মে দিবসের ছুটির দিন, ঘটনার সময় রোহিণী ছিল মোমিনপুরে গঙ্গাপ্রসাদের বাড়িতে। দুপুরে নিমন্ত্রণ ছিল তাদের দু—জনের। শোভনেশ বলেছিল, গোয়াবাগানে তার একটা জরুরি কাজ আছে, সেখান থেকে সে একটার মধ্যে মোমিনপুর পৌঁছে যাবে। রোহিণী একাই ট্যাক্সি নিয়ে দশটা নাগাদ মোমিনপুর রওনা হয়ে যায়, বউবাজারে শোভনেশদের পঁচানব্বুই বছর—বয়সি বিরাট বাড়িটা থেকে। দুপুর একটার মধ্যে শোভনেশ না যাওয়ায় গঙ্গাপ্রসাদ ফোন করেন। ওধার থেকে কেউ রিসিভার তোলেনি। এরপর আরও চারবার ফোন করে হতাশ হয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘পাগলের বংশ তো, দেখো হয়তো গোয়াবাগান থেকে মোমিনপুর পর্যন্ত বোশেখ মাসে হেঁটে আসতে কেমন লাগে বোঝার জন্যই হয়তো—ও অপেক্ষা করে লাভ নেই, আমরা খেতে বসে যাই।’
খাওয়া শব্দটা মাথায় বুদবুদ কাটতেই হঠাৎ রোহিণীর মনে পড়ে গেল, কাল সে রাজেনকে রেঁধে খাওয়াবে বলেছে। দুপুরে ওকে ফোন করতে বলেছে মহারানির অফিসে। কীরকম একটা আবেগের ঢেউ তখন, রাজেনের ছেলেমানুষি কথাবার্তার ধাক্কায় তাকে এমনই দুলিয়ে দিল যে, সে তখন ঠিক করে ফেলে, রাতে ওকে খেতে বলবে। কিন্তু খাওয়াবেই যে, এমন কোনো কথা দেয়নি। দুপুরে ফোন করলে বলে দেওয়া যায়, ম্যাচ জিতে ফিরতে পারলে রেঁধে খাওয়াব কিংবা চলো, সন্ধ্যাবেলায় অ্যামবারে গিয়ে শুধুই তন্দুরি চিকেন গোটা দুই খাই।
রাত্রে নিমন্ত্রণ করে রাজেনকে ফ্ল্যাটে আসতে বলাটা কতটা উচিত হবে, এখনও সে তা বুঝতে পারছে না। শোভনেশের মতো রাজেন অ্যাগ্রেসিভ নয়। ভদ্র, মার্জিত ধরনের বিশেষণগুলো ওকে মানায়। একবার, মাত্র একবার হালকাভাবে জড়িয়ে ধরা, গালে গাল ঘসা, ঘাড়ে, গলায়, থুতনিতে মিষ্টি কামড়, বুকে মুখ চেপে ধরা আর দু—তিন সেকেন্ডের জন্য ঠোঁটের উপর ঠোঁট রাখা ছাড়া রাজেন কোনোরকম বাড়াবাড়ির চেষ্টা করেনি। একটু ফাজিল, হিউমার বোধটা প্রচুর পরিমাণে আছে, যেজন্য রোহিণীর ওর সান্নিধ্য ভালো লাগে। রাজেন ছটফটে, ছেলেমানুষ অথচ দরকারের সময় প্রবীণ হতে পারে। ওকে বাইরে থেকে কুনো স্বভাবের মনে হয়।
রোহিণী মাঝে মাঝে বিস্মিত হয়ে ভেবেছে, এখন ছেলে ক্রিকেট খেলে কী করে? খবরের কাগজে, ম্যাগাজিনে ক্রিকেটারদের যে ধননের কর্কশ কথাবার্তা, বন্য উদ্দাম আচরণের খবর পড়েছে, তাদের সঙ্গে রাজেনের তো কোনো মিলই নেই! অবশ্য তারা টেস্ট খেলে। রাজেন অতদূর পর্যন্ত যায়নি, যেতে পারবেও না। ‘পাগল, আমি টেস্টম্যাচ খেলব? বয়স কত হল জান?’ রাজেন একদিন বলেছিল, ‘তোমার সঙ্গে যখন প্রথম আলাপ হল, তখনই ঠিক করে ফেলি: গাওস্কার কি বিশ্বনাথের রাস্তা ধরে নক্ষত্র হওয়ার থেকে রোহিণী নক্ষত্রের আলোয় বরং পথ চিনে—না না, সেটা যে খুব সহজ আমি মোটেই তা বলছি না, রোহিণীর আলোয় পথ চিনে বরং তার কাছে পৌঁছে যাওয়ার সাধনায় লেগে থাকলে একশো টেস্ট খেলার সুখ আর যন্ত্রণা হয়তো একদিন পেলেও পেতে পারি।’
কথাগুলো মনে পড়ায় রোহিণী হেসে ফেলল। জানালা থেকে চোখ বাসের মধ্যে আনতেই দেখল, রড ধরে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি অল্পবয়সি ছেলে তার মুখের দিকে তাকিয়ে। ছেলে দুটিকে সল্টলেকে তার পাড়াতেই দেখেছে। কার্ডিগানের বোতাম খোলা রয়েছে। সে সন্তর্পণে কোলে রাখা ঝোলাটার মুখ খুলে ভিতরে কিছু দেখার ছল করে কার্ডিগানে টান দিল। ছেলেদের এই বয়সে যেসব কৌতূহল চিমটি কেটে যন্ত্রণা দেয়, রোহিণী সেই চিমটি থেকে ওদের রক্ষা করতে চায়।
‘কোথায় এলাম রে?’ একজন বলল। অন্যজন ঝুঁকে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে জায়গাটা বোঝার চেষ্টা করতে লাগল। রোহিণী হাসল, তবে মনে মনে। রাজেনের মতোই এ দুটো। বাস থেকে নেমে মিনিট দু—তিন হাঁটতে হবে। রাস্তাটা নির্জন। দু—ধারে ফাঁকা প্লট আর ঝোপ। আলোগুলো টিমটিমে। অনেকগুলো তো জ্বলেই না। বাড়িগুলোর দরজা জানলা বন্ধ। বাইরে কিছু ঘটলে কেউ বেরোবে না।
‘কাঁকুড়গাছির কাছাকাছি এসেছি।’
‘এই যে রাস্তাটা দিয়ে বাসটা যাচ্ছে, এর নাম জানিস?’
‘সিআইটি রোড।’
‘হল না।’
‘ভিআইপি রোড।’
‘দূর, সে তো দমদম এয়ারপোর্ট থেকে উলটোডিঙির মোড় পর্যন্ত।
‘তাহলে কী?’
‘তুই বল।’
‘বললুম তো দুটো নাম, আচ্ছা তাহলে নজরুল ইসলাম সরণি।’
‘তাও নয়। ওটা তো ভিআইপি রোডেরই অফিসিয়াল নাম।’
রোহিণী ওদের কথা শুনছিল, ধীরে ধীরে কৌতূহলী হয়ে উঠল। রোজই এই রাস্তা দিয়ে সে যাতায়াত করে, কলকাতার এটাই বোধ হয় সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ পথ, কেননা দমদমে প্লেন থেকে নেমে প্রধানমন্ত্রী থেকে মুখ্যমন্ত্রী, নানান দেশের প্রেসিডেন্ট বা রাজা—রানিকে কলকাতায় যেতে হলে এই পথ দিয়ে যেতেই হবে।
‘তোকে ক্লু দিচ্ছি। রাস্তাটা একজন বাঙালির নামে, বিশ্ববিখ্যাত তাঁর নিজের ক্ষেত্রে।’
‘তুই তো কুইজ ছাড়লি।’
রোহিণী লক্ষ করল, তার মতো বাসের অনেকেই ছেলে দুটির কথোপকথন শুনছে আর মনে মনে উত্তর হাতড়াচ্ছে এবং সেই সঙ্গে টের পেল তার মধ্যে যে টেনশনটা স্নায়ুগুলোকে টেনে রেখেছিল, ওই কৌতূহলই তা ঢিলে করে দিচ্ছে।
‘রবীন্দ্রনাথ?’
‘ওঁর নামে তো রাস্তা রয়েছেই। আমি যাঁর কথা বলছি, তাঁর নামে আর কোনো রাস্তা নেই।’
সারা বাস ভাবতে শুরু করল এবং রোহিণীও। হঠাৎ সে বলে ফেলল, ‘কতদূর পর্যন্ত রাস্তাটা?’
