গঙ্গাপ্রসাদ সাদাসিধে ধরনের। যতটুকু না হলেই নয়, শুধু ততটুকুরই পক্ষপাতী। প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চচ বলেই নিজের কামরাটিকে মূল্যবান, সুদৃশ্য জিনিস দিয়ে সাজাতে হবে এমন চিন্তা তিনি করেন না। যতটুকু সজ্জা বা আসবাব, সেটা তাঁর স্ত্রী বরুণার নির্দেশে হয়েছে। স্ত্রীকে তাঁর ভয় পাওয়ার ও ভালোবাসার কথা অফিসের বেয়ারাও জানে। বরুণার জন্যই তাঁকে টাই পরে বাড়ি থেকে বেরোতে হয় এবং অফিসে পৌঁছে গাড়ি থেকে নামার আগে সেটি খুলে তিনি পকেটে রেখে দেন। একবার টুপি পরার প্রস্তাব বরুণা দিয়েছিল এবং গঙ্গাপ্রসাদ ঢোঁক গিলে বলেছিলেন, ‘গরমের দেশে ওসব মাথায় দিলে চুল উঠে টাক পড়ে।’ বরুণা সঙ্গে সঙ্গেই প্রস্তাব প্রত্যাহার করে।
আটানব্বুই কিলোগ্রামের সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চচতার শরীরের ভার চেয়ারের পিঠে এলিয়ে দিয়ে গঙ্গাপ্রসাদ এখন প্রকাশিতব্য বাচ্চচাদের ম্যাগাজিন ‘শৈশব’—এর প্রথম সংখ্যার জন্য নির্ধারিত মলাটের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে। টেবলে ছড়ানো আরও দুটি ওই একই মলাট, তবে রঙের ভিন্ন সমন্বয়ে। কোন রঙেরটি দিয়ে শৈশব শুরু হবে, তার চূড়ান্ত নির্বাচনে তিনি ব্যস্ত বা চিন্তায় মগ্ন।
আর্ট ডিরেক্টর শম্ভু দত্ত দশ মিনিট ঠায় বসে। মাঝে দু—বার কথা বলার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু গঙ্গাপ্রসাদের ভ্রূকুটি দেখেই গভীরভাবে মলাট অধ্যয়নে নিজেকে নিযুক্ত করে টেবলের অপর দিকের চিন্তাস্রোত কোন খাতে বইছে, সেটা আড়চোখে বোঝার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
গঙ্গাপ্রসাদের ভ্রূ যতটা উঠেছে, ঠিক ততটাই ঝুলে রয়েছে দুই স্তরে চর্বির চিবুক। গোলাকার বিরাট মুখটিতে ঘামের বিন্দু ফুটেছে। আনমনে গঙ্গাপ্রসাদ বন্ধ এয়ারকুলারের দিকে তাকাতেই শশব্যস্ত শম্ভু দত্ত বলল, ‘চালিয়ে দেব?’
‘না। কিন্তু তুমি যে কেন এই কালো রঙের ত্যারচা দুটো স্ট্রিপ কোণে রাখতে চাইছ বুঝছি না।’ গঙ্গাপ্রসাদ হাতের মলাটটি টেবলে ছুড়ে ফেলে বললেন। ড্রয়ার টানলেন রুমাল বার করার জন্য। সাত—আটটি রুমাল সেখানে।
‘তাহলে কি তুলে দেব?’ শম্ভু দত্ত ক্ষীণস্বরে জানতে চাইল। গঙ্গাপ্রসাদ ছয় বছর আগে প্রথম যখন চিত্ররেখা প্রকাশ করে ম্যাগাজিন ব্যবসায়ে নামেন, শম্ভু দত্ত তখন থেকেই রয়েছে। সে জানে, তর্ক করে লাভ নেই।
‘কালো রঙটার বদলে মেরুন দাও। আর এই বাচ্চচাটার জাঙিয়াটা…।’ গঙ্গাপ্রসাদ আবার ভ্রূ কোঁচকালেন, ‘খুলে দিলে কেমন হয়, পেছন ফিরেই তো রয়েছে।’
শম্ভু দত্ত চোখ সরু করে মলাটে দৃষ্টি রাখল। জাঙিয়াপরা আদুড় গা, একটি শিশু সিঁড়ি দিয়ে ওঠার জন্য প্রথম ধাপে পা রেখেছে। কয়েক ধাপ উপরে দুটি কিশোর—কিশোরী সিঁড়ি দিয়ে উঠে যেতে যেতে পিছনে হাসিমুখে শিশুটির দিকে তাকিয়ে। পরিকল্পনাটা গঙ্গাপ্রসাদেরই, অর্থাৎ বরুণার। শৈশব ধরতে চায় কৈশোরকে।
‘বুবুনের ছোটোবেলার এইরকম একটা ছবি আছে।’ ‘গঙ্গাপ্রসাদের স্বর কোমল ও গাঢ় শোনাল। ‘ওর মায়ের তোলা। কলকাতায় চৌব্বাচার পাড়ে রাখা বালতি ধরার জন্য যেই দু হাত তুলেছে আর তখনই পিছন থেকে স্ন্যাপ নিয়েছিল। আমরা তখন দর্জিপাড়ার বাড়িতে থাকি। আজও যখন ছবিটা দেখি, ইচ্ছে করে কোলে নিয়ে খুব একচোট ধামসাই। যা নাদুসনুদুস ছিল। অথচ সেই বুবুন এখন জার্মানিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। দেখ শম্ভু, ম্যাগাজিন তো আর বাচ্চচারা পকেট থেকে পয়সা বার করে কিনবে না, কিনবে তাদের বাবা—মা। ফিগারটা ভালোই হয়েছে, তুমি বরং জাঙিয়াটা খুলে দাও, বাৎসল্য রসকে ইনভাইট কর। দেখলেই কোলে তুলে নিতে ইচ্ছে করবে এমনভাবে বাচ্চচাটাকে প্লেস কর, পাছা দুটো নরম নরম করে দাও।’
মলাটটা আবার তুলে নিয়ে গঙ্গাপ্রসাদ মৃদু মৃদু হাসতে লাগলেন। সেই সময় দরজা খুলে সন্তর্পণে মুখ বাড়াল সেই রমণী, যাকে কিছুক্ষণ আগে হেঁটে আসতে দেখা গেছে।
‘আসব?’
গঙ্গাপ্রসাদ মুখ তুলে দেখেই চেয়ারে সোজা হয়ে বসার চেষ্টা করতে করতে বললেন, ‘আরে রোহিণী, তোমার কথাই ভাবছিলুম। এসো এসো একটু পরামর্শ দাও তো।’
রোহিণী কাঁধ থেকে ঝুলিটি নামিয়ে শম্ভু দত্তর পাশের চেয়ারটিতে বসামাত্র গঙ্গাপ্রসাদ মলাটটি তার সামনে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এই বাচ্চচাটাকে তোমার কেমন লাগছে? টেন্ডার, সুইট, সফট নয় কি?’
রোহিণী একঝলক তাকিয়ে স্মিত হেসে মাথা নাড়ল।
‘জাঙিয়াটা খুলে দিলে কেমন হয়। এইটুকু বাচ্চচার কি সেক্স থাকে।’
‘না না ওটা থাক।’ রোহিণী ব্যস্ততা দেখাল না বটে তবে কণ্ঠে দৃঢ়তা ফুটে উঠল।
গঙ্গাপ্রসাদ অপ্রতিভ হয়ে শম্ভু দত্তর ভাবলেশহীন মুখের দিকে বার কয়েক আড়ে তাকিয়ে অস্ফুট বললেন, ‘কিন্তু আমার কেমন যেন একটা আদর করার ইচ্ছে …বুবুনের ছবিটা মনে পড়ার জন্যই বোধহয়…।’
শম্ভু দত্ত ইতিমধ্যে রোহিণীর সমর্থন পেয়ে সাহস সঞ্চয় করে ফেলেছে। সে গলাখাঁকারি দিয়ে বলল, ‘পয়সা দিয়ে যারা পাঁচ টাকার ম্যাগাজিন কিনবে, তারা মোটামুটি সচ্ছল, শিক্ষিতও। নিশ্চয় রুচিও আছে। তারা কি বাড়িতে বাচ্চচাদের ন্যাংটো রাখে বা এইভাবে দেখতে চায়? সাধারণত বস্তিটস্তি বা গ্রামট্রামে গরিবঘরের ছেলেপুলে ন্যাংটো থাকে।’
‘আমি ঠিক সেদিক থেকে ভেবে ‘না’ বলিনি।’ রোহিণী মুখ ঘুরিয়ে শম্ভু দত্তর দিকে তাকিয়ে বলল। ‘বাচ্চচাটা জাঙিয়া পরেছে বলেই দেখতে ভালো লাগছে, আর এটাই তো প্রধান বিবেচ্য বিষয়—ভালো লাগা, তাই তো?’
