‘বউদি আমার হার্টের ট্রাবলটা সকাল থেকে বেড়েছে, এখুনি ডাক্তারের কাছে যাব। কীরকম যেন বুকের মধ্যে হচ্ছে…ব্লাড প্রেশারটাও মনে হচ্ছে…’ বলতে বলতে রোহিণী তাকাল গঙ্গাপ্রসাদের দিকে। ঘরে ঢুকল অ্যাকাউন্ট্যান্ট ক্ষিতীশবাবু। হাতে কয়েকটা চিঠি। সেগুলো হাত বাড়িয়ে নিয়ে গঙ্গাপ্রসাদ অনুমোদনের ভঙ্গিতে রোহিণীর দিকে মাথা নাড়লেন।
‘হ্যালো রোহিণী, হার্টের অসুখ তো অফিসে এসেছ কেন?’
‘মীনা চ্যাটার্জি আজ বিকেলে ইন্টারভিউয়ের জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট ডেট দিয়েছে।’
‘দিলেই যেতে হবে? এখুনি তুমি বাড়ি গিয়ে শুয়ে থাক।’
‘ডাক্তারের কাছে যাব না?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ ডাক্তার দেখিয়েই…নিশ্চয় গুচ্ছের ক্যাপসুল লিখে দেবে, ওগুলো কিনেই বাড়ি গিয়ে খাবে। তুমি কিছু ভেব না, এই বয়সে মেয়েদের হার্টের অসুখ আবার হয় নাকি? বরং তোমায় দেখলেই পুরুষদের…’
‘ওহ, বউদি আবার…।’
‘রোহিণী’ ওধার থেকে হঠাৎ স্বরটা ফিসফিসে হয়ে গেল। ‘তোমার দাদা কি টাই পরে আছে?’
‘অ্যাঁ, কি বললেন?’ গলা চড়িয়ে চিঠিতে মগ্ন গঙ্গাপ্রসাদকে শুনিয়ে রোহিণী বলল, ‘দাদা টাই পরে আছেন কিনা?’
চমকে গঙ্গাপ্রসাদ মুখ তুললেন এবং নিমেষে কোটের পকেট থেকে টাইটা বার করে হাতে ঝুলিয়ে রোহিণীকে দেখালেন।
‘দাদা তো পরেই রয়েছেন।’
‘কী রঙের? ওধারের স্বরে সন্দেহ।
‘মেরুন জমিতে সোনালি আর কালো স্ট্রাইপ।’
‘আচ্ছা, এখন তুমি তাড়াতাড়ি ডাক্তারের কাছে চলে যাও, দেরি করো না। পরের বার যখন বাসুদেবপুর যাব তোমাকে নিয়ে যাব, ওখানে ভালো রেস্ট পাবে।’
রিসিভার রেখে রোহিণী বড়ো করে শ্বাস ফেলল। ক্ষিতীশবাবু বেরিয়ে যেতেই গঙ্গাপ্রসাদ বললেন, ‘বরুণা খুব সরল, ভালো মনের।’
রোহিণী শুধু হাসল। এতক্ষণ যত কথা সে বলেছে আর শুনেছে, তার মধ্যে অস্বস্তিটা চাপা পড়ে ছিল। ঘরটা হঠাৎ নীরব হয়ে যেতেই সে আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেল।
‘লোকটা যদি শোভনেশ হয়…’
‘তাতে কি হয়েছে? তোমার ভয় পাওয়ার তো কিছু নেই।’
‘প্রথমে আমারই খোঁজ করবে।’
‘কোথায় পাবে তোমায়?’
‘এই অফিসটা ও চেনে।’
‘আমার কাছে আসবে? আসুক। আমি বলব, রোহিণী কোথায় আছে আমি জানি না। ফেরারিকে আশ্রয় দেবার প্রশ্নই ওঠে না। পুলিশকে ডেকে ধরিয়ে দেব না, তবে পুলিশের ভয়টা দেখাব। কিন্তু তার আগে জানতে হবে ফেরারি লোকটা কে?’
‘আপনি কাল সকালে ফিরছেন। আমি অফিসে ফোন করে জেনে নেব।’
‘অত ঘাবড়াচ্ছ কেন বল তো? তুমি এখন একটু অন্য কোনো ঘরে বসো, দু—জন ভিজিটার আসবে।’
‘আমি মহারানির ঘরে থাকব। তারপর ইডেনে যাব। রাজেনের নেট প্র্যাকটিস আছে, পরশু জয়পুর যাবে।’
‘আমি তো বাড়ি যাব। ভালোই হল, তোমাকে নামিয়ে দিয়ে যাব।’
দুই
বি সি রায় ক্লাব হাউসের সামনে রোহিণীকে নামিয়ে গঙ্গাপ্রসাদ বললেন, ‘টিভি—র জন্য নতুন বিভাগটার কথা মাথায় রেখো। একটা সেট তোমার ওখানে পাঠিয়ে দেব।’
গাড়িটা সোজা বাবুঘাটের দিকে চলে গেল। গঙ্গার ধার দিয়ে দক্ষিণে যাবে। গঙ্গাপ্রসাদের বাড়ি ডায়মন্ডহারবার রোডে, মোমিনপুরে।
রাস্তা পার হবার জন্য রোহিণীকে অপেক্ষা করতে হচ্ছিল। বাস বা মোটর এখানে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছোটে, রাস্তাটাও চওড়া। পার হতে হলে, ফাঁক পেয়েই ছুটতে হবে। ততক্ষণ সে দু—ধারে তাকিয়ে সন্তর্পণে একবার পিছনেও তাকাল। কাস্টমস ও পুলিশ মাঠে ক্রিকেট খেলা এইমাত্র বোধহয় শেষ হয়েছে। মালি স্টাম্পগুলো তুলে তাঁবুতে ফিরে যাচ্ছে। দূরের এবং কাছের মানুষদের ওপর দিয়ে সে চোখ বোলাল। ছয় ফুটের উপর লম্বা, শীর্ণ, ধুতি—পাঞ্জাবিপরা একটি লোকের দিকে কয়েক সেকেন্ড দৃষ্টি ধরে রেখে সে মনে মনে অপ্রতিভ হল। জেল থেকে ধুতিপাঞ্জাবি পরে পালানো শক্ত ব্যাপার। তা ছাড়া লোকটার চুল কুচকুচে কালো, একটু কুঁজোও। নয়তো গলা, কাঁধ, মুখের গড়নে অনেকটা মিল আছে।
শোভনেশের চুল কাঁচাপাকা মেশানো, ঝাঁকড়া, ফাঁপানো। ক্যালেন্ডারের মৃত সতী—কাঁধে দক্ষযজ্ঞের শিবের চুলের মতো। জুলপিটা পুরু, গালের অর্ধেক পর্যন্ত। ছিপছিপে, আঙুল থেকে কনুই পর্যন্ত দড়ির মতো শিরায় পুরোবাহু যেন বেঁধে রাখা। কবজি চওড়া। বুকটা চাপা। কোটরে ঢোকা চোখ জ্বলজ্বলে। ঘনভুরুর চুলও ধূসর। এমন চেহারার একটি লোকও রোহিণীর এখন চোখে পড়ল না।
শেষ পর্যন্ত ছুটেই রাস্তা পার হতে হল। ঝুলিটার মুখ ফাঁক করে ঘড়িটা একবার দেখে নিয়ে সে ক্লাব হাউসের লোহার ফটক দিয়ে ভিতরে ঢুকল। দুটি যুবক বেরিয়ে আসছে। রোহিণীকে দেখে তারা পরিচিতের হাসি হাসল।
‘আছে?’ সে জিজ্ঞাসা করল।
‘মাঠে পাবেন।’ ওদের একজন বলল।
এদের সঙ্গে রাজেনই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। দু—জনেই বাংলা দলে বছর চারেক খেলছে। ভদ্র, বিনয়ী। তার সঙ্গে রাজেনের সম্পর্কটা ওরা জানে। একতলায় সদর দিয়ে ঢুকেই বাঁদিকে উপরে ওঠার সিঁড়ি। ডানদিকে করিডোর ধরে সোজা গিয়ে ফুলবাগানের কিনারে সিমেন্টের সরু পথ দিয়ে ফেন্সিংয়ে পৌঁছল রোহিণী। মাঠে ঢোকা উচিত নয় ভেবে সে দাঁড়িয়ে রইল।
নেট প্র্যাকটিস শেষ হয়ে গেছে। এখন চলেছে ক্যাচিং প্র্যাকটিস। একজন বল তুলে ব্যাট দিয়ে সজোরে মারছে। দূরে ছড়ানো পাঁচ—ছ’জন ফিল্ডার আকাশছোঁয়া বল লুফছে। বাউন্ডারি ধরে ধীরে ছুটছে দু—জন। নেটের পিছনে চেয়ারে, মাটিতে বসে আছে আরও চারজন। তাদের পাছে ছড়ানো কিছু সরঞ্জাম। রোহিণী খাঁ খাঁ কংক্রিট স্ট্যান্ডের উপর দিয়ে চাহনি ঘুরিয়ে মাঠের উপর রাখল। সমানভাবে ছাঁটা মসৃণ তকতকে ঘাস।
