প্রদর্শনী—ঘরে ঢুকে ছবিগুলোর উপর একনজর তাকিয়েই দিদির চোখে বিরক্তি আর ভয় দেখতে পেয়েছিল রোহিণী। বাঁদিকের দেওয়ালে ছ—সাতটা তেলরঙের ছবি ছিল, অদ্ভুত ভঙ্গিতে শোয়া, বসা, দাঁড়ানো নগ্ন নারীর। অত্যন্ত বাস্তব চিত্রণ। শুধু পেশি বা ভাঁজগুলিই নয়, দেহের কোনো কোনো জায়গায় কেশও নিখুঁত। মনে হয় একজন নারীকেই নানান ভাবে ও ভঙ্গিতে রেখে পাটে পাটে মেলে দেওয়া হয়েছে—আর ঘাড়, কাঁধ, ঊরু তলপেট, হাঁটু, গোড়ালি, আঙুল, নিতম্বের কমনীয় গড়নকে। সোহিনী বারকয়েক অস্বস্তিভরে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রোহিণীকে বলেছিল, ‘মেধাকে নিয়ে তুই ওইদিকের ছবি দ্যাখ।’
দেখতে দেখতে একটা ছবির সামনে দাঁড়িয়ে রোহিণী বলেছিল, ‘দেখেছিস কী সুন্দর মাঠ, ইচ্ছে করছে ছবিটায় ঢুকে খালি পায়ে হাঁটি।’
আর ঠিক তখনই পিছন থেকে ‘বেশ তো হাঁটুন না।’
শোভনেশ হাসছিল। গালের পেশিতে ও চোয়ালে শক্ত সবল ভাঁজ, ঠোঁটের ঢাকনা খোলা সরল দু—পাটি দাঁত, চোখ দুটি আরও সরু হয়ে গেছে হাসির কুঞ্চনে। রোহিণীর বুকের মধ্যে ছমছম করে উঠেছিল। শোভনেশ আঙুল দিয়ে ছবিটাকে দেখিয়ে বলেছিল, ‘ওই যে দূরে একটা বেড়া আর তার পাশের চালাটা দেখা যাচ্ছে, তার ওধারে একটা গ্রাম আছে, আদিবাসীদের। নাম টুংলাপুট। হাঁটতে হাঁটতে ওখানেও চলে যেতে পারেন।’ রোহিণী ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকে। ঘাসের সবুজ প্রান্তরের চড়াই, দূরে একটা টিলা, ছোপ ছোপ জঙ্গলের আভাস, আকাশের রং দেখে মনে হয় সূর্য অস্তে নামছে। সারা প্রকৃতি জুড়ে শান্ত নীরবতা। ঠিক এই সময়েই শাঁখ বেজে ওঠার কথা। শোভনেশ হুক থেকে ছবিটা খুলে রোহিণীর দিকে এগিয়ে দিল। ফ্রেমের কোণে আঁটা কাগজে দাম লেখা আড়াই হাজার টাকা। রোহিণীর হাত কেঁপে যায়। আড়াই ফুট বাই আড়াই ফুট জলরঙের ছবিটা হাতে নিয়েও সে ধরে রাখতে পারেনি। কাচ ভাঙার শব্দে যে ক—জন দর্শক ছিল ফিরে তাকাল। তাড়াতাড়ি উবু হয়ে বসে রোহিণী কাচ কুড়োতে যেতেই দুটি কাঁধ ধরে শোভনেশ তাকে দাঁড় করিয়ে বলেছিল, ‘দোষটা আমারই, আপনি কুড়োবেন কেন?’
.
রোহিণী কুড়োবে কী কুড়োবে না ভেবে পেল না। রাজেন ইচ্ছে করেই বলটা তার দিকে গড়িয়ে দিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে হাসছে। ফেন্সের দরজা দিয়ে আনমনে কখন যে সে মাঠে ঢুকে খালি পায়ে দাঁড়িয়েছে, মনে নেই।
প্র্যাকটিস শেষ হয়ে গেছে। জয়পুর রওনা হবার আগে এটাই শেষবার। রাজস্থানের সঙ্গে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা। রাজেনের ধারণা, ম্যাচটা তারা জিতবে। কেন জিতবে তাই নিয়ে পরশু দিনই আধ ঘণ্টা ধরে একটা লেকচার দিয়েছে।
‘পাঁচ মিনিট।’ রাজেন কাছে এসে বলল। ‘এক সেকেন্ডও বেশি নেব না। তুমি ততক্ষণ বরং এই চেয়ারটায় বোস। আমি চান সেরে জামা—প্যান্ট চেঞ্জ করেই আসছি।’
রাজেন ছুটে চলে গেল। সাদা ট্রাউজার্স ও হাফহাতা স্পোর্টস শার্ট—পরা ছিপছিপে শরীর। রোহিণীর থেকে দু—ইঞ্চি লম্বা, বেলেমাটির মতো গায়ের রং, কোঁকড়া চুল আর নাকটি চোখা। বাঁ চোয়ালের নীচে আঁচিল। বাঁ হাতে ব্যাট করে, ডান হাতে লেগব্রেক বল। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে সে হাত নেড়ে, ড্রেসিং রুমে ঢুকল। ফেন্সের ধারে একটা স্টিলের চেয়ার। রোহিণী বসল। সূর্য অস্তে নেমেছে, মাঠে ছায়া। চড়াইয়ের মতোই দুটো কালো পাখি উড়ছে—বসছে আর খুঁটে খুঁটে কী খাচ্ছে। বিরাট স্কোর বোর্ডটার দিকে সে শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। আগের খেলার কয়েকটা নাম আর স্কোর রয়ে গেছে। দূর থেকে লঞ্চের ভোঁ ভেসে এল। তার মনে হচ্ছে, একটা গামলার মধ্যে যেন বসে রয়েছে। বাইরে কী ঘটছে কিছুই বোঝার উপায় নেই। সে জানে না জেল পালানো লোকটা কে, এখন সে কোথায়!
‘পাঁচ মিনিট হয়েছে কিনা দ্যাখো!’
হেঁটে আসতে আসতে রাজেন চেঁচিয়ে বলল। রোহিণী ঘড়ি দেখার বদলে কাঁধের ঝোলার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দোকান থেকে নেওয়া ঘড়িটা বার করল।
‘সারাতে কত নিল?’
‘তা দিয়ে তোমার দরকার কী?’
রাজেনের বাঁ হাতটা টেনে নিয়ে রোহিণী ঘড়িটা পরিয়ে স্টিলের ব্যান্ডটা টিপল।
‘আমি ডান হাতে পরি।’
‘না, বাঁ হাতে পরবে।’ ভ্রূ কুঁচকে রোহিণী বিরক্তি জানাল। ‘আর এই হাবিজাবি লেখা শার্ট পরা কেন? সাধারণ জামা তো পরতে পার। ম্যানুফ্যাকচারের ব্র্যান্ডনেম বুকে নিয়ে ঘুরে বেড়াবে কীজন্য, তুমি কি ডিসপ্লে বোর্ড? এসব জামা তারাই পরে, যাদের পার্সোনালিটি কম।’
রাজেন প্রতিবাদ জানাবার চেষ্টা করতে গিয়ে দু—হাত তুলে বলল, ‘সারেন্ডার করছি। এবার তাহলে চলা যাক।’
দু—জনে ক্লাব হাউস থেকে বেরিয়ে পশ্চিম দিকে হাঁটতে শুরু করল। বোঝা যায়, ওরা গঙ্গার ধারে বেড়াতে অভ্যস্ত।
‘গাড়ি আছে।’ রাজেন বলল।
‘থাক, বেশি দূর যাব না। ইডেনের ভেতরে গিয়ে বরং একটু বসি। মীনা চ্যাটার্জির সঙ্গে ইন্টারভিউ সাতটায়, পাংচুয়াল হতে চাই।’
‘কে মীনা চ্যাটার্জি?’
‘বাংলা সিনেমা দ্যাখো?’
‘না। ও হোও…নাম শুনেছি। এই তো রাস্তায় পোস্টার দেখলাম, কী একটা ছবির নায়িকা। বেশ ভালোই দেখতে। আমাদের উইকেটকিপার ছোটকা মীনা চ্যাটার্জির অন্ধ ভক্ত। ফিল্ম রিলিজ হলে প্রথম দিনে দেখবেই। কী যে অদ্ভুত মানসিকতা। ওর নাকি পাড়ার মেয়ে, ছোটোবেলায় একসঙ্গে প্রাইমারি স্কুলে পড়েছে।’
