‘এখানে একটা মোটরবাইক ছিল না?’
মন্তার চোখ বড়ো হয়ে উঠল, ‘ভটভটিয়াটা?…সে তো চোরেরা ওই জানালা ভেঙে খুলে নিয়ে গেছে…দুটো চাকা, আলোটা, বসার সিটটা। …ওটা কার ছিল জানেন?’
‘না।’
তারা দোতলায় পৌঁছে গেছে। মন্তা তালা খুলছে, সে ডান দিকে ছাদের দিকে তাকাল। ছাদটা পরিষ্কার করা হয়েছে। মন্তা ঘরে ঢুকে বলল, ‘আজ সকালে মা পরিষ্কার করিয়েছে বুলিদিকে দিয়ে।’
বুলিদি! নামটা তার কানে ঘটাং করে উঠল। এই দরজাটায় দাঁড়িয়ে মেয়েটা ‘মামি’ বলে ডেকে উঠেছিল। ছ—সাত বছরের রোগা কালো মেয়ে। না ডাকলে কী ঘটে যেত! সেই তক্তপোশ, টেবিল, ছোটো টুল সবই রয়েছে। টেবিলের উপর রাখা একটা ছোটো সুটকেশ, হেমন্তর হাত দিয়ে পাঠানো। সে এগিয়ে গিয়ে পুবের জানালাটার ছিটকিনি তুলে পাল্লা দুটোয় ধাক্কা দিল।
দাওয়ায় লোকদুটো বসে, সিঁড়ির ধাপে পারুল। জানালায় সে দাঁড়াতেই পারুল কথা বলতে বলতেই শাড়িটা কাঁধের উপর টেনে বিছিয়ে দিল। সে সরে এল জানালা থেকে।
‘বুলিদি কে?’
‘আমাদের কাজ করে। গোরু—হাঁস দেখে, মা—র সঙ্গে বাজারে যায়, কাপড় কেচে দেয়…খুব গরিব, আরও একটা বাড়িতে কাজ করে।’
‘বিয়ে হয়ে গেছে?’
‘কব্বে। দুটো ছেলে আছে, ওর বর ওকে ফেলে চলে গেছে কোথায়।’
বুলির বয়স এখন তেইশ—চব্বিশ হবে। নতুন কলসির ওপরে মাটির সরা, তার উপরে কাচের গ্লাস। তোশক, চাদর, বালিশ নতুন, হ্যরিকেনটাও।
‘এসব কিনল কে?’
‘কলকাতা থেকে হেমন্ত বলে একটা লোক পরশু এসেছিল। রথতলা থেকে ভ্যানরিকশায় করে কিনে এনেচে। …আপনি এখানে কতদিন থাকবেন?’ মন্তা টুলের উপর বসল। ওর মুখের দিকে সে চোখ কুঁচকে তাকাল। প্রশ্নটা সে নিজেকেও করেছে এই ঘরে পা রেখেই।
‘বলতে পারছি না…হয়তো সারাজীবন।’
‘সারাজীবন!’ মন্তা অবিশ্বাস করতেই পারে। কলকাতা থেকে একটা লোক এখানে কেন সারাজীবন কাটাতে আসবে? ‘কী করবেন?’
প্রশ্নটা বাসে আসার সময় তার মনেও উঠেছিল। তখন মনে পড়েছিল বাবার কথাগুলো, ‘তোর স্বাস্থ্য আছে, খাটবার ক্ষমতা আছে, তুই কেন বসা কাজ করবি? চাষবাস ভালোভাবে করতে পারলে তাতে অনেক পয়সা, মাটি হল সোনা। ….আমি তোকে জমি আর কিছু টাকা দিয়ে গেলাম এবার তুই যা করার কর।’ বাবা তখন জানত না তার ষোলোটা বছর কীভাবে নষ্ট হবে, সে সর্বস্বান্ত হবে।
‘ভাবতে হবে কী করা যায়। …তুমিই বল তো কী করা যায়?’
মন্তার মুখে অপ্রতিভ লজ্জা ফুটে উঠল। ‘আমি কী জানি।’
‘আচ্ছা, চাষ করলে কেমন হয়?’
‘চাষ! আপনি কী করে চাষ করবেন, আপনি কি চাষি?’
‘লোক দিয়ে করাব, যেমন তোমার মা করায়।’
‘মা—র তো জমি আছে, আপনার জমি কোথায়?’
তার কথা বলতে আর ভালো লাগছে না। ক্লান্তি এবার তার শরীর থেকে মনের ভিতর ঢুকে যাচ্ছে। পারুল কীভাবে তার এখানে থাকাটাকে গ্রহণ করবে সেটাই তাকে আন্দাজের গর্তে ফেলে দিয়েছে। এখনও পর্যন্ত আগেকার পরিচয়ের কোনো ঝলক ওর কথায় আচরণে ফুটে ওঠেনি, তাকে বন্ধুভাবে নেয়নি। শত্রুভাবে কতটা নিয়েছে সেটাও বোঝা যাচ্ছে না। পাঞ্জাবিটা খুলে সে সুটকেসের উপর রাখল। এখন চা পেলে ভালো লাগত। মন্তাকে কি বলবে? সে বিছানায় আলতো করে নিজেকে শুইয়ে নিয়ে চোখ বুজল।
‘মন্তা, তুমি আমার নাম জান না। আমাদের তো রোজ দেখা হবে, কী বলে তা হলে আমায় ডাকবে?’
মন্তা সমস্যায় পড়ে গেল। সম্ভবত ওর জীবনের প্রথম জটিল সমস্যা। সে নিঃশব্দে হাসতে শুরু করল। বহু বছর পর এটা তার প্রথম মজা পাওয়ার হাসি। ‘আমাকে একটু চা খাওয়াবে।’
ঘর থেকে মন্তা বেরিয়ে যাবার পর সে চোখ খুলল। জানালা দিয়ে দেখল সন্ধ্যা নেমে এসেছে। সে ঝুলি থেকে চার ব্যাটারির নতুন টর্চটা বার করে টেবিলে রেখে, বিছানায় ফিরে এসে আবার চোখ বন্ধ করল। বিবি বলেছিল, ‘পারুল আছে, সে তোমায় দেখবে…যাকে তুমি বিধবা করেছ….পারুলই এখন গোকুলানন্দর সব কিছু দেখছে।’
বিবি ভেবেচিন্তে ইচ্ছে করেই তাকে শাস্তিটা দিল। পারুলের মুঠোর মধ্যে তাকে তুলে দেওয়ার মতো নিষ্ঠুর সূক্ষ্ম কাজ ওর দ্বারাই সম্ভব। ‘খাওয়াপরার জন্য তোমাকে ভাবতে হবে না। আমাদের জমিজমার টাকা পারুলই আদায় করে, হিসেব রাখে। খরচখরচা বাদ দিয়ে যা থাকে আমাকে দিয়ে যায়। খুব সৎ মেয়ে। এবার থেকে অন্য খরচের মধ্যে তোমার খরচটাও ধরবে। তোমার যা দরকার ওর কাছ থেকে চেয়ে নেবে। তোমার খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা পারুলই করবে…আমি ওকে চিঠি লিখে দিচ্ছি।’
অনেকদূর পর্যন্ত ভেবে রেখে দিয়েছে বিবি, হয়তো জেল থেকে তার বাড়িতে পৌঁছনোর আগেই ছকে রেখেছিল। ছাব্বিশ নম্বর থেকে তাকে যুক্তিগ্রাহ্য উপায়ে তাড়ানোর বা কেউ প্রশ্ন করলে একটা স্বাভাবিক কারণ দেখানোর রাস্তাও খুলে রেখেছে… ‘গ্রামে এগ্রিকালচারাল ফার্ম করবেন বলে গেছেন।’ কেন যে সে নিজে থেকেই কথাটা বলল ‘ভেবে দেখলাম, আমি গোকুলানন্দে গিয়েই থাকব’, তা হলে বিবির ইচ্ছেটা এত তাড়াতাড়ি পূরণ হত না। পারুল গোকুলানন্দে বসবাস করছে এটা যদি সে ঘুণাক্ষরেও জানত! কী বোকামি, না জেনে কী ভুল সে করে বসল কথাটা বলে। এখন তাকে পারুলের হাত—তোলা হয়ে থাকতে হবে!
‘অসম্ভব। গোকুলানন্দে থাকতে পারি কিন্তু পারুলের সঙ্গে কোনোরকম সম্পর্ক থাকবে না…আর জমিজমা এবার থেকে আমি নিজে দেখব।’ বিবি শান্ত গলায় ধীরে ধীরে বলেছিল, ‘তা কী করে হয়? এত বছর ধরে পারুল দেখাশোনা করছে, নিয়মিত টাকা দিয়ে যাচ্ছে, পুরো কর্তৃত্ব আমিই ওকে দিয়েছি। এখন কী যুক্তিতে আমি তা কেড়ে নেব?…বাচ্চচা নিয়ে অসহায় একটা মেয়ে বিধবা হল…,’ বিবি তার মুখের দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে ছিল, ‘তাকে তো আমায় দেখতে হবে।’ ‘কীজন্য তোমায় দেখতে হবে?’ ‘বিবেক…তার জন্য।’ বিবি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াতেই গুলু, গোরা, অরুণার দৃষ্টি তার উপর এসে পড়ে। ‘যেতে হয় যেয়ো, ইচ্ছে না হলে যেয়ো না। …তবে জমিজমার উপর অধিকার পেতে হলে তোমাকে কোর্টে যেতে হবে।’ বিবি ঠান্ডা গলায় কথাটা বলে নিজের ঘরে চলে গেছিল।
