ফোনের মাউথপিস হাত দিয়ে চেপে গঙ্গাপ্রসাদ চাপাস্বরে বললেন, ‘দেখছি বলল।’ তারপরই ‘হ্যাঁ হ্যাঁ কী বললেন? এখনও কিছু জানেন না! খবরটা আপনারাও দেখেছেন! হ্যাঁ হ্যাঁ…তাহলে কালই খবর নেব। আচ্ছা, ধন্যবাদ, নমস্কার। ‘ গঙ্গাপ্রসাদ রিসিভার রাখলেন।
‘কী বলল, জানে না?’ রোহিণী শ্বাস বন্ধ করে বলল।
‘হ্যাঁ। কাল খোঁজ নেব।’ অনুত্তেজিত, শান্ত স্বরে কথাগুলো বলে গঙ্গাপ্রসাদ হাসলেন। ‘মনে হচ্ছে আপসেট হয়ে পড়েছ, ভয় পাচ্ছ?’
রোহিণী শুধু তাকিয়ে রইল তার সামনে গোলাকার, স্মিত হাসিতে ভরা, অভয় দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা মুখটির দিকে।
‘কত বছর হল!’
‘ছ—বছর।’
‘কোনোরকম যোগাযোগ কি তুমি রেখেছ?’
‘না। একবারও নয়। আমার কোনো দরকার নেই যোগাযোগের, মনে হয় কোনোদিন দরকার হবেও না। আর ওর তরফ থেকেও সম্ভবত এই একই বক্তব্য।’
‘তোমার মনোভাব দেখছি এখনও একই রয়ে গেছে।’
‘বদলাবার মতো কোনো কারণ তো ঘটেনি।’ রোহিণী খবরের কাগজটা তুলে চোখের সামনে ধরল। তার মুখের পেশি কঠিন দেখাচ্ছে।
‘তুমি কীভাবে আছ, কোথায় আছ, শোভনেশ জানে না?’
‘না, জানার কথা নয়।’
‘তাহলে তো তোমার ভয় পাওয়ার কথা নয়। এই তিরিশ—চল্লিশ লাখ লোকের শহরে একজনকে খুঁজে বার করা কি সহজ ব্যাপার? তা ছাড়া ওরও তো ধরা পড়ার ভয় থাকবে, অবশ্যই এই পলাতক আসামি যদি শোভনেশই হয়।’
‘গঙ্গাদা, আপনি আপনার বন্ধুটিকে ভালোই চেনেন, আমার থেকেও ভালো চেনেন। আপনাদের মধ্যে আলাপ কলেজ—জীবন থেকে, তার মানে আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে। আমি চিনি মাত্র বিয়ের আগে চার মাস আর তারপরে ছ—মাস।’
একষট্টি বছর বয়সি লোকটি অস্বস্তি ভরে নড়ে উঠে, গলা পরিষ্কার করে বললেন, ‘শোভনেশ একটু অন্য ধরনের, অদ্ভুত চরিত্রেরই। কতগুলো ব্যাপারে, বিশেষ করে নিজের পেশা ছবি আঁকার ব্যাপারে বড়ো কঠিন আর নির্মম ছিল।’
‘দানব ছিল বলুন।’
গঙ্গাপ্রসাদ আড় চোখে ঘৃণায় দোমড়ানো রোহিণীর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে হালকা স্বরে বলে উঠলেন, ‘অতীতটা অতীতেই থাক, এবার বর্তমানের খবর বল। তারপর তোমাদের কদ্দূর, মানে দ্বিতীয়বার আমার উইটনেস হবার চান্সের কদ্দূর?’
শোভনেশের সঙ্গে রোহিণীর রেজিস্ট্রি বিয়েতে গঙ্গাপ্রসাদ সাক্ষী ছিলেন।
‘এখনও আমার ডিভোর্স হয়নি। এখনও আমি মিসেস সেনগুপ্ত।’
‘যার স্বামী খুনের দায়ে যাবজ্জীবন পেয়েছে, সে তো চাওয়ামাত্রই ডিভোর্স পাবে। কিন্তু তোমরা এগিয়েছ কতটা?’
‘আমি এবার হুঁশিয়ার হতে চাই গঙ্গাদা। দশ বছর আগে যে—চোখে পৃথিবীকে দেখতাম, যেসব ধারণা মানুষ সম্পর্কে করতাম, তার অর্ধেকটাই বদলে গেছে। নিজের সম্পর্কেও এখন আমি অন্যরকম ভাবি। এটা তো ঠিক, এক—একটা মেয়েকে সম্মান মর্যাদা নিয়ে শুধুমাত্র খেয়ে পরে যদি টিকে থাকতে হয়, তাহলে তাকে চালাক হতেই হবে। স্নেহ, মমতা, প্রেম, বন্ধুত্ব, সবকিছুকেই সন্দেহের চোখে দেখতে হবে। ঝোঁকের মাথায় কিছু করে ফেলার বয়স তো আর নেই।’
‘তুমি আমার সম্পর্কেও এখন তাহলে সন্দিহান?’
‘এই একটা জায়গায় আমি সবথেকে নিরাপদ।’ রোহিণী আজ এই প্রথম সহজভাবে হাসল। দেখা গেল বাঁদিকের গজদাঁতটি। দেহ শিথিল করে চেয়ারে হেলান দিল।
‘সত্যিকারের দাদা।’
‘আমি তোমার থেকে কত বছরের বড়ো? ছাব্বিশ, সাতাশ?’
‘সব্বোনাশ, তাহলে তো বাবার বয়সি প্রায়!’ রোহিণী আঁতকে ওঠার ভান করল। ‘তাহলে যে গঙ্গাকাকা—টাকা বলতে হয়।’
‘শোভনেশের সঙ্গে তোমার বয়সের ডিফারেন্স কত?’
‘ঠিক পঁচিশ বছরের।’
‘ও আমার থেকে দু—বছরের ছোটো। আর রাজেনের সঙ্গে তোমার?’
‘আমার থেকে ও চার বছরের ছোটো, রাজেনের এখন তিরিশ।’
‘তোমার তাহলে এখন…।’ টেলিফোন বেজে উঠল। বাক্যটি অসম্পূর্ণ রেখে গঙ্গাপ্রসাদ লাল রিসিভার তুললেন।
‘ব্যানার্জি। …ওহ বরুণা…হ্যাঁ হ্যাঁ আমি ঠিক সাড়ে পাঁচটায় বাড়ি পৌঁছব। গোছগাছ এর মধ্যেই করে ফেলেছ? এখন তো মাত্র…।’ হাতঘড়ি দেখলেন গঙ্গাপ্রসাদ ‘পৌনে চারটে। আচ্ছা বাবা আচ্ছা, এখনি যাচ্ছি। …ঘরে কে রয়েছে? রোহিণী….দিচ্ছি।’
গঙ্গাপ্রসাদ রিসিভারটা বাড়িয়ে ধরলেন। কে ফোন করছে বলার দরকার হল না।
‘হ্যালো।’ হালকা গলায় রোহিণী শুরু করল। সে জানে, ওধার থেকে যিনি কথা বলছেন, তাঁকে একাই কথা বলতে দিতে হবে। তার কাজ শুনে যাওয়া।
‘বউদি আমি…’
‘রোহিণী, আমরা বিকেলে বাসুদেবপুর যাচ্ছি, গাড়িতে, তিন দিন থাকব, রবিবার রাতে ফিরব, তুমিও চলো আমাদের সঙ্গে, তোমার দাদা অবশ্য কালই ফিরবে কিন্তু আমার সঙ্গে রবিবার ফিরবে, একা একা থাকতে ভালো লাগবে না, মোটরে খুব বেশি হলে ঘণ্টা দুই। তুমি তো গ্রামট্রাম দ্যাখোনি কখনো মানে ট্রেন থেকে দেখেছ, তাই তো? কিন্তু থেকেছ কখনো? অসম্ভব ভালো লাগবে বিশেষ করে মাঘ মাসেই এই সময়টায়। ভোরবেলা মাঠে কুয়াশা, ঘাসে শিশির, খালিপায়ে হাঁটতে যা লাগবে! হ্যাঁ, খেজুর রসও পাবে, আমাদের প্রায় দশটা খেজুর গাছ, না না এগারোটা; আর তোমায় মৌরলা মাছ খাওয়াব। আমাদের পুকুরের। ভাজা, চচ্চচড়ি, টক, আমিই রাঁধব; তুমি কি ভাবছ আমি রাঁধতে জানি না?’
‘বউদি…’
‘অ্যাঁ? মৌরলা কি তোমার পছন্দ নয়? চিংড়ি? গলদা যদি ওঠে, তাহলে নারকোল কুরে…তুমি কুচো চিংড়ি দিয়ে মোচার ঘণ্ট খেয়েছ? হ্যালো, হ্যালো,…তাহলে আসছ তো? শাড়িটাড়ি সব পাবে ওখানে, সব রাখা আছে, আমি তো ম্যাক্সি পরেই থাকি। অবশ্য আমার ব্লাউজ তোমার গায়ে হবে না, তাতে কিছু আসে যায় না, তুমি খালি গায়েই থেকো, ওখানে পুরুষমানুষ বলে কেউ নেই, তোমার দাদা তো কালই চলে আসবে। আর থাকলেই বা কি, ও মোটেই পুরুষমানুষ নয়, আমি জানি। ভালো কথা, তুমি কি সাঁতার জান? হ্যালো, হ্যালো, রোহিণী?’
