‘ওর একার পক্ষে কি সম্ভব? দু—জনেই পড়ে যাবেন, আমি বরং—’
তুষার দত্ত বোকামি করে আর সময়ক্ষেপ করল না। রোহিণীর প্রতিরক্ষা তৈরি হবার আগেই তার অরক্ষিত ডান বাহু জড়িয়ে ধরল বগলের তলা দিয়ে বাঁ হাত ঢুকিয়ে।
আরতি চুপ করে ব্যাপারটা দেখে যাচ্ছেন। ঠান্ডা গোবেচারা মানুষ। নীচুস্বরে কথা বলেন আর সংসারের কাজ করেন অবিরাম। রোহিণী অস্বস্তিভরে তার দিকে তাকাল। নন্দা তার বাবার এই কাজটা অনুমোদন করতে না পেরে বলল, ‘বাবা তোমায় আর ধরতে হবে না, আমার গায়ে যথেষ্ট জোর আছে।’
.
তুষার কটমটিয়ে একবার শুধু মেয়ের দিকে তাকাল। ‘এইবার আস্তে আস্তে পা ফেলুন। হ্যাঁ, হ্যাঁ, আহহ অত তাড়া কীসের।’
রোহিণীর ইচ্ছে করছে ছুটে তিনতলায় উঠে যেতে, কেননা তুষার দত্তর বাম বাহু তার পাঁজরের যে জায়গায় চাপ দিচ্ছে তাতে বিপন্নকে সাহায্য দেবার রীতিটা রক্ষিত হচ্ছে না। নন্দা তার অস্বস্তির কারণটা বুঝেই ডান বাহু ছেড়ে পিঠের উপর দিয়ে হাতটা বাড়িয়ে বাম বগলের নীচে ঢোকাতে গেল। কিন্তু তুষার দত্তর বাইসেপ দুর্ভেদ্য করে রেখেছে অঞ্চলটা। নন্দা একটু ফাঁক খুঁজছে হাতটা গলাবার জন্য, তুষার দত্ত আরও চেপে ধরেছে রোহিণীর পাঁজর। আরতি ওদের পিছনে, সামনে ছেলে দুটি।
রোহিণী ঠিক করল, আর নয় এবার কিছু করা দরকার। নন্দা বাবার ব্যাপারটায় লজ্জা পাচ্ছে এবং নিজের হাত রেখে একটা আড়াল তৈরি করতে চাইছে, এতে রোহিণী নিজেও কুঁকড়ে যাচ্ছে। এইটুকু মেয়ে, কী ভাবছে তার সম্পর্কে! বিরক্তিতে রাগে সে বাকি দুটি সিঁড়ি একলাফে পেরিয়ে ঘুরে দাঁড়াল।
‘আমার কিছুই হয়নি, মিছিমিছি আপনাদের কষ্ট দিলাম।’ রোহিণী নিজের দরজার কলিং বেলের বোতামে চাপ দিল।
‘এটা কোনো কষ্টের ব্যাপারই নয়।’ তুষার দত্ত এখন বিনীত ও ভদ্রলোক। ‘বরফ দেওয়া দরকার। আমি এক্ষুনি আইসব্যাগ আর বরফ আনছি।’
লোকটি পড়িমরি চারতলায় উঠে গেল, তা সঙ্গে ছেলে দুটিও। নন্দার মুখে লজ্জার কালো ছাপ। আরতি কিছুই বোঝেননি। উৎকণ্ঠিতভাবে বললেন, ‘বরফ দেওয়া ভালো। তাহলে আর ব্যথা হবে না।’
রোহিণী যথাসাধ্য হাসল এবং আবার বোতাম টিপল। তখন নন্দা ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘আন্টি, আপনার কাজের মেয়েটা বিকেলে চলে গেছে। আমি গেটে দাঁড়িয়ে এক বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছিলাম, তখন ও চলে যাচ্ছে। আমায় বলল, একা থাকতে ভয় করছে, আর আসবে না।’
‘সে কি! ভয় করছে? আশ্চর্য তো!’
‘তাই তো বলল। আমি বললুম, তিনতলায় আবার ভয় কীসের? নতুন বাড়ি, ভূতটুত এখনও বাসা বাঁধেনি, তা ছাড়া এত লোক রয়েছে। তা আমার কথায় আর কিছু না বলেই হাঁটতে শুরু করে দিল। মেয়েটার মাথায় বোধ হয় ছিট আছে।’
রোহিণী দমে গেল খবরটা শুনে। যাও বা একটা কাজের মেয়ে পাওয়া গেল, একদিনেই ভেগে পড়ল।
‘সঙ্গে করে কিছু নিয়ে যেতে দেখলে?’
‘না, খালি হাতেই তো গেল। তবে লুকিয়ে কিছু নিয়েছে কিনা জানি না।’
থলি থেকে চাবি বার করে রোহিণী দরজা খুলল। ‘আচ্ছা।’
মুখের হাসি মিলিয়ে যাবার আগেই সে দরজার পাল্লা বন্ধ করে দিল।
অন্ধকার ঘরে দাঁড়িয়ে রোহিণী চোখ বন্ধ করল। সারা দিন নয়, যেন সারা জীবন ঘুরে এসে এখন সে চটপট হিসেব—নিকেশ করে ফেলার কাজে ব্যস্ত। অনেকগুলো বছর পিছিয়ে না গেলে এখনকার এই অবস্থাটা কেন হল, তার ফর্দ তৈরি করা যাবে না। তবে একটা জিনিস এখনও তার অটুট আছে, তার মূলধন, তার দেহ। এটা পাঁচ মিনিট আগেও পরীক্ষিত হয়েছে। কিন্তু এই দেহই তাকে এখন এই অন্ধকার জায়গায় দাঁড় করিয়ে রাখল।
চোখ সরে যেতে সে মেঝেয় ঘষে পা বাড়াল। ডাইনিং স্পেস, ডান দিকে খাওয়ার টেবল। সোজা গেলে শোয়ার ঘর, বাঁ দিকেও একটা ঘর, যেটা ফাঁকাই পড়ে আছে। টেবলটার পাশে রান্নাঘর আর কলঘর। অনাবশ্যক আসবাব একটিও নেই। রোহিণী হোঁচট না খেয়ে সুইচ বোর্ডের কাছে পৌঁছল।
উত্তরের জানলাটা খোলা। অন্ধকারের ফ্রেমের মধ্যে চৌকো একখণ্ড সাদা ক্যানভাসের আভা। অনেকটা কুয়াশার মতো, যা ভোরবেলায় মাঠের দু—হাত উপরে জমাট হয়ে থাকে। ঝাপসা সাদা ছায়ার পিছনে ছমছম করা রহস্য স্থির হয়ে রয়েছে। ক্যানভাসটায় রয়েছে একটা কৃষ্ণচূড়া, যে নিষ্পত্র ডালগুলো দিয়ে লজ্জা ঢাকার কাজে ব্যর্থ হয়ে রাস্তার ইলেকট্রিক বাতির সামনে অপ্রতিভ অবস্থায়। রোহিণী আচ্ছন্নের মতো জানালার দিকে তাকিয়ে থাকল। অনেক কিছুই তার মনে পড়ে যাচ্ছে।
কলিং বেল বেজে উঠল। সুইচ টিপে ডাইনিংয়ের আলো জ্বালিয়ে সে একনজর জায়গাটায় তাকাল। চারটে ঠোঙা আর কিছু রেজগি টেবলে রয়েছে, যা সকালে ছিল না। চঞ্চলা তাহলে জিনিস কিনে দিয়েই কাজ ছেড়েছে। মেয়েটা বিশ্বাসী আর খাটিয়ে ছিল। চলে গিয়ে লোকসানই হল।
আবার বেল বাজল। লোকটা যে নাছোড়বান্দা টাইপের, এটা সে বহুদিন আগেই বুঝে গেছে। এখন বরফ এনেছে আর সেই বরফ পায়ে ঘষে দেবার জন্য বায়না জুড়বে। ব্যাটার বড্ড নোলা, এবার শাস্তি দিতে হবে, এই সিদ্ধান্ত নিয়ে রোহিণী ঊর্ধ্বাঙ্গ মুচড়ে কার্ডিগানটা থেকে নিজেকে বার করতে করতে এবং অন্যমনস্কতার জন্য শাড়ি যাতে বিস্রস্ত হয়ে কিছুটা বেআব্রু করে দেয় সেদিকে লক্ষ রেখে, সে দরজার আই হোলে চোখ রাখল।
যা ভেবেছিল তাই—ই, কিন্তু পেছনে গম্ভীর মুখে মেয়েও দাঁড়িয়ে। হাঁফ ছেড়ে কার্ডিগান আবার শরীরে সেঁটে নিয়ে রোহিণী দরজার অর্ধেকটা খুলল। তুষার দত্ত কিছু বলার আগেই সে তার হাত থেকে আইসব্যাগটা প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে বলল, ‘ওহ এনেছেন; দিন। ভালোই হল। ধন্যবাদ।’
