‘এই হল ঐতিহাসিক ইডেন গার্ডেনস’, রাজেন প্রথম দিন তাকে মাঠে এনে বলেছিল, পৃথিবীর সবথেকে পুরোনো ক্রিকেট ক্লাব হল ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাব, অবশ্য ইংল্যান্ডের কথা ছেড়ে। প্রায় দুশো বছর বয়স এই ক্লাবের। এই মাঠে উনিশশো পঞ্চাশ সাল পর্যন্ত তাদেরই ছিল। ‘আর মাঠটার বয়স?’ রোহিণী কৌতূহলী হয়ে জানতে চায়। সে এইটুকু জানত, গভর্নর জেনারেল অকল্যান্ডের দুই বোন, যাদের পদবি ছিল ইডেন, তারাই বাগান করেছিল। তাদের নামেই ইডেন উদ্যান। ‘কিন্তু এই মাঠটা তখন সেই বাগানের মধ্যে ছিল না।’
স্ট্র্যান্ড ধরে আউট্রাম ঘাটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে সেদিন রাজেন প্রায় ক্লাস—লেকচার দেবার ঢঙে বসেছিল, ‘মোহনবাগান মাঠের কাছ থেকে একটা রাস্তা ইডেনের মধ্য দিয়ে নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়াম পর্যন্ত সোজা চলে গেছিল বাগান আর মাঠটাকে আলাদা করে। সেই রাস্তায় লোকজন, গাড়িঘোড়া চলত। রাস্তাটা শেষ পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়ে ক্রিকেট মাঠটাকে বাগানের অন্তর্গত করা হয়। ক্যালকাটা ক্লাব এই মাঠটায় প্রথম কবে খেলে, সঠিক বছরটা জানা যায়নি, তবে আঠারশো পঁয়ষট্টি নাগাদই হবে আর কাঠের প্যাভিলিয়ন তৈরি করে আঠারশো একাত্তরে। তারপর সেই প্যাভিলিয়নও ছেড়ে দিয়ে এখনকার এই বি সি রায় ক্লাব হাউসে উঠে আসে ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অব বেঙ্গল। এখন যে হাজার হাজার টন কংক্রিট দেখছ মাঠটাকে ঘিরে রয়েছে, সে সব কিছুই ছিল না যখন আমরা স্বাধীন হই। মাঠ ঘিরে ছিল শুধু দেবদারু গাছ। বলের আর গাছের রঙ একাকার হয়ে উঁচু ক্যাচ নিতে নাকি খুব অসুবিধে হত। বড়ো বড়ো ম্যাচের সময় ফুটবল মাঠ থেকে কাঠের গ্যালারি এনে বসানো হত। জ্যাঠামশাই ইডেনে খেলা দেখছেন ছত্রিশ সাল থেকে। ঊনচল্লিশের ফেব্রুয়ারিতে বাংলা এই মাঠে রঞ্জি ট্রফি ফাইনাল খেলেছিল। সে গল্প জ্যাঠামশাই এখনও করেন। আট আনা আর এক টাকা দু—আনার টিকিট। খেলা শুরু হত এগারোটায়, শেষ হত সওয়া পাঁচটায়। ভাবতে পার, সওয়া পাঁচটা পর্যন্ত ইডেনে খেলা হচ্ছে? তখন এত উঁচু কংক্রিটের স্ট্যান্ড ছিল না। খোলা মাঠ, অনেকক্ষণ পর্যন্ত মাঠে রোদ থাকত, গঙ্গার হাওয়া আসত। বাংলা সেবারই প্রথম ট্রফি জিতেছিল।’
ক্রিকেট খেলা দেখতে রোহিণীর মোটামুটি খারাপ লাগে না। বোম্বাইয়ে থাকতে টেস্ট ম্যাচ দেখেছে পাকিস্তানের সঙ্গে। আর ইংল্যান্ডের সঙ্গে কলকাতাতে। তবে পাঁচদিন দেখার ধৈর্য বা আগ্রহ তার নেই। হাজার হাজার লোকের সঙ্গে বসা, নানান রকমের কথাবার্তা, মন্তব্য, পোশাক—আশাক আর জনতার মেজাজ বদলে যাওয়া, এই সবই তার ভালো লাগে। মাঠের মধ্যের ব্যাপার—স্যাপার তাকে টানে না, যেহেতু খেলার অনেক কিছুই সে বুঝতে পারে না, খবরাখবরও রাখে না। রাজেন যখন বলল, বাংলা ঊনচল্লিশে প্রথম রঞ্জি ট্রফি জিতেছে, তখন সে বলেছিল, ‘দ্বিতীয়বার কবে জেতে?’ রাজেন ঘুরে দাঁড়িয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ পিটপিট করে বলেছিল, ‘ঠাট্টা হচ্ছে?’ রোহিণী বুঝতে পারে, বোকার মতো কিছু সে বলেছে। সামলাবার জন্য সে বলে, ‘আমি কি ক্রিকেটের রেকর্ড রাখি যে, বলে দিতে পারব কোন বছর দ্বিতীয়বার জিতেছে?’ রাজেন যেন আশ্বস্ত হল। হালকা সুরে বলেছিল, ‘এখনও পর্যন্ত দ্বিতীয়বারটা আসেনি।’ এইবার রোহিণী দাঁড়িয়ে পড়ে চোখ পিটপিটানিটা নকল করে বলে ‘ঠাট্টা হচ্ছে?’ রাজেন মাথা নেড়ে তারপর জানায়, কথাটা সত্যিই, বাংলা আর কখনো রঞ্জি ট্রফি জিততে পারেনি।
.
শুনে রোহিণী অবাক হয়ে গেছিল। তার মনে হয়েছিল, হাজার হাজার লোকের টেস্ট ম্যাচ দেখার জন্য পাগল হয়ে ওঠা, এই ঐতিহাসিক মাঠ, এতবড়ো সাজানো তকতকে বাড়ি আর প্রায় লক্ষ লোকের খেলা দেখার ব্যবস্থা, সবই যেন কীরকম অর্থহীন, হাস্যকর। অনেকটা তার নিজের জীবনের মতোই।
ফেন্সিংয়ে দু—হাত রেখে রোহিণী মাঠের মধ্যে রাজেনকে দেখতে পাচ্ছে। উঁচু করে মারা বলটা লোফার জন্য দৌড়তে দৌড়তে ঝাঁপ দিল দু—হাত বাড়িয়ে। বল হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াতেই মাঠের কয়েকজন তারিফ জানাতে চেঁচিয়ে উঠল। রাজেন কনুই তুলে দেখছে ছড়ে গেছে কিনা। সাটিনের মতো এমন মোলায়েম ঘাস, রোহিণীর ইচ্ছে করছে জুতো খুলে রেখে মাঠের মধ্যে গিয়ে হেঁটে বেড়াতে।
‘বেশ তো হাঁটুন না।’
চমকে সে পিছনে তাকাল। কেউ নেই। খাকি শার্ট আর ধুতি—পরা একজন মালির সঙ্গে একটি লোক কথা বলছে, তাও পনেরো—ষোলো মিটার দূরে। ক্লাব হাউসের কমপ্লিমেন্টারি আসনগুলির চালার উপরে দুটি পায়রা ছাড়া আর কোনো প্রাণী সে দেখতে পেল না।
রোহিণী অপ্রতিভ হল। কথাটা তার চেতনায় বরাবরের জন্য যেন ছাপ দিয়ে গেছে। কিছুতেই সে যেন ভুলতে পারে না—’বেশ তো হাঁটুন না।’ গভীর গমগমে স্বরে শোভনেশ তাকে অযাচিতই বলেছিল পিছনে দাঁড়িয়ে। চমকে পিছন ফিরে তাকিয়েছিল সে আর সাত বছরের ভাগনি মেধা। দীর্ঘদেহী, টকটকে গায়ের রং, কাঁচাপাকা আলুথালু চুল, লম্বা মোটা জুলপি, সামান্য চাপা নাক আর সরু চোখ দেখলেই মণিপুরী বা নাগা বলে মনে হয়। ঘন নীল সুতির টি শার্টের বুকের কাছে এমব্রয়ডারি করা সাদা দুটি অলিভ পাতা।
অ্যাকাডেমি আর ফাইন আর্টসের পশ্চিমের গ্যালারিতে ছবির সেই প্রদর্শনীতে তখন জনা দশেক দর্শক ছিল। দিদি সোহিনী যোগলেকর আর মেয়ে মেধার সঙ্গে রোহিণীও গেছিল ছবি দেখতে। প্রদর্শনীর স্পনসর ছিল রং তৈরির কোম্পানি, হিমালয়ান পেইন্টস। সোহিনীর স্বামী রঞ্জন যোগলেকর, যার ডাকনাম বাপু, হিমালয়ানের মার্কেটিং ডিভিশনের কন্ট্রোলার। অফিসের কাজে বাপুর সঙ্গে বোম্বাই থেকে এসে ওরা ছিল ওল্ড বালিগঞ্জে কোম্পানির গেস্ট হাউসে। ছবি দেখতে বাপু আসেনি। অফিসে তার কাজ ছিল, তা ছাড়া আঁকা ছবি দেখতে তার ভালোও লাগে না।
