপদপ করত কিন্তু মা—র জন্য একবারও করেনি। অনন্ত কোনোদিন মৃদু বা গাঢ়স্বরে দু—জনকে কথা বলতে বা চোখে চোখ রাখতে দেখেনি অথচ পরস্পরের প্রতি আচরণে তাদের খুঁত নেই। যন্ত্রের মতো নিখুঁত ছিল সম্পর্ক।
রাত্রে আঁচাবার সময় অনন্ত মাকে উনুনের আঁচ শিক দিয়ে খুঁচিয়ে নামাতে দেখে সাধারণভাবেই জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘মিনু বলে কাউকে চেনো?’
শীলা একবার মুখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘না।’ কয়েক সেকেন্ড পর আবার বলেছিল, ‘কেন?’
অনন্ত জবাব দেয়নি।
একুশ বছর পর চল্লিশের দিকে ঢলে—পড়া বয়সে মধ্যরাত্রে বিছানায় শুয়ে সে সেদিনের মতো আবার নিশ্চিন্ত হল একটা ব্যাপারে। চটির বাক্স হাতে ছিল বলে বাবা বাসের হাতল ধরতে পারেনি এই যুক্তিটা ঠিক নয়। বাবার সম্পর্কে একটা রহস্য জেনে যাওয়ার পর সেই রাতে অনেক কিছু ভাবতে ভাবতে তার মনে হয়েছিল চিঠিটা সম্ভবত সেইদিনই বাবার হাতে এসেছিল যেদিন মারা যায়। হয়তো বাবা মিনুকে এড়াবার জন্যই চলন্ত বাসে ওঠার চেষ্টা করেছিল কিংবা চিঠিটা পড়ে এতই চঞ্চল বা অন্যমনস্ক হয়ে গেছল…আর যাই হোক চটির বাক্সে হাতজোড়া হয়ে থাকার কারণটা, যা অবিনাশকাকা প্রায়ই বলেন এবং প্রতিবার শুনে বুকের উপর সে পাষাণভার বোধ করে, সেটা ঠিক নয়।
সেই রাতে পাষাণভারটা মন থেকে নেমে তাকে হালকা করে দেয়। চিঠিটা পড়ার জন্য সে আর নিজেকে অপরাধী মনে করেনি এবং সেটা আজও সে নষ্ট করেনি।
