সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলে রোহিণী কাঠ হয়ে বসে রইল। ছবিটার কিছুই প্রায় দেখার সময় পায়নি। চোখটা কতক্ষণের জন্য ছিল? পি টি উষা যতটুকু সময়ের জন্য ওলিম্পিক ব্রোঞ্জ হারিয়েছে ততটাই বোধ হয়।
ঘোর কালো পটভূমিতে ক্রমশ মিলিয়ে যাওয়া কালো রংটায় সামান্য ম্যাজেন্টার আভাস। দাবার মতো সাদা—কালো বরফি আঁকা পাথরের মেঝেয় বসা নগ্ন একটা নারী। দুই হাঁটু মুড়ে উঁচু করা, সামনে ঝুঁকে দুই হাতে হাঁটু জড়ানো এবং মুখটি জোড়া হাঁটুর উপর। স্তন দুটি ঊরুতে চেপে বসানো। ছবিটি আঁকা পাশ থেকে। মাথা থেকে মেঝেয়—রাখা নিতম্বের তলদেশ পর্যন্ত অর্ধ—জ্যা টানা ধনুকের মতো তুলির রেখা—রোহিণী এই রেখার সঙ্গে পরিচিত। বরফি কাটা পাথরের মেঝেটার সঙ্গেও তার পরিচয় আছে।
‘আপনি মহারানি থেকে এসেছেন?’
রোহিণী এই নিয়ে আজ কতবার যে চমকে উঠল! কোলে রাখা থলিটা আঁকড়ে সে মুখ তুলে তাকাল। লোকটি সাড়ে ছয় বা সাত ফুট লম্বা। তার মনে হল, কোথায় যেন একে দেখেছে!
‘হ্যাঁ।’
‘আপনার নাম?’
শীর্ণ, পাটকাঠির মতো। গলাটা লম্বা এবং সামনের দিকে বাড়ানো, কাঁধ দুটি অল্প ঝুঁকে থাকায়, এই ধবধবে ফরসা, বছর পঁয়তাল্লিশের লোকটিকে কুঁজো দেখাচ্ছে। পরনে ধুতি আর হাতাওয়ালা পাঞ্জাবি, আজকেই পাট ভাঙা হয়েছে। মুখটা যেন তার চেনা মনে হচ্ছে, কিন্তু কোথায় যে দেখেছে ঠাহর হচ্ছে না।
‘রোহিণী সেনগুপ্ত।’
‘সেনগুপ্ত!’ লোকটির স্বরে কেমন যেন একটা কর্কশ আবরণ সেনগুপ্ত শব্দটিকে ঘিরে ফুটে উঠল।
‘আমি মীনার ম্যানেজার, পিআরও, এমনকী গার্জেনও বলতে পারেন।’ চেয়ারে বসার পর লোকটি নিজের পরিচয় দিল। ‘আমার নাম সুভাষ গায়েন’ তারপর রোহিণীর মুখে বিস্ময় লক্ষ করে বলল, ‘পাশাপাশি বাড়িতে আমরা থাকতাম। ওকে ছোটোবেলা থেকেই চিনি।’
‘কোথায়?’
‘জোড়াবাগানে।’
‘এখনও কী—’
‘না। মীনারা ভাড়া থাকত। ওর বাবা ছিল নিমতলার কাঠের দালাল। যখন ওর বছর দশেক বয়েস, বাবা মারা যায়। খুব কষ্টের মধ্যে পড়ে। ওরা উঠে যায় পাড়া থেকে।’
‘কোথায়?’
‘যেখানেই যাক, আপনার লেখার জন্য তার দরকার হবে না নিশ্চয়।’ শিষ্ট স্বরে বললেও রূঢ়তার চাপা ঝাঁঝ চাপতে পারেনি। রোহিণীর মাথার মধ্যে উত্তাপ জমে উঠল। কথা বলা শেখেনি, অথচ নাকি অভিনেত্রীর পিআরও! ভেবেছে মহারানি ধন্য হয়ে যাবে মীনাকে ফিচার করে? ইডিয়টটাকে বুঝিয়ে দিতে হবে, পাবলিসিটি ছাড়া মীনার মতো থার্ড গ্রেডের অ্যাকট্রেসের লাইনে টিকে থাকা অসম্ভব, যতই অ্যাওয়ার্ড পাক না কেন।
রোহিণীর মুখভাব লক্ষ করছিল সুভাষ গায়েন। মৃদু স্বরে বলল, ‘জীবনের সব কথাই কি প্রকাশ করা যায়?’ লোকে ওর অভিনয় জীবনের, বর্তমান জীবনের সম্পর্কেই ইন্টারেস্টেড, তাই তো? আপনি এর উপরই লিখুন, এটাই আমরা চাই। অতীতে তা অনেকের অনেক কিছুই ঘটেছে, সে সব ভুলেও গেছে বা ভুলে যাবার চেষ্টা করেছে। আপনিই বলুন, আপনি কি অতীতের সব ব্যাপার লোককে বলতে রাজি আছেন?’
রীতিমতো অভব্য! কী করে একজন অপরিচিতা মহিলাকে এভাবে ইঙ্গিত দিতে পারে যে, গোপন করার মতো ব্যাপার তার জীবনে আছে? রোহিণী তার বিরক্তি ও আপত্তি মুখভাবে ও কণ্ঠস্বরে সচেতনভাবে জাহির করল।
‘আপনার সঙ্গে কয়েক মিনিটের পরিচয়, এর মধ্যেই বুঝে ফেললেন আমার অতীত কেমন ছিল? আপনি কী মুখ দেখেই অতীত পড়ে ফেলতে পারেন?’
‘না, তবে কারোর কারোর পারি।’
একটা জবাব ঠোঁটে এসে গেছল রোহিণীর। কিন্তু কীরকম একটা খটকা লাগছে তার। এখানে শোভনেশের আঁকা ছবি ঘরে টাঙানো। কেন, কীভাবে এল? কোথাও থেকে কিনে এনে টাঙিয়েছে কি? পয়সা দিয়ে কেনা ছবি এই ধরনের লোকেরা পাঁচজনকে দেখাবার জন্য বাইরে রাখে, শোবার ঘরে রাখবে না। কেউ উপহার দিয়ে থাকলেও বাইরেই রাখবে। শ্লীল—অশ্লীল নৈতিক প্রশ্নেই কি লোকচক্ষুর আড়ালে রেখেছে? তা হতে পারে না। নীতিবাগীশরা ন্যুড ছবি শোবার ঘরে তো দূরের কথা, ঘুঁটে রাখার জায়গাতেও রাখবে না। তা হলে? কীভাবে এল ছবিটা?
লোকটা এত সাহস পেলে কোথা থেকে? শোভনেশের সঙ্গে কি কখনো পরিচয় ছিল? ও কি জানে শোভনেশ তার স্বামী, যে একটি স্ত্রীলোককে খুন করেছে, যাবজ্জীবন সাজা পেয়েছে। তাই কি এমন কায়দা করে, ঘুরিয়ে সেটা জানিয়ে দিল?
‘আমার অতীত বলতে পারেন?’ প্রায় চ্যালেঞ্জের সুরে রোহিণী বলল।
তার মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে সুভাষ গায়েন। রোহিণী লক্ষ করল লোকটির চোখের মণি সামান্য ধূসর। নাকের ডগা নীচের দিকে বাঁকানো। ঠোঁটের কোণ মুচড়ে রাখা। মুখটাই যেন একটা মুখোস।
সুভাষ গায়েন ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। রোহিণীর তার একবার মনে হল, কোথায় যেন একে সে দেখেছে। কোথায়, কোথায়? ওর নিজের উপর রাগ ধরতে শুরু করল। এত কম তার স্মৃতি!
‘আমায় কোথায় যেন দেখেছেন, কিন্তু মনে পড়ছে না, তাই তো? মৃদু স্বরে বলল সুভাষ গায়েন।
রোহিণীর মুখ জ্বালা করে উঠল। অপ্রতিভ বোধ করেও সে বলল, ‘হ্যাঁ।’
সুভাষ গায়েন হাসল। কিন্তু হঠাৎ প্রসঙ্গ বদল করে বলল, ‘মীনার ফিরতে দেরি হবে, কত দেরি হবে বলা শক্ত। আপনি কি অপেক্ষা করবেন, না অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে আর একদিন আসবেন?’
‘সেটা এতক্ষণ বলেননি কেন!’ রোহিণী তার বিরক্তি জানিয়ে দিল এবং ক্ষোভও। ‘মিছিমিছি বসে থেকে সময় নষ্ট করলাম।’
