তাকে উঠে দাঁড়াতে দেখে সুভাষ গায়েনও উঠল।
‘সময় নষ্ট হবে কেন, আপনি তো একটা জিনিস আবিষ্কার করেছেন। লাভই হয়েছে বলুন!’
প্রায় বিদ্রূপই শোনাল। রোহিণী টান টান সোজা হয়ে থুতনি তুলে বলল, ‘কথাটা ঠিক বোধগম্য হল না।’
খাপছাড়াভাবে সুভাষ গায়েন বলল, ‘আপনার ফিগারটা চমৎকার। আর্টিস্টরা মডেল হিসেবে এইরকমই চায়।’
কথাটাকে অগ্রাহ্য করে রোহিণী বলল, ‘কী জিনিস আবিষ্কার করেছি, বলুন সেটা?’
সুভাষ গানেয় দু—কদম পিছিয়ে ঘরের পর্দাটা তুলে ধরে দরজার পাল্লাটা ঠেলে খুলে দিল। তারপর তীব্র চোখে তাকিয়ে বলল, ‘ছবিটা শোভনেশ সেনগুপ্তরই আঁকা। আমি জানি, সে আপনার স্বামী, এখন জেলে।’
‘আপনি ওকে চেনেন!’ বিস্ময়ের ধাক্কায় রোহিণী নিজের ব্যক্তিত্বের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে রইল। তার মনের কাজকর্মের তাল কেটে গেছে। বিভ্রান্তিতে সে আচ্ছন্ন, বিমূঢ়।
সুভাষ গায়েন মাথা নাড়ল। দৃষ্টির তীব্রতা স্তিমিত হয়ে এসেছে। মুখ পাশে ফিরিয়ে বলল, ‘চিনি না। তবে চেনা থাকলে ও জেলে যেত না।’
‘কেন?’
সুভাষ গায়েন চুপ করে রইল। রোহিণী অধৈর্য হয়ে প্রায় চেঁচিয়েই বলল, ‘এ কথা বললেন কেন? বলুন? বলুন? আপনাকে বলতেই হবে!’
‘তাহলে আমিই জেলে যেতাম—ওকে খুন করে।’
‘সে কি!’
‘যাকে ও খুন করেছে, সে মীনার দিদি বীণা। তাকে আমি ভালোবাসতাম, বিয়ে করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু শোভনেশ যে তাকে নষ্ট করেছে, পচিয়ে দিয়েছে, সেটা আগে আমি জানতে পারিনি। যদি জানতে পারতাম, তা হলে—’
‘বীণা তো মডেলের কাজ করত।’
‘অভাবের সংসার, লুকিয়ে লুকিয়ে সে দু—তিনজন আর্টিস্টের কাছে কাজ করত। শেষকালে শোভনেশের এক্সক্লুসিভ ছিল, আর তখনই ওদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যে ছবিটা দেখলেন, ওটা বীণার। শোভনেশের উপহার, কিন্তু বাড়িতে ছবিটা আনতে লজ্জা পায়। এক বন্ধুর কাছে রেখে দিয়েছিল। বছর দুয়েক আগে সে মীনাকে ওটা ফিরিয়ে দিয়ে গেছে। ছেলেমেয়েরা বড়ো হচ্ছে তো।’
‘আমি এসব জানতাম না।’
‘কেন আপনি তো কোর্টে ট্রায়ালের সময় সাক্ষী ছিলেন। সেখানে বহু অজানা কথাই তো জানা গেছে।’
এতক্ষণে রোহিণী ধরতে পারল, কোথায় ওকে দেখেছে। কোর্টঘরে পিছনের দিকে একটা বেঞ্চে বসে কখনো আনমনে বিষণ্ণ চোখে, কখনো উদগ্রীব হয়ে সামনে ঝুঁকে ও সাক্ষীদের জেরা শুনত। বহু লোকই খুনের বিচার শুনতে যায়, রোহিণী ধরে নিয়েছিল, লোকটি তাদেরই মতো কেউ।
‘বিয়ের আগে আর পরেও বীণার সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না।’
‘শোভনেশ যদি আপনাকে বিয়ে না করত, তা হলে বোধ হয় বীণা বেঁচে থাকত।’
‘তার মানে? ওর মৃত্যুর কারণ আমি? এসব কী বলছেন?’
সুভাষ গায়েন মুখ ঘুরিয়ে একবার রোহিণীর দিকে তাকিয়েই শোবার ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল। দরজাটা যেরকম শব্দ করে বন্ধ হল, তার একটাই অর্থ। আর সে বেরোবে না।
কাজের মেয়েটি ভিতর থেকে বেরিয়ে এল অন্য দরজা দিয়ে। ‘আপনি কি বসবেন?’
‘না।’
চার
ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে লিফটের জন্য বোতাম টিপে রোহিণীর মনে হল, সুভাষ গায়েনকে একটা খবর দেওয়া হল না। বহরমপুর জেল থেকে যাবজ্জীবন দণ্ড পাওয়া একজন পালিয়েছে। শোভনেশ ওখানেই ছিল। হয়তো জেল ভাঙা কয়েদি সে—ই।
লিফট এসে গেছে। রোহিণী লিফটে ঢুকে ‘জি’ লেখা বোতামটা টিপে ভাবল, কিছু কিছু খবর যদি কেউ কেউ জানতে না পারে তাতে অনেক সময় শান্তি রক্ষায় সাহায্যই হয়।
মিনিবাসে ভিড় ছিল। শেয়ালদার প্রাচী সিনেমার স্টপে পৌঁছে রোহিণী বসার জায়গা পেল। অবশ্য তার আগে ব্রিফকেস কোলে নিয়ে বসা টাই—পরা এক সুদর্শন পুরুষ তাকে আসন ছেড়ে দিতে চেয়েছিল। সে রাজি হয়নি। ভাঙাচোরা কলকাতার রাস্তায় বাসে দাঁড়িয়ে যাওয়া বসে যাওয়ার থেকে, অনেক আরামের যদি না জানোয়ার—ঠাসা ভিড় থাকে।
বাসে উঠেই সে সব যাত্রীদের মুখগুলো একবার দেখে নেয়। ভয় পাওয়ার মুখটি নেই। যতবার বাস থেকে লোক ওঠানামা করেছে সে দরজার দিকে তাকিয়েছে। একটা নতুন অভ্যাসের মধ্যে সে যে ঢুকে যাচ্ছে, এটা রোহিণী বুঝতে পারছে। কিন্তু সে নিরুপায়।
শোভনেশের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে সুভাষ গায়েন নামে এক অস্বস্তি। লোকটার একটা কথা তাকে কামড়াচ্ছে এবং আজীবন তাড়া করে যাবে—’শোভনেশ যদি আপনাকে বিয়ে না করত, তা হলে বোধ হয় বীণা বেঁচে থাকত।’ কথাটার অর্থ সুভাষ গায়েন আর খুলে বলেনি। কী হতে পারে?
অর্থটা হয়তো এই, শোভনেশ যদি বীণাকে বিয়ে করত, তা হলে বীণা মরত না। কিন্তু ব্যাখ্যাটা রোহিণীর কাছে খুব সোজা, অগভীর এবং যুক্তিকর মনে হল না। তা হলে এইরকমও হতে পারে, পাছে বর্তমান স্ত্রী রোহিণী পূর্ব প্রণয়ের কথা জেনে ফেলে, তাই শোভনেশ শেষ করে দেয় বীণাকে। কিংবা বীণা তার প্রণয়ীর বিশ্বাসঘাতকতায় ক্ষেপে গিয়ে এমন একটা কিছু করবে বলে হুমকি দিয়েছিল বা করতে যাচ্ছিল, যা বন্ধ করার জন্য শেষ উপায় হিসাবে শোভনেশ এই কাজ করতে বাধ্য হয়।
বিচারের সময় শোভনেশ একদমই মুখ খোলেনি। উদ্দেশ্যটা কী, কেন সে খুন করল সে সম্পর্কে একটা কথাও তার মুখ থেকে পুলিশ বা উকিল জেরা করে বার করতে পারেনি। শুধু সে বলেছে, ‘আমি খুনি কি না প্রমাণ করার জন্য এত সময়, পরিশ্রম, অর্থ ব্যয় করার কী দরকার, যা শাস্তি দেবার দিয়ে দিন।’ কিন্তু যতক্ষণ না সাক্ষ্য—প্রমাণ পেয়ে আদালত নিশ্চিত হচ্ছে, ততক্ষণ তো আর সাজা দেওয়া যায় না। ‘হ্যাঁ, আমি বীণাকে খুন করেছি’, শুধু এই কথার উপরই কি প্রকৃত অপরাধী সাব্যস্ত হয়?
