এতগুলি লোকের চোখ টানতে পারায় ছেলেটি ঈষৎ ফেঁপে উঠেছিল, এবার ফুলে উঠল রোহিণীর মনোযোগের কারণ হয়ে উঠতে পেরে।
‘বেলেঘাটায় ফুলবাগানের মোড় থেকে এই সামনে উলটোডিঙির মোড়, এক মাইল কী তার বেশিও হতে পারে, এতবড়ো রাস্তাটা!’
‘বলো কি ভাই। এতখানি রাস্তার নাম কেউ জানে না?’ এক মাঝবয়সি বিস্ময় এবং সন্দেহ প্রকাশ করলেন, ‘এই রাস্তার চারপাশে কত সাহিত্যিক, সাংবাদিক, পলিটিসিয়ান, মিনিস্টার থাকে, তারা কেউ জানে না?’
পিছনের সিট থেকে একজন ফোড়ন কাটল, ‘দাদা, বাঙালি আত্মবিস্মৃত জাতি, এটা মানেন তো? এই যে পলিটিসিয়ান মন্ত্রীদের কথা বললেন, ভোটের আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দেয় সেগুলো ভুলতে কতক্ষণ সময় নেয় বলুন তো?’
এবার কথাবার্তা অন্যদিকে মোড় নেবে। তাই রোহিণী ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘যার নামেই রাস্তা হোক, সেটা কেউ জানে না আর আপনি জানলেন কী করে?’
আপনি সম্বোধনে ছেলেটির ব্যক্তিত্ব অবশ্যই বেড়ে গেল, যেটা রোহিণীর অভিপ্রেত ছিল। বাস থেকে নেমে ওদের রক্ষণাধীনে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছনোর চিন্তাটা তার মাথায় এসে গেছে।
‘ফুলবাগানে শেতলা মন্দিরটার সামনে আর উলটোডাঙায় হাড়কো কমপ্লেক্সের গায়ে দুটো পাথর লাগানো আছে ছোট্ট দেওয়ালে, কলকাতার পুরমন্ত্রী বসিয়েছে। তাতে এই রাস্তার নাম বলা আছে—আচার্য সত্যেন বোস সরণি।’
‘অ্যাঁ!’ আত্মবিস্মৃত জাতির একজন কেউ আকাশ থেকে পড়লেন। ‘নামটা বলা উচিত ছিল, একদম মনেই পড়ল না।’
‘পুরমন্ত্রী যখন বসিয়েছে, তখন তো অফিসিয়াল নামই।’
‘অথচ কেউ তা জানে না। ভাই তুমি ঠিক বলছ?’ মাঝবয়সি লোকটি তার সন্দেহ স্পষ্টভাবেই প্রকাশ করলেন।
বাসটা বিধান শিশু উদ্যান স্টপ থেকে ছেড়েছে। ছেলেটি ভ্রূ কুঁচকে আহত স্বরে বলল, ‘সামনের স্টপই উলটোডাঙার মোড়। নামুন, আপনাকে দেখিয়ে দেব।’
ছেলেটি যেন এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। রোহিণীর দিকে আর দৃকপাত না করে সে দরজার দিকে এগোল, সঙ্গে অন্য ছেলেটিও। মাঝবয়সির গন্তব্য বোধহয় এখানেই, নামার জন্য তিনিও প্রস্তুত হলেন। রোহিণী দমে গেল। বাস থেকে নেমে সম্ভবত একাই তাকে হাঁটতে হবে। এই অল্পবয়সিরা সব ব্যাপারেই কেন যে উত্তেজিত হয়ে ওঠে, এটা সে বুঝতে পারে না। কিন্তু বয়সটা বছর পনেরো কম হলে সেও কি এখন বাস থেকে নেমে পড়ত? উত্তরের জন্য সে অবশ্য মাথা ঘামাল না। তার মাথায় এখন অনেক কিছু রয়েছে ভাবার জন্য।
রোহিণীর সঙ্গে একজনই শুধু নামল এবং নেমেই লোকটি বাঁদিকে হাঁটতে শুরু করল। প্রতিদিনই সে সিডি ব্লকে সেকেন্ড অ্যাভিনুয়ের এই চক্করটায় মিনি বাস থেকে নামে। তার গন্তব্য ডানদিকে। ফাঁকা রাস্তার দিকে তাকিয়েই তার মনে হল, ছেলে দুটি থাকলে ভালো হত। অন্ধকারটা ঝাপসা, তারই মধ্যে খামচা খামচা রাস্তার আলো।
কোন এক বাড়ির টিভি থেকে খবর পড়া শুরুর আগের জিঙ্গল বাজছে। খিদে তো পেয়েছেই, তাছাড়া চঞ্চলা নামে বছর বারোর যে মেয়েটাকে কাল গৌরীর মা কাজের জন্য এনে দিয়েছে, সে যে কী করছে এতক্ষণ কে জানে! ওকে দোকান থেকে কয়েকটা জিনিস আনতে দিয়েছে আর দশটা ডিম। কী করে গ্যাস বার্নার জ্বালাতে—নেভাতে হয়, কাল ও আজ তা শিখিয়ে বলে রেখেছে রুটি করে রাখতে। মেয়েটা যথেষ্ট চালাক আর কৌতূহলী। এই বাড়িতে তিনটি ফ্ল্যাটে গৌরীর মা ঠিকে কাজ করে। বাসন মাজা, ঘর মোছা আর কাপড় কাচার জন্য রোহিণী তাকে আশি টাকা দেয়। যেহেতু দুপুরের পর সে থাকে না তাই কাজটা একবেলার। তবে দোকান—বাজার থেকে কিছু আনতে হলে গৌরীর মাকে সে টাকা দিয়ে রাখে, পরের দিন সকালে কাজে আসার সময় কিনে নিয়ে আসে। দুষ্প্রাপ্য কেরোসিনও কালোবাজার থেকে এনে দেয়। রেফ্রিজারেটর থাকটা খুবই দরকার। তাহলে গ্যাস খরচ কমবে, একসঙ্গে তিনদিনের বাজার করে রেখে নিতে পারবে, দু—দিনের রান্নাও। গঙ্গাদার কাছে হাজার পাঁচেক টাকা ধার চাইবে ভেবেও চাইতে পারেনি। বিনা ভাড়ায় ফ্ল্যাটে থাকতে দিয়েছেন, চাকরি দিয়েছেন, এরপরও কিছু চাইতে তার লজ্জা করে।
বাড়ির সামনে নীচু পাঁচিল নীচু লোহার ফটক। সোজা সিমেন্ট বাঁধানো পথ বাড়ির শেষ পর্যন্ত গিয়ে ঘুরে গেছে পিছন দিকে। এই পথটায় রাত্রে গাড়ি রাখা হয়। তিনটি মোটর থাকে। পিছন দিকেই দারোয়ানের এবং জলের পাম্পের ঘর। চৌকো, সাদামাটা এই হালকা গোলাপি ও মাখন রং লাগানো বাড়িতে দুটি সিঁড়ি ষোলোটি ফ্ল্যাটের জন্য। রোহিণীর সিঁড়িটি ‘বি’ ব্লকে। তিনতলায় তিনশো ছয় নম্বর ফ্ল্যাট। পুব ও দক্ষিণ বন্ধই প্রায়। উত্তরের ঘরের জানলা খুললে দেখা যায় মাঠ, যেখানে এখনও বাড়ি ওঠেনি।
গেটের আলো পাঁচ দিন ধরে জ্বলছে না। আজও তাই। মোটর রয়েছে দুটি। একটি এখনও ফেরেনি। একতলার কোলপসিবল দরজার উপরে কম পাওয়ারের আলোটা জ্বলছে। ইলেকট্রিক মিটার বোর্ডগুলোর উলটোদিকে আটটি লেটার বক্স। রোহিণী অভ্যাসমতো বাক্সের কাচ দিয়ে দেখল, কোনো চিঠি নেই। দিদি অনেকদিন চিঠি দেয়নি।
সিঁড়ির দোতলার ল্যান্ডিংয়ের আলো জ্বলছে না। তিনতলারটাও নেভানো মনে হচ্ছে। যদি জ্বলত, তাহলে দোতলায় আলোর ছিটে পড়ত। রোহিণী থমকে দাঁড়াল। হৃদস্পন্দন সামান্য বাড়ল। আলো তো কালও জ্বলছিল। কোথাও কোনো শব্দ নেই। মনে হল একটা খসখসানি যেন সে শুনতে পেল। কাঠের মতো সে দাঁড়িয়ে থাকল। কোনো মানুষ কী? দারোয়ানের থাকার কথা গেটের কাছে। কিন্তু নেই। সিঁড়ির দরজা রাত এগারোটা পর্যন্ত খোলা থাকে। বাইরের যে—কেউই উপরে উঠে যেতে পারে। কাছাকাছি কোনো বাড়িতে কিছুদিন আগে ডাকাতি হয়ে গেছে। কলিংবেল টিপে দরজা খুলিয়ে জনাচারেক ফ্ল্যাটে ঢোকে। ছোরা দেখিয়ে বেঁধে রেখে গহনা, নগদ টাকা, ঘড়ি, টেপ রেকর্ডার এমনকী দামি ছ—টা শাড়ি পর্যন্তও নিয়ে গেছে। আলমারি খুলে শাড়ি ও গহনা বার করার সময় বাধা দিতে গিয়ে গিন্নি ছোরার খোঁচা খেয়েছে ঘাড়ে আর পেটে। নগদে ও জিনিসে সত্তর হাজার টাকা ডাকাতরা নিয়েছে।
