রোহিণী ভেবে পাচ্ছে না একজন পলাতক আসামির পক্ষে এর কোনটা ব্যবহার করে কলকাতায় আসা উচিত।
‘যেভাবেই আসুক, মোট কথা একটা লোক ইচ্ছে করলে বাই রোড, জঘন্য রাস্তা আর ট্র্যাফিক জ্যাম ধরে নিয়েও পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টার মধ্যে আসতে পারবে। কারোর আসার কথা আছে নাকি?’
‘না।’
ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়ি থামল ব্রেক কষার জন্য। রাজেন তার ওভারটেক করার কৃতিত্বে বাধা পেয়ে দাঁত চেপে ‘হারামজাদা’ বলে জানলা দিয়ে মুখ বাড়াল।
‘রাজেন, দু—চার মিনিট দেরি হলে এমন কিছু ক্ষতি হবে না। পুলিশের নোট বইয়ে নম্বর তোলা বা হাসপাতালে যাওয়াটাও এখন খুব জরুরি নয়। তোমার একটা বড়ো ম্যাচ রয়েছে সামনেই।’
রোহিণী ডান হাতের তালু রাখল রাজেনের ঊরুতে। রাজেন আড়চোখে একবার তাকাল। পার্ক স্ট্রিটে ঢুকেই গাড়ির গতি মন্থর হয়ে গেল, প্রায় রিকশার মতোই।
‘কী ব্যাপার?’
‘চারদিন পরই খেলা, ইনজুরি টিনজুরি যাতে না হয়…’
‘মতলবটা কী?’
‘দু—ধারে কত খাবার দোকান, দেখতে দেখতে যাওয়াতেও কত সুখ বিশেষত প্রচণ্ড খিদের মুখে।’
‘আজ থাক দেরি হয়ে যাবে।’
‘রোহিণী, তোমার সম্পর্কে কত কিছু জানি, আবার অনেক কিছুই জানি না।’ রাজেনের মুখ ও স্বর গম্ভীর।
কাঠ হয়ে গেল রোহিণীর আলগাভাবে বসার ভঙ্গি। কী জানতে চায়? সবই তো সে বলেছে।
‘তুমি রাঁধতে জান কি?’
কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল ধাতস্থ হতে, তারপরই সে রাজেনের হাঁটুর কাছে বিশাল একটা চিমটি কাটল।
‘তুমি একটা মিটমিটে, কী বলব, মিচকে শয়তান। ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলে। গাড়িটা এবার জোরে চালাও। সার্কুলার রোডটা ক্রশ করে আর একটু গিয়েই ডান দিকে।’
রাজেন গাড়ির গতি বাড়িয়ে বলল, ‘আমি কিন্তু এখনও জানি না রাঁধতে জান কি না। এটা জানার উপর, বলতে পার, আমাদের সম্পর্কটা কী হবে সেটা নির্ভর করছে।’
‘জানি।’
‘প্রমাণ চাই।’
‘ডান দিকে, ডান দিকে রাখো, এই তো আঠারো নম্বর।’
অ্যাপার্টমেন্ট বাড়ি। রাস্তার দিকে প্রত্যেক অ্যাপার্টমেন্টেরই একটি করে ছোট্ট ঝুলবারান্দা। একতলায় গাড়ি রাখার পাকা আঙিনা। ফটকে ডর্দি—পরা দারোয়ান। লিফট রয়েছে করিডরের দু—ধারে।
‘তুমি ফিরবে কীভাবে। অপেক্ষা করব?’
‘না, না, থাকতে হবে না। ঘণ্টাখানেক তো বটেই, তার বেশিও লাগতে পারে। আমি মিনিবাসে চলে যাব।’ দু—পা গিয়েই রোহিণী থেমে গেল। ফিরে এসে ঝুঁকে মুখ নামিয়ে বলল, ‘রাঁধতে পারি কি পারি না সেটা একদিন প্রমাণ করে দেব।’
‘কালকেই দাও। তা হলে প্রথম বলেই আউট হব না, এই গ্যার্যান্টি দেব।’
‘দুপুরে মহারানির ঘরে থাকব, টেলিফোন কোরো।’ বলেই দ্রুতপায়ে রোহিণী আঠারো নম্বর বাড়ির ফটকে ঢুকে গেল। গাড়িতে বসে রাজেন তাকিয়ে রইল যতক্ষণ না বোতাম টিপে রোহিণী লিফট চালু করল।
তিন
পালিশ করা সেগুন কাঠের একপাল্লার দরজায় পিতলের পাতের উপর ইংরেজিতে লেখা: মীনা চ্যাটার্জি। কলিং বেলের বোতাম টিপতেই ভিতরে পিয়ানোর টুং টাং বেজে উঠল। দরজায় নজরদারি কাচ লাগানো ছোটো গর্তটার দিকে রোহিণী তাকিয়ে ছিল। দরজা খোলার আগে ওটা দিয়ে তাকাবেই। তাকিয়ে যেন ভালো করে দেখতে পায়। গুন্ডা—টুন্ডা নয়, একটা মেয়ে।
দরজা ফাঁক করে পরিচ্ছন্ন শাড়ি ব্লাউজ পরা এক কিশোরী সম্ভবত কাজের মেয়ে, জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।
‘আমার আসার কথা ছিল, মিস চ্যাটার্জি কি আছেন?’
‘আপনি বসুন, দিদি এখনও ফেরেনি।’
ঢুকেই কাশ্মিরী কাজ—করা মাথাসমান উঁচু কাঠের পার্টিশন। তার লতাপাতার জাফরির ফাঁক দিয়ে ঘরটা ভালো দেখা যায় না। রোহিণী ইতস্তত করল বসার আগে। ঘরের একদিকে আধ হাত পুরু, টকটকে লাল কাপড়ে মোড়া রাবার ফোমের সোফা। চারজন অনায়াসে বসতে পারে। তার উলটোদিকে গদি—পাতা নীচু চৌকি, যার পায়াগুলিতে পিতলের কুলপি লাগানো। ছড়িয়ে আছে কয়েকটি গেরুয়া ওয়াড় পরানো তাকিয়া। এ ছাড়াও আছে দুটি গদির চেয়ার। ঘরের মাঝে কাপের্ট এবং নীচু আখরোট কাঠের গোল টেবল, তাতে কয়েকটি বাংলা ও ইংরেজি রঙিন ম্যাগাজিন। হালকা পাতিলেবু রঙের দেওয়াল। আসমানি রঙের মোটা কাপড়ের পর্দা, যাতে খয়েরি ডোরা। কাঠের কয়েকটি ব্র্যাকেট বিচিত্র জ্যামিতিক কোণ রচনা করেছে দেয়ালে। তাতে রয়েছে কাঠের, পিতলের ও পাথরের মূর্তি ও পুতুল। এর মধ্যে একটি, তিন বছর আগে পাওয়া সেরা চলচ্চিচত্র অভিনেত্রীর অ্যাওয়ার্ড, বাকিগুলি উপহার পাওয়া। সারা ঘরে একটিই ছবি, সদর দরজার মাথায় দেড় ফুট লম্বা রামকৃষ্ণদেবের হাসিমুখ। মুখের নীচে সাদা ডায়ালে সোনালি কাঁটার ডিম্বাকৃতি ইলেকট্রনিক দেওয়াল ঘড়ি। টেবিলে ফুলগুলি প্লাস্টিকের নয়। সোফার দু—পাশে কাপ ডিশ রাখার জন্য কাঠের ছোটো টেবিলে ছাইদানিগুলি পরিষ্কার। বাইরের কোনো শব্দ ঘরে আসছে না। অন্দরে যাবার দুটি দরজা। তাতে পর্দা ঝুলছে। ভিতর থেকেও কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। অসম্ভব নীরবতা ঘরে বিরাজমান।
মেয়েটা পাখা খুলে দেবার জন্য সুইচ বোর্ডের কাছে গিয়ে ফিরে তাকাল। খোলার দরকার আছে কি না জানতে চায়। রোহিণী বলল, ‘আস্তে, এক পয়েন্টে চালিয়ে দাও। আজ বেশ গরমই।’
সে সোফায় বসাই স্থির করল। সারা ঘরটা এবং অন্দরে যাবার একটি দরজা তার নজরের আওতায় থাকবে। মাথাটা ডানদিকে ঘোরালে অন্য দরজাটাও নজরে আসবে।
