রোহিণী প্রথমেই নিশ্চিন্ত হল, ডাকাতরা তার ফ্ল্যাটে আসবে না। ওরা খোঁজখবর করেই আসে। আর নিশ্চয় এটা জানবে যে, একটা খুদে ট্রানজিস্টর, দুটো সুটকেস কয়েকটা শাড়ি, যার মধ্যে সর্বোচ্চচ দামেরটি সাড়ে ছশো টাকার, একটা সিলিং ফ্যান, টেবল ল্যাম্প ছাড়া আর কিছু পাওয়া যাবে না। নগদ প্রায় সাতশো টাকা আছে ডিক্সনারির মধ্যে, খুঁজে বের করা খুবই শক্ত। শোভনেশের দেওয়া হিরের আংটি, কানের মুক্তোর টপ, এগুলোর কোনোটাই সে পরে না। আছে সুটকেশে একটা খামের মধ্যে। এর জন্য ফন্দিফিকির করে ডাকাতরা এলে তাদের মজুরি পোষাবে না।
আবার খসখস হল। রোহিণী কয়েক ধাপ নেমে এসে একতলার ল্যান্ডিংয়ে দাঁড়াল। ডাক্তারবাবুর ফ্ল্যাটের কলিংবেলে আঙুল রাখল। দরকার মনে করলেই টিপবে। উনি বৃদ্ধ, কিন্তু ওর চাকরটা বেশ বলিষ্ঠ। অন্যদিকের ফ্ল্যাটে এক মাড়োয়ারি পরিবার। প্রত্যেকের আনফিট শরীর, তা ছাড়া নিরীহ গোবেচারা ধরনের। ডাকাত শুনলে হয়তো চেঁচামেচি করবে, কিন্তু দরজা এঁটে।
লোডশেডিং হলে চলাফেরায় খুব অসুবিধে হয় শুনে গঙ্গাদা বলেছিলেন, একটা পেনসিল টর্চ ব্যাগে রেখে দিয়ো। টর্চ কিনেওছে। কিন্তু ব্যাটারি ফুরিয়ে যাওয়ায় সেটা টেবলে রেখে দেয়। ভুলে গেছে নতুন ব্যাটারি লাগাতে। একটা কাজ অবশ্য করা যেতে পারে, দারোয়ান বা তার বউকে ডেকে সঙ্গে করে উপরে ওঠা।
কিন্তু আর খসখস হচ্ছে না। চোর—ডাকাত হলে এতক্ষণ অপেক্ষা করত না। নেমে এসে তার পাশ দিয়ে ভালোমানুষের মতো বেরিয়ে যেত। রোহিণী আবার সিঁড়ি দিয়ে এক পা এক পা করে উঠতে শুরু করল। আর তখনই বাইরে মোটর থামার শব্দ হল।
সাহস পেয়ে সে দোতলা পর্যন্ত উঠল। তিনতলার সিঁড়িতে ঘুটঘুটে অন্ধকার। চোখ সইয়ে নিয়ে আবার উঠতে শুরু করল দেওয়ালে হাতে রেখে। ঠিক কোন ধাপটায় ল্যান্ডিং, সেটা বুঝতে পারছে না। একবার হোঁচটও খেল। ডান পা—টা সন্তর্পণে তুলে উপরের ধাপে ফেলতে গিয়ে সে আর সিঁড়ি পেল না ফলে সামনে ঝুঁকে পড়ে। ভারসাম্য রাখতে এক পা এগিয়ে দিতেই জুতোর ঠোক্কর লাগে নরম একটা জিনিসে।
রোহিণী এবং কুকুরটি একই সঙ্গে আর্তনাদ করে উঠল। তবে দু—জনের মুখ থেকে দু—রকম আওয়াজ বেরোয়। রোহিণী থরথর করে কাঁপতে থাকে আর কুকুরটি, বাইরের ফটকে যার আস্তানা, চোরের মতোই নীচে নেমে গেল।
একতলায় সুইচের শব্দ এবং সিঁড়ির সবকটি আলো জ্বলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চচাদের কণ্ঠস্বর ও দুমদাম পা ফেলার আওয়াজ ভেসে এল। চারতলার তুষার দত্ত সপরিবারে ফিরলেন।
.
রোহিণীকে ফ্যাকাসে মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রথমে ছেলে দুটি তারপর বড়ো মেয়ে নন্দা—যার বয়স ষোলো, তারপর একদা বডি বিল্ডার ও বেঁটেখাটো তুষার দত্ত—যিনি কলপ দিয়ে যৌবনকে চিরস্থায়ী করে রাখতে চাইছেন, এবং সবশেষে সিঁথিতে সিঁদুর লেপা ও চশমা পরা, আরতি নামে একটি চর্বির বস্তা, অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওদের কারোর সঙ্গেই রোহিণীর ভালো পরিচয় নেই। শুধু দু—তিনবার ওদের ফ্ল্যাটে গেছে জরুরি ফোন ধরার জন্য।
‘সিঁড়িটা অন্ধকার ছিল, বেকায়দায় পা—টা এমন মচকে গেল।’
রোহিণী কৈফিয়ত দেবার মতো স্বরে তাড়াতাড়ি কথাগুলো বলেই বুঝতে পারল, সত্যিই সে ভয় পেয়ে গেছিল। মুখে করুণ ভাব ফুটিয়ে সে হাসারও চেষ্টা করল।
‘পা ফেলতে পারছি না, তাই দাঁড়িয়ে পড়েছি।’
রোহিণী যদি জানত, কী সর্বনাশকে সে এই একটি বাক্যদ্বারা ডেকে আনছে, তাহলে মুখে চাবি দিয়ে রাখত।
‘হাড় টাড় ভাঙল নাকি? দেখি দেখি, কোন পা?’ তুষার দত্ত হাত বাড়িয়ে প্রায় হুমড়ি খেলেন রোহিণীর পায়ের গোড়ায়।
‘না না ভাঙেনি।’ রোহিণী দু—হাত মেলে ধরে ঝুঁকে পড়ল।
‘কী করে জানলেন ভাঙেনি?’ তুষার দত্তের হাত পৌঁছে গেল রোহিণীর ডান পায়ের পাতায়। ‘এই পায়ে?’
রোহিণী সিঁটিয়ে গিয়ে বলল, ‘বাঁ পায়ে।’
সঙ্গে সঙ্গে বাঁ হাতের আঙুলগুলো বাঁ পায়ের পাতাটা জুতো সমেতই আঁকড়ে ধরল। তারপর পাতা থেকে গোছ পর্যন্ত তুষার দত্তর অর্থপেডিক পরীক্ষা শুরু হল। জুতোটা আগেই খুলে নিয়েছিল, সায়াটা কিঞ্চিৎ তোলার চেষ্টা করতেই রোহিণী মরিয়া হয়ে বলল, ‘দেখুন তো, আপনি গুরুজন পায়ে হাত দিচ্ছেন, আমার কী যে লজ্জা করছে!’
.
‘তাই বলে পা—টা ভেঙেছে কিনা দেখব না।’
রেহাই পাবার জন্য রোহিণী সাহায্যের আশায় অসহায় মুখে ওর ছেলেমেয়ে এবং স্ত্রীর দিকে তাকাল। তারাও বিভ্রান্ত।
‘মনে হচ্ছে স্প্রেন হয়েছে, সম্পূর্ণ রেস্ট দরকার। পায়ে চাপ দিয়ে ওঠা তো উচিত নয়।’
‘পারব, পারব, এই ক—টা তো সিঁড়ি।’
রোহিণী ব্যগ্র স্বরে তিনতলার ল্যান্ডিংয়ের দিকে তাকাল। ‘বারোটা মাত্র, পারব।’
‘পারবেন তো নিশ্চয়, কিন্তু দুটো সিঁড়ি ভাঙাও এখন উচিত হবে না। আপনি বরং—’
তুষার দত্ত তার পরামর্শকে বাস্তবায়িত করার আগেই রোহিণী হাত বাড়িয়ে নন্দাকে তার বাঁদিকে টেনে আনল।
‘এই তো নন্দা, ওর কাঁধে ভর দিয়ে উঠে যাব।’
সকাল থেকে কী যে ঝামেলা! রোহিণী দাঁতে দাঁত ঘষল। এভাবে ভয় পাওয়ার কোনো মানে হয়? বাইরে, মনের ভেতরে সবখানেই তো অন্ধকার। আনাচে কানাচে কুকুর তো আছেই, তার উপর এইসব উপকারী জীবেরা। এখন ঘরে পৌঁছনো তো খোঁড়ার অভিনয় করে যেতে হবে।
