‘তোমার বাজে বকা কি বন্ধ করবে?’ রোহিণীর স্বরের ঝাঁঝ যে পড়ে গেছে, রাজেন সেটা বুঝতে পেরে দ্বিগুণ উৎসাহে শুরু করল। ‘ওখানে গিয়ে খেলব কি? প্রথম বলেই তো আমি ফিরে আসব। স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছি, কৈলাশ মাট্টুর প্রথম ওভারের প্রথম বল। অফ স্টাম্পের এক হাত বাইরে; ছেড়ে দেবার জন্য ব্যাট তুলেছি; পিচ পড়েই সিম করে ছিটকে ঢুকে এল। ব্যাট নামাবার সময়ই পেলাম না; অফ স্টাম্পের বেলটা উইকেটকিপারের কাছে উড়ে গেল। আমি বোকার মতো মুখ করে ফিরে আসছি।…উফফ কী লজ্জা। কেউ তো আর জানে না, জানার কথাও নয় কেন আমার কনসেনট্রেশন ভেঙেচুরে তালগোল পাকিয়ে গেছল। সবাই সান্ত্বনা দেবে, ‘ব্যাড লাক রাজেন…বলটা অসম্ভব ভালো ছিল…এমন বলে গাওস্করও আউট হত।’ আমার শুধু একটাই অপরাধ, হাঁটুতে হাত রেখেছিলাম।’
রোহিণী হেসে ফেলেই গম্ভীর হয়ে উঠল। ‘আমার খুব অস্বস্তি লাগে যখন ভাবি আমি তোমার থেকে বয়সে বড়ো, আমি বিবাহিতও। ধরে নিচ্ছি আমার কিছু ফিজিক্যাল অ্যাসেট আছে, কিন্তু কতদিন আর সেটা থাকবে? পদ্মপাতার জলের মতোই তো মেয়েদের যৌবন!’
‘রোহিণী, এসব কথা বহুবার তুমি বলেছ। আমিও প্রত্যেকবার যা বলেছি, সেটাই রিপিট করব। সেই পুরুষগুলো অত্যন্ত নির্বোধ, যারা রমণীকে বিচার করে শুধুই তার রূপ আর যৌবন দিয়ে। এই দুটো নিশ্চয়ই পুরুষদের কাছে বাঞ্ছিত। সুন্দরী বউয়ের মালিক হয়ে কে না গর্ববোধ করে? কিন্তু হৃদয়, আবেগ, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, সহমর্মিতা, শেষ পর্যন্ত এগুলোই কিন্তু অ্যাসেট হয়ে ওঠে।’
মুখ নীচু করে ঘাস ছিঁড়তে ছিঁড়তে রোহিণী শুনে যাচ্ছিল। এখন তার মনে হচ্ছে, নিঃসঙ্গতা কাটিয়ে উঠতে হলে তার একজন পুরুষমানুষ দরকার, যার উপর সে নির্ভর করতে পারবে। আর, যদি শোভনেশই সেই ফেরারি হয়, যদি খুঁজে খুঁজে তার কাছে এসে হাজির হয়, তাহলে আত্মরক্ষার জন্য দুর্গের মতো শক্তিশালী একটা আড়াল তার দরকার। রাজেন শরীর ও মনের দিক থেকে একটুও দুর্বল নয়। লড়াই করতে পিছোবে না। গঙ্গাদা তাকে ফ্ল্যাট দিয়ে, চাকরি দিয়ে যথেষ্ট সাহায্য করেছে, করবেও। তবু মনের গভীরে একটা নিরাপদ আশ্রয়, আশ্বাস, নির্ভরতা তার খুব দরকার। রাজেন কখনো কোনো সময়ই তার কাছ থেকে নোংরা সুযোগ নেবার চেষ্টা করেনি, যদিও ফাজলামিতে মাত্রা ছাড়িয়ে যায়।
রাজেন নতমুখ রোহিণীর দিকে তীক্ষ্ন চোখে তাকিয়ে আছে। কথা বলার ঝোঁকে মুখটা উদ্ভাসিত, চোখ জ্বলজ্বলে। রোহিণীকে আনমনা দেখে সে বলল, ‘আমাদের দেশে মেয়েদের মুখটাই সব। মুখ সুন্দর হলেই সে সুন্দরী। তার গোটা শরীরটা যদি প্যাঁকাটির মতো কিংবা জালার মতো হয়ও, কোথাও যদি গড়নে ব্যালান্স, সামঞ্জস্য নাও থাকে, তবু সে রূপসি। আমাদের রুচি, সৌন্দর্যবোধ এভাবেই তৈরি হয়ে আছে। আমরা একদমই ফিজিক্যাল নই। দেখছ না, খেলায় আমরা কত পিছিয়ে।’
খাপছাড়াভাবে হঠাৎ রোহিণী বলল, ‘আমার ডিভোর্সটা করে ফেলা দরকার।’
‘উকিলের সঙ্গে কথা বলতে হবে। জয়পুর থেকে ফিরে এসেই যাব।’
‘তোমার বাড়িতে কি বলেছ কিছু আমার সম্পর্কে? বাবা, মা, দাদারা বউদিরা কি জানে?’
‘মা—কে বলেছি, তবে সব কিছু নয়। তোমাকে একবার দেখতে চেয়েছে।’
রাজেনের বলার ঢঙে কিন্তু ভাব দেখে রোহিণী উৎকণ্ঠিত হল। ‘সব কিছু বলোনি মানে? না, কোনোকিছুই চেপে যাওয়া চলবে না। তুমি ফিরে এসো, আমি যাব মায়ের কাছে। দরকার হলে আমার কথা আমিই তাঁকে বলব।’
রাজেনের মধ্যে উৎসাহ দেখা গেল না। অস্বস্তি কাটাতেই যেন সে এধার—ওধার তাকিয়ে অস্ফুটে বলল, ‘ঝালমুড়িওয়ালাটা তো এখানেই ছিল।’
বাগানের আলো জ্বলে উঠেছে। বহু মানুষ যেমন বেরিয়ে যাচ্ছে, আসছেও তেমনি নতুনরা। সর্বত্র আলো পড়েনি। পুঞ্জ পুঞ্জ অন্ধকার আর ছায়া ছড়িয়ে আছে। অনেক নরনারী সেদিকে যাচ্ছে।
রাজেন হঠাৎ বলে উঠল, ‘এই ঠিক হয়ে বসো, একটা লোক অনেকক্ষণ ধরে তোমায় দেখছে।’
রোহিণী প্রায় লাফিয়েই রাজেনের পাশে এসে আর্ত গলায় বলল, ‘কে? কোথায়?’
রাজেন হেসে উঠে বলল, ‘ওই দ্যাখো, কিন্তু এত ভয় পাওয়ার কী আছে?’
সত্যিই একটা লোক ওদের থেকে কুড়ি—পঁচিশ হাত দূরে তাদের দিকে মুখ করেই বসে।
‘এরা এক ধরনের মানসিক রুগি। সারা ময়দানে এদের দেখতে পাবে। যেখানেই মেয়ে আর পুরুষ একটু ঘনিষ্ঠভাবে বসবে, এরাও সেখানে গিয়ে কিছু ভালোবাসার ব্যাপার ঘটবে এই আশায়, সেটা দেখার জন্য বসে থাকবে।’
রোহিণী অবশ্য পাঞ্জাবি পরা, বেঁটে মোটা লোকটিকে দেখে হাঁফ ছাড়ল।
‘কিন্তু আমরা তো ঘনিষ্ঠ হয়ে বসিনি।’
‘বসতে তো পারি।’
‘বটে।’
‘কিন্তু তোমার মীনা চ্যাটার্জির সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্টের সময় হয়ে এসেছে।’
হাতঘড়িতে সময় দেখেই রোহিণী দাঁড়িয়ে পড়ল।
‘আর একটা কথাও নয়। দশ মিনিটে পৌঁছে দিতে পারবে? গাড়িটা রেখেছ কোথায়?’
‘ক্লাব হাউসের পাশে।’
রোহিণীর সঙ্গে রাজেনকেও হনহনিয়ে যেতে হল গাড়ি পর্যন্ত।
.
রাজভবনের কাছে রেলিং—ঘেরা গোলাকার দ্বীপটি ঘুরে গাড়ি দক্ষিণমুখো হবার পর রোহিণী বলল, ‘আচ্ছা, বহরমপুর থেকে কলকাতায় পৌঁছতে কতক্ষণ সময় লাগে।’
রাজেন গাড়ির গতি বাড়াতে পারছে না ট্র্যাফিকের জন্য। সেজন্য বিব্রত হচ্ছে। সংক্ষেপে বলল, ‘অনেকভাবে আসা যায়, কীসে আসতে চাও? ট্রেন, মোটর, ট্রাক, বাস, নৌকো, সাইকেল, হণ্টন কীভাবে?’
