‘তোমাদের ছোটকার পাড়া কোথায়?’
‘জোড়াবাগানে। তবে মীনা চ্যাটার্জিরা বোধহয় অল্প দিনই ছিল, তারপর পাড়া ছেড়ে কোথায় চলে যায়। গত বছর জামশেদপুরে যাবার সময় ট্রেনে কথায় কথায় ছোটকা কাকে যেন বলছিল, আমি আর ওতে কান দিইনি।’
রোহিণী বসার জায়গা খুঁজে এধার—ওধার তাকাচ্ছে। খোয়া, গর্ত, ধুলো এবং পুলিশী ঘোড়ার অসভ্যতার চিহ্ন ইতস্তত ছড়ানো। বিরক্ত হয়ে সে বলল, ‘আদিখ্যেতা করে যে কেন নন্দন কানন বলা হয়!’
‘টেস্ট ম্যাচের সময় যদি আসো, তাহলে দেখতে জায়গাটার কী অবস্থা হয়। চলো, জলের ধারটায় বসি।’
শীত যতটা থাকার কথা, নেই। তাই সন্ধ্যা আসন্ন সত্ত্বেও ভিড় রয়ে গেছে। বাচ্চচাদের ছুটোছুটি, মায়েদের ত্রস্ত ডাকাডাকি, বৃদ্ধবৃদ্ধার শান্ত পদক্ষেপ, ফেরিওয়ালাদের সুরেলা হ্রস্ব ডাক, পাখিদের কিচিরমিচির, সব মিলিয়ে রোহিণীকে খানিকটা জুড়িয়ে আনল।
‘না এখানে নয়, বাঁদিকে তাকিয়ে দ্যাখো।’
রাজেন তাকিয়ে দেখল। প্রায় তিরিশ হাত দূরে, বড়ো গাছের গুঁড়ির আড়ালে বসা একটি কিশোরীকে বাঁহাতে জড়িয়ে মুখের কাছে মুখ এনে এক ছোকরা কিছু বলছে। ঝোপঝাড় আর মোটা মোটা গাছে আর ঘন পাতায় এই দিনটা এখন আবছা হয়ে এসেছে। নজরটা একটু সরাতেই সে আবার অমন একটা ঘনিষ্ঠতার নমুনা পেল মেয়েটির কোলে মাথা রেখে শুয়ে একজন।
‘প্রকাশ্যে এইভাবে, এমন রুচিহীন অসভ্য…।’
রোহিণী বলতে বলতে হাঁটতে শুরু করল।
রাজেন বলল, ‘দুপুরে এলে দেখতে, রাস্তা দিয়ে চলতে চলতেই রেলিং দিয়ে দেখা যায়…কী অল্পবয়সি সব ছেলেমেয়ে, মনে হয় স্কুলে পড়ে, এমন কম্প্রোমাইজিং ভঙ্গিতে গাছতলায় বসে থাকে। রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে লোকজন দাঁড়িয়ে দেখে, হাসাহাসি করে, ওরা তাতে ভ্রূক্ষেপও করে না, বরং যেন মজাই পায়। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের বাগানেও ভরদুপুরে এরকম ছেলেমেয়েদের দেখেছি।’
‘ডেফিনিটলি এরা কলকাতার নয়, সাবার্ব থেকে আসে। কলকাতার গেরস্ত, ভদ্র পরিবারের হলে চেনা কেউ দেখে ফেলার ভয়টা থাকত, অন্তত মেয়েদের থাকত।…এখানটায় বসি।’
ফাঁকা জায়গায়, তিনটি ছেলেমেয়ে নিয়ে বসে থাকা মধ্যবয়সি এক দম্পতির কাছাকাছি ওরা বসল।
‘ভয়টা কি শুধু মেয়েদেরই থাকে?’
‘তবে না তো কী, ছেলেদের থাকে?’
‘যেমন? একটা উদাহরণ দাও।’
রোহিণী বলতে যাচ্ছিল, যেমন আমি। এই মুহূর্তে আমার থেকে ভীত পৃথিবীতে আর কেউ নেই। একটা খুনি জেল থেকে বেরিয়ে পড়েছে, সেটাই আমার কাছে ভয়ের ব্যাপার। আমাকে পেলে সে গলা টিপে মেরেও ফেলতে পারে। একটা অনিশ্চিত আতঙ্কে পড়ে গেছি।
‘কী ব্যাপার তুমি অমন চোখ কুঁচকে মুখে বিশ্রী ভাঁজ ফেলে কী ভাবছ? উদাহরণ খুঁজছ?’
‘দ্যাখো রাজেন’, রোহিণীর স্বর হঠাৎ তীব্র হয়ে উঠল। ‘আগেও তুমি কয়েকবার বলেছ আমার মুখে ভাঁজ পড়ে, হাসলে গলা বসে যায়, চোখের কোণের চামড়া কুঁচকোনো, জানি তুমি একথা কেন বল।’
রাজেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়ে রইল। এইরকম আবেগের বিস্ফোরণ, সাধারণত রোহিণীর মধ্যে ঘটে না।
‘কবে আবার বলেছি?’
কথাটা কানে না তুলে রোহিণী একই তীব্রতায় বলল, ‘বয়স হয়েছে, এখন চোখের কোণে ঠোঁটের কোণে যদি ভাঁজ পড়ে, কী করতে পারি বল? তুমি বরং…।’ রোহিণী থেমে গেল।
‘বরং?’
‘বরং, ভুল শোধরাবার যথেষ্ট সময় রয়েছে। রাজেন তুমি আমার থেকে চার বছরের ছোটো।’
‘ওহ এই ব্যাপার।’ রাজেন হাঁফ ছাড়ার ভান করল শব্দ করে শ্বাস ফেলে। ‘আমি ভাবলুম, না জানি কী দোষের কথা বলে ফেলেছি। এই নিয়ে কতবার মনে করালে তুমি চার বছরের বড়ো। গত দু—বছরে, যদি মাসে একবার করেও হয় তাহলে চব্বিশবার। তার মানে চব্বিশবার আমাকে টর্চার করেছ, প্রতিবারে এজন্য যন্ত্রণা পেয়েছি বারো ঘণ্টা করে, মিনিমাম। তাহলে চব্বিশ ইনটু বারো, কত হয়?’
‘এটা রসিকতা করার ব্যাপার নয়।’
‘দুশো অষ্টাশি। কতটা ইনহিউম্যান হলে একজন মহিলা দুশো অষ্টাশি ঘণ্টা ধরে একজন পুরুষকে দগ্ধে দগ্ধে রোস্ট বানাতে পারে, তার হিসেব দিতে পার? এই নিষ্ঠুরতা গিনেস বুক অব…।’
‘রাজেন।’ রোহিণী তার হাঁটুতে রাখা, রাজেনের হাতটা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। ‘বিহেভ। ওই গাছতলার মতো সীন আমি অপছন্দ করি।’
রাজেন আবার হাত রাখল। রোহিণী সরিয়ে দিল। রাজেন আবার রাখল, রোহিণী সরিয়ে দিয়ে সামান্য পিছিয়ে বসল। হাঁটু অন্যদিকে ঘুরিয়ে।
‘আহহ, এইটাই চেয়েছিলাম, দারুণ পোজ, তোমাকে সবথেকে সেক্সি দেখায় এইভাবে বসলে।’
‘দেখাক।’ বলেই রোহিণীর মাথার মধ্যে বিদ্যুৎ ছুঁয়ে গেল। শোভনেশের ভারী গলার হুকুমের স্বর ধাক্কা দিয়ে উঠল, ‘এইভাবে, ঠিক এইভাবে, নড়বে না। তোমাকে ভারী সফট দেখায় এই পোজে।’ রেগে রোহিণী বলেছিল, ‘দেখাক, আমি পারব না। এসব আমার দ্বারা হবে না।’
প্রায় একইভাবে রাজেনও বলল, তবে একদমই অন্য প্রসঙ্গে, অন্য স্বরে। শোভনেশ বলেছিল, সফট দেখায়, রাজেন বলল সেক্সি। দুটোই শুনতে ভালো লাগে। যেকোনো মেয়েরই লাগবে।
‘কিছু হয়েছে বোধহয়, মেজাজ এত খাট্টা কেন?’
‘কিছু হয়নি।’
‘পরশু রওনা হব। ক্রিকেট এখন আর খেলা নয়, যুদ্ধ। যুদ্ধযাত্রার আগে পুরুষদের রণসাজ পরিয়ে, কপালে তিলকটিলক দিয়ে, দেবতার ফুল মাথায় ঠেকিয়ে, আরতিটারতি করে রমণীরা যুদ্ধে পাঠাত। কী দারুণ একটা সময়ই না ভারতে ছিল। পুরুষরাও তাই জেতার জন্য জান লড়িয়ে দিত। জেতার ইচ্ছাটা তৈরি হত মেয়েদের ভালোবাসা প্রেম পাবার জন্য। আর এখন?’ রাজেন অর্থপূর্ণ নীরবতা তৈরি করল নাটকীয়তা আনতে। ‘রণসাজ, তিলক, আরতি নয় শুধু একটু করুণাঘন দৃষ্টিপাত, একটি সাজানো হাসি তাও বরাদ্দ হয় না। এইজন্যই তো বাংলার ক্রিকেটের এই অবস্থা। বাঙালি মেয়েরা—’
