‘আপনাকে চা কি কফি দেব?’
‘না।’
‘কোল্ড ড্রিঙ্কস?’
‘না। উনি কখন আসবেন, কিছু বলছেন কি?’ ভিতরে কোথাও ফোন বেজে উঠল।
‘বলেছেন ফিরতে যদি দেরি হয়, তা হলে একটু যেন অপেক্ষা করেন।’
তৃতীয়বার বাজার মুখে রিং বন্ধ হয়ে গেল। কেউ রিসিভার তুলেছে। তার মানে কেউ ভিতরে রয়েছে। রোহিণী শুনেছে, মীনা চ্যাটার্জি একাই থাকে, অবিবাহিতা। বছর চারেক আগে এক গুজরাটি ব্যবসায়ী শিয়ালদা কোর্টে মামলা তুলে মীনাকে তার স্ত্রী অভিহিত করে ষাট হাজার টাকা গহনা অপহরণের দায়ে অভিযুক্ত করেছিল। সেই মামলার ফল খবরের কাগজে আর বেরোয়নি।
পর্দা সরিয়ে মেয়েটি ভিতরে চলে গেল। রোহিণী লক্ষ করল, ভিতরে যাবার পর সে দরজাটা আধখোলাই রেখে দিল। মহারানির সম্পাদক প্রশান্ত হালদারের কাছ থেকে মীনা সম্পর্কে কিছু আগাম তথ্য লিখে নিয়েছিল সে। রোহিণী ঝুলি থেকে ডায়েরি বইটা বার করে, ঝালিয়ে নেবার জন্য সেটা খুলল।
অফিসিয়াল বয়স ছাব্বিশ। তার মানে কি ত্রিশ? ছবিতে যা দেখেছে বা ফিল্মে, তাতে কিছু বোঝা যায় না। মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসেছে, এমন রোলেও গত বছর ওর ছবি রিলিজ করেছে। মোটামুটি মানিয়েই গেছে। মীনা এখন বয়সের এমন একটা অঞ্চলের মধ্যে, যেখানে বয়স নিরলস ও কঠিন যত্ন পেলে থমকে থাকে।
রোহিণী নিজের কথা ভাবল। বোধ হয় সেও এখন এই অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু কতদিন থাকবে? রাজেন বলেছে শরীরটাই সব নয়। ও আবেগপ্রবণ। শোভনেশ বলেছিল, শরীর ছাড়া মেয়েদের আর আছে কী? সেও মাঝে মাঝে আবেগের বশবর্তী হত, কিন্তু রাজেনের মতো এত কোমলতা সহাকারে নয়। শোভনেশের রূঢ়তার একটা আকর্ষণ ছিল, ওর নির্যাতনের ধরনে আদিম একটা—
রোহিণীর মনে হল, কেউ যেন তাকে লক্ষ করছে। আড়ষ্ট হয়ে উঠল তার পিঠ আর বুকের পেশি। মাথার মধ্যে শীতল হয়ে রক্তস্রোত শিরদাঁড়া বেয়ে কোমর পর্যন্ত নেমে এল। সে আড়চোখে তার ডান দিকের দরজার দিকে তাকিয়ে দেখল। পাল্লা ইঞ্চি দুয়েক ফাঁক। কাটা পর্দা একবার নড়ে উঠল। কেউ ফাঁক করে দেখছিল বোধ হয়। অথচ যখন সে ঘরে ঢোকে, দরজাটা তখন কিন্তু বন্ধই দেখেছিল।
কে? শোভনেশ?
ভয় পেয়ে মাথাটা খারাপ হল নাকি? রোহিণী নিজেকে ধমকাল। এখানে শোভনেশ আসবে কী করে? এটা তো মীনা চ্যাটার্জির ফ্ল্যাট। ওর সঙ্গে শোভনেশের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে কি? ছ—বছর আগেও, যখন মীনা অ্যামেচার নাটক দলের সামান্য অভিনেত্রী ছিল, তখন কোনো সম্পর্ক যদি থাকত, তা হলে সে জানতে পারত। আসলে এই নিস্তব্ধ ঘরে একাকী বসে থাকার আর মনে মনে শোভনেশের কথা ভাবার জন্য বোধ হয় সামান্য ব্যাপারেই তার ভয় লাগছে। দরজাটা হয়তো হাওয়ায় খুলে গেছে। পর্দাটা হয়তো পাখার হাওয়ায় নড়েছে।
রোহিণী আবার পর্দার দিকে তাকাল, নড়ছে না। এক পয়েন্টে পাখা ঘুরলে অত ভারী কাপড়ের পর্দা নড়বে কেন? ঠিক তেমনি, শোভনেশই বা এখানে হাজির হবে কেন? বহরমপুর থেকে পাঁচ—সাত ঘণ্টায় আসা গেলেও এবং মীনার সঙ্গে আগে থেকে পরিচয় থাকলেও গত ছ—টা বছর তো জেলের বাইরের পৃথিবীর ঘটনার কিছুই ওর জানার কথা নয়। কত কী বদলে গেছে, সে কোথায় চলে গেছে, কী করছে সে সব জানবে কী করে? মীনা তো দু—বছর হল এখানে বাস করছে। শোভনেশ কী তা জানবে? তা হলে সে এখানে এসে উঠবে কী করে? তা হলে সে সল্টলেকে তার ফ্ল্যাটের খবরও তো জানে না।
রোহিণী যুক্তিগুলোকে আঁকড়ে ধরে কিছুটা হাঁফ ছাড়ল। সকালে খবরটা পড়ার পর থেকেই কী যে এই শোভনেশ—আতঙ্ক তাকে পেয়ে বসেছে! মানে হয়? সে নিজেকে সহজ করার জন্য উঠে পড়ল। ব্র্যাকেটে রাখা অ্যাওয়ার্ড আর সুভেনিরগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে দেখতে দেখতে তার চোখ ডান দিকের দরজার দিকে সরে গেল। হঠাৎই একটা অন্যায় কৌতূহল তাকে পেয়ে বসল। ঘরে কে রয়েছে?
হাতখানেক সরে গিয়ে হাত বাড়িয়ে পর্দাটা ফাঁক করল। এমনভাবে সে দাঁড়াল, যেন কেউ হঠাৎ এসে পড়লে সে হাতটা চট করে নামিয়ে জিনিসগুলোকে দেখার ভান করতে পারে।
দরজাটা ইঞ্চি তিনেক ফাঁক হয়ে রয়েছে। জমকালো নকশাদার বেডকভারে মোড়া একটা খাটের কিছুটা, ড্রেসিং টেবল আর এয়ারকুলারের কিছুটা আর যেটির আধখানা সে দেওয়ালে দেখতে পেল তাতে তার ভ্রূ কুঁচকে উঠল। এবং কৌতূহল অবশেষে ভব্যতার শেষ সীমা ছাড়িয়ে গেল।
কাচ বাঁধানো ছবিটার আধখানা সে দেখতে পাচ্ছে। পায়ের পাতা, হাঁটু আর হাঁটুতে রাখা একটা মুখ, যেটা ঝাপসা। শোভনেশের আঁকা ন্যুড একনজরেই চেনা যাবে শুধু মুখটা দেখলেই। কুয়াশার মতো ঝাপসা সাদা ছায়ার পিছনে মুখের রহস্যময় ভৌতিক একটা আভাস পাওয়া যাবে। শোভনেশের সই থাকে ছবির নীচের বাঁ কোণে।
ছবিটার বাকি আধখানটায় রয়েছে শরীরের বাকি অংশ। রোহিণী সেটা দেখার লোভ আর সম্বরণ করতে পারল না। দরজার পাল্লাটা সে আঙুলের ডগা দিয়ে ঠেলল।
‘কে?’
বিদ্যুৎ ছোঁয়া লাগার মতো একটা ঝাঁকি খেয়ে সে পিছিয়ে গিয়ে দ্রুত আবার সোফায় এসে বসল। ঘরের লোকটা পুরুষ। বুঝতে পেরেছে কি দরজাটা সে ঠেলেছে? যদি জিজ্ঞাসা করে, তা হলে কী বলবে? লোকের বাড়িতে এসে দরজা ঠেলে শোবার ঘর চুপি চুপি দেখা শুরু রুচিহীনতাই নয়, একটা অপরাধও। না, বলা যাবে না। এই লজ্জাকর কাজ কিছুতেই স্বীকার করা যায় না, সে করবেও না।
