‘নিশ…চয়।’ গঙ্গাপ্রসাদ টেবলে চাপড় মারলেন। ‘ঠিক আছে শম্ভু তাহলে আর ওটা খোলার দরকার নেই।’
মলাটগুলো গুছিয়ে নিয়ে শম্ভু দত্ত দ্রুত বেরিয়ে গেল।
‘তোমার এবারের মহারানির লেখাটার টাইটেল একটু বদলে দিয়েছি, দেখেছ?’
‘হ্যাঁ ভালোই হয়েছে।’
‘একটু বেশি কাব্য কাব্য হয়ে গেছিল। লেখার বিষয় বা বক্তব্যটা আঁচ করতে অসুবিধে হচ্ছিল। সোজা সহজ আর ক্যাচি হওয়া দরকার, চোখ পড়লেই কৌতূহল জাগবে এমন টাইটেল চাই। চা খাবে?’
‘না।’
‘লিম্বু পানি? পাতিলেবুর রস, গোলমরিচ, সন্ধব নুন আর চিনি দিয়ে?’
‘চিনিটা বাদ।’
টেবিলের নীচে হাত ঢুকিয়ে গঙ্গাপ্রসাদ কলিং বেলের বোতাম টিপলেন। দশ সেকেন্ডের মধ্যেই ঘরে ঢুকল সেই ধুতি—শার্ট পরা শীর্ণকায় লোকটি, সিঁড়িতে রোহিণীর সঙ্গে যার দেখা হয়েছিল।
‘কমল দু—গ্লাস লিম্বু পানি, একটা চিনিছাড়া।’
কমল বেরিয়ে যেতেই গঙ্গাপ্রসাদ জানতে চাইলেন, ‘মীনা চ্যাটার্জির সঙ্গে আজ তোমার ইন্টারভিউ না?’
‘সাতটায়। টিভি সিরিয়ালেও নামছে, তাই নিয়ে নাকি ব্যস্ত।’
‘বড়ো পর্দা থেকে ছোটো পর্দায়! বোধহয় ফিল্মে আর তেমন সুবিধে হচ্ছে না। এরপর কি যাত্রায়?’
রোহিণী ফিকে হাসল। মীনা চ্যাটার্জিকে নিয়ে চিত্ররেখায় ফোটো ফিচারের প্রস্তাব গঙ্গাপ্রসাদেরই দেওয়া। সকালে বিছানা ছেড়ে ওঠা, যোগব্যায়াম থেকে শুরু করে রাতে ঘুমোতে যাবার আগে ড্রেসিং টেবলে বসে মুখ, গলা, হাতের চামড়ায় এটা সেটা মাখা, মোটামুটি শরীরটাকে নানান ভঙ্গিতে দেখাতে হলে যা যা করা দরকার, মীনা চ্যাটার্জির সেই সব করার ছবির এবং একটি সাক্ষাৎকারের জন্য চিত্ররেখা চার পাতা বরাদ্দ করেছে। ওটা পাঁচ বা ছয় পাতাও হয়ে যেতে পারে, যদি ম্যাটার কম পড়ে।
‘টিভি—র জন্য আলাদা একটা বিভাগ চিত্ররেখায় করব ভাবছি। হাজার হাজার পরিবারের মগজে টিভি জায়গা করে ফেলেছে। ভেবেছি, তোমাকেই এটার দায়িত্ব দেব। তুমি টিভি দেখ তো?’
‘আমার টিভি সেট নেই। উপরের চারতলায় আছে, কিন্তু গিয়ে দেখার আর ইচ্ছে হয় না। পরিবারের কথাটি একটু জালাতনে…।’
‘মানে?’
রোহিণী ঠোঁট চাপল। গালের পেশি একটু শক্ত হল এবং প্রসঙ্গ এড়াবার জন্য বলল, ‘আপনি কি টিভি দেখেন?’
‘ধুর! সময় কোথায়। ছুটির দিনে ওয়ান ডে ক্রিকেট ম্যাচ কয়েকটা দেখেছি, দারুণ একসাইটিং। আর একবার রাতে ঢাকার একটা নাটক দেখেছিলাম। বরুণা তো ঢাকারই প্রোগ্রাম দেখে, কলকাতার থেকে নাকি ফার বেটার। তবে নাটকটায় একটা জিনিস আমাকে স্ট্রাইক করল। ক্যারেক্টাররা সবই মিডলক্লাস শিক্ষিত মুসলমান অথচ ‘বাবা—মা’ বলল, এমনকী পানি না বলে জলও বলল। পায়ে হাতে দিয়ে হিন্দুদের মতো প্রণাম করল। উচ্চচারণে বাঙালে টানটোন নেই। মনে হচ্ছিল, কলকাতারই কোনো হিন্দু পরিবার। তোমাকে একটা পোর্টেবল সেট কিনে দেব, দেখো আর চিত্ররেখায় শুরু করে দাও।
ট্রে—তে দুটি গ্লাস নিয়ে কমল ঢুকল। ওরা গ্লাস দুটো হাতে তুলে নিল। প্রথম চুমুক দিয়েই গঙ্গাপ্রসাদ ‘আহ হ’ বলে ওঠার পর এবং কমল বেরিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেই রোহিণী ঝুলি থেকে ভাঁজ করা বাংলা একটা খবরের কাগজ বার করে এগিয়ে ধরল।
‘আজকের কাগজ। তিনের পাতায়, ফোর্থ কলামের একেবারে তলায় ছোট্ট খবরটা পড়ুন।’
গঙ্গাপ্রসাদ কাগজটা খুলে উপর দিকের হেডিংগুলোয় চোখ বোলাতে বোলাতে বললেন, ‘ভেতরের পাতাগুলো সকালে পড়ার আর সময় হয়ে ওঠে না। রাত্তিরে গিয়ে…।’ থেমে গেলেন। তাঁর বিরাট বপু হঠাৎ সামান্য ঝুঁকে পড়ল। কপালে ভাঁজ উঠল। তিনি তীক্ষ্ন চোখে রোহিণীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কোনো নাম তো দেয়নি।’
‘হ্যাঁ, নাম নেই। কিন্তু…’ ইতস্তত করে রোহিণী চুপ করে গেল।
‘পুলিশ সূত্রে পাওয়া খবরে জানা গেছে, বহরমপুর জেল থেকে যাবজ্জীবন কারাবাসের দণ্ড পাওয়া এক আসামী পালিয়ে গেছে। তাকে ধরার জন্য জোর তল্লাস চলছে। খবরটা নিজস্ব সংবাদদাতার। এইরকম খবরের কোনো মানে হয়? কীসের আসামি, কী তার নাম, কবে জেল ভেঙে পালিয়েছে, সে সব কিছুই নেই। এটা কি একটা রিপোর্ট হল!’ গঙ্গাপ্রসাদ কাগজটা বিরক্তিভাবে ছুড়েই প্রায় টেবিলে রাখলেন।
দু—হাতের তালুতে গাল চেপে ধরে গোঁজ হয়ে তাকিয়ে রইলেন দেওয়ালের ডিসপ্লে বোর্ডের দিকে।
‘পড়েই বুকটা কীরকম ছ্যাঁত করে উঠল।’ রোহিণী প্রায় ফিসফিস করে বলল। ‘ওকে তো বহরমপুরেই রাখা হয়েছে।’
‘কেউ পালালে যে সেটা শোভনেশই হবে, তার কি কোনো কারণ আছে?’
গঙ্গাপ্রসাদ ড্রয়ার খুলে একটা ছোটো চামড়া বাঁধানো ডায়েরি বার করে, পাতা উলটে লাল ফোনে রিসিভারটা তুলে নিলেন। ডায়াল করতে করতে বললেন, ‘রাইটার্সে আইজি প্রিজনস—এর কাছ থেকে খবর পাই কিনা দেখি।’
রোহিণী সিধে হয়ে বসল। হাতের মুঠিতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল ঝুলিটা। একদৃষ্টে সে তাকিয়ে রইল গঙ্গাপ্রসাদের মুখের দিকে।
‘হ্যালো আই জি প্রিজনস—এর অফিস? …হ্যালো, আমি ইস্টার্ন ম্যাগাজিন থেকে বলছি। আইজি আছেন? …নেই? দেখুন আমি একটা খবর জানতে চাই। আজ কাগজে একটা খবর বেরিয়েছে; বহরমপুর জেল থেকে একজন যাবজ্জীবনের আসামি পালিয়েছে, ওর নামটা কি আপনারা বলতে পারেন? ….হ্যাঁ ধরছি।’
রোহিণী ঝুঁকে পড়ল টেবলে। টেলিফোনে ওধার থেকে কী খবর দেয়, সেটা যেন সে নিজেই শুনে নিতে চায়।
