তার অবস্থাটা যে কোথায় পৌঁছেছে সে তা ভাবতে পারেনি। নিজের সম্পত্তি ফিরে পাবার জন্য কোর্টের দরজায় যেতে বলল তার নিজের স্ত্রী! এর থেকে কতটা বেশি অপমান পারুল করতে পারবে? কে বলতে পারে, গোকুলানন্দে তার জন্য কী অপেক্ষা করে আছে? হয়তো পারুলের বিবেক ষোলো বছর ধরে আর বেঁচে নেই। চব্বিশ ঘণ্টা পরই সে বলেছিল, ‘গোকুলানন্দেই যাব।’
‘জেঠু, আপনার চা। হারিকেনটা জ্বালেননি?’
বিছানা থেকে উঠে টর্চটা তুলে নিয়ে জ্বালতেই দু—হাতে একটা কাচের গ্লাস ধরে মন্তা সাবধানে পঙ্গু পা ফেলে ঘরে ঢুকল। তাড়াতাড়ি গ্লাসটা ওর হাত থেকে নিয়ে বলল, ‘তুমি কেন এই গরম গ্লাস হাতে সিঁড়ি ভাঙতে গেলে?’
‘মা এই পর্যন্ত দিয়ে গেল।’ মন্তা দরজার দিকে মুখ ফেরাল। সে অনুমান করল গ্লাস নিয়ে দরজা পর্যন্ত ছেলেকে পৌঁছে দিয়েই পারুল নীচে নেমে গেছে। চায়ে চুমুক দিয়ে বিশ্রী একটা স্বাদ সে পেল। খুব কমদামি, নয়তো খুব বাসি চা দিয়ে তৈরি, না হলে পারুল ভালোই তো চা বানাত। সে গ্লাসটা রেখে হারিকেন জ্বালাল।
‘জেঠু’ বলতে কে বলে দিল?’
‘মা।’
শ্রীগোপাল তার থেকে বয়সে কিছু বড়ো ছিল, এটা তো পারুল জানে, তা হলে জেঠু কেন! ‘আমার চা কিংবা খাবার তুমি এভাবে আনবে না। হয় আমি নীচে গিয়ে নিয়ে আসব, নয়তো তোমার মা যেন ঘরে এসে দিয়ে যায়।’
কয়েক সেকেন্ড থেমে বলল, ‘…আমি যখন ঘরে থাকব না। বলতে পারবে?’
‘হ্যাঁ। আমি এখন যাই। মা বলে দিল যখন কিছুর দরকার হবে জানালা দিয়ে চেঁচিয়ে ‘মন্তা’ বলে ডাকতে।’
এখন থেকে এই ঘরটাই তার সংসার, বাসস্থান। যেভাবে ঘরটা রয়েছে এখন সেইভাবেই থাক, কাল সকালে বরং সুটকেস খুলে কাপড়চোপড় বার করবে, টাঙাবার জন্য একটা দড়ি দরকার। প্রায় দু—হাজার টাকা হাতে রয়েছে, কিছু কেনার দরকার আছে কিনা সেটা দু—তিনদিন না কাটলে বোঝা যাবে না। তবে রথতলায় চা—পাতার খোঁজে তাকে যেতে হবেই।
‘জেঠু…জেঠু।’ মন্তা চেঁচাচ্ছে নীচের থেকে। সে জানালায় গিয়ে দাঁড়াল। ‘মুড়ি খাবেন, তেলমাখা মুড়ি…লংকা পেঁয়াজ দিয়ে?’
‘খাব।’
ঝুলি থেকে কাগজে মোড়া হাওয়াই চটিটা বার করে সে পায়ে গলাল। পারুল উপরে মুড়ি দিতে এলে, এই নিরালা ঘরে কয়েক সেকেন্ডের জন্য হলেও, একটা দমবন্ধ করা অস্বস্তি তৈরি হবে। নির্জনে সে পারুলের চোখের দিকে তাকাতে চায় না।
দাওয়ায় বসে পারুল মুড়ি মাখছে তেল দিয়ে। মন্তা পেঁয়াজ ছাড়াচ্ছে। উনুনে হাঁড়ি বসানো, ভাতের গন্ধ ধোঁয়ার সঙ্গে উড়ে ছড়িয়ে পড়েছে উঠোনে। গোয়ালের পাশে হাঁসের ঘর থেকে একবার ‘প্যাঁক প্যাঁক’ ডাক উঠল। সে উঠোনে অন্ধকারের মাঝে দাঁড়িয়ে। আকাশ পাতলা মেঘের একটা জায়গা সামান্য উজ্জ্বল। ওখানে চাঁদ। আমবাগান, বাঁশঝাড়, ধানখেত একাকার একটা ছায়ার মতো । জোলো বাতাসে বৃষ্টির গুঁড়ো। সে দূরে হারিকেনের দোলা দেখতে পেল, কেউ একজন চলেছে। কতকগুলো ধাপ পেরিয়ে জীবন তাকে এই উঠোনের মাঝে দাঁড় করিয়েছে? সব কিছুর জন্য কি সে একাই দায়ী? ওই যে স্ত্রীলোকটি দাওয়ায় বসে, ছাব্বিশ সূর্য গাঙ্গুলি স্ট্রিটে যে স্ত্রীলোকটি পরীক্ষার খাতা দেখছে বা টেলিফোনে কথা বলছে, এই যে ছেলেটি, তার বাবা…।
‘কে, কে ওখানে?’ পারুল হারিকেন তুলে ধরেছে। সে এগিয়ে গেল। পারুলের চোখে ভয়।
‘আমি। মুড়ি খেতে এলাম।’
‘এভাবে কেউ দাঁড়িয়ে থাকে অন্ধকারে?’ পারুলের স্বরে অনুযোগের ধমক। মন্তা হাসছে। বাবার মতো দাঁত বেরিয়ে এসেছে।
‘মা—র ভূতে ভয় করে…অপঘাতে মরলে মানুষ ভূত হয়, এখানে বাবার ভূত আছে।’
‘চুপ কর!’ তীক্ষ্ন গলায় পারুল ধমকে উঠল। যে অস্বস্তিতে পড়তে না চেয়ে সে দোতলা থেকে নেমে এসেছে, সেটাই এখন তার আর পারুলের মাঝে তৈরি হয়ে গেল। বিবি কি এটাই চেয়েছে?
একটা অ্যালুমিনিয়ামের ছোটো গামলায় পেঁয়াজ, লংকা আর তেলমাখা মুড়ি তুলে ছেলের দিকে এগিয়ে দিয়ে পারুল চাপা স্বরে বলল, ‘দিয়ায়।’
মন্তা উঠে দাঁড়াবার আগেই সে গামলাটা তুলে নিল। ছোটো ছোটো লালচে মুড়ি। সঙ্গে আস্ত পেঁয়াজ, কাঁচালংকা। সে নাকের কাছে গামলাটা তুলে গন্ধ শুঁকল। আপনা থেকেই সে ‘আহহ’ বলে উঠল। একগাল মুড়ি মুখে দিয়ে পেঁয়াজ কামড়াল, দাঁতে লংকা কাটল। মা আর ছেলে তার দিকে তাকিয়ে।
‘লংকাটায় বেশ ঝাল, বাড়ির গাছের নাকি?’ জিজ্ঞাসাটা মন্তাকে উদ্দেশ করে, জবাব দিল পারুল, ‘হ্যাঁ,…মন্তা পড়া আছে না? বই নিয়ে বসবি কখন?’ কথাটা বলে পারুল ভাতের হাঁড়িতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
সে পায়ে পায়ে সরে গেল অপ্রতিভ হয়ে। মুড়ি দোতলায় ঘরে বসে খাওয়া যায় কিংবা উঠোনে পায়চারি করতে করতে। সে অন্ধকার রাস্তার দিকে এগিয়ে গেল। একটু দূরে শরৎ বসাকের বাড়ি। ঠিক কোন বরাবর তাকালে বাড়ির আলো চোখে পড়বে বুঝতে পারছে না। সে আর একটু এগোল।
‘জেঠু, অন্ধকারে যাবেন না।’ মন্তার চিৎকার তার কানে এল। ‘মা বলছে সাপখোপ আছে।’
সে এগোল না। সাপের কামড়ে মরা মানে অপঘাতে মরা। শ্রীগোপালের সঙ্গে তা হলে সেও ভূত হয়ে এখানে রয়ে যাবে। ভূত ভূতকে দায়ের কোপ বসায় না, একসঙ্গে তাকায় তাদের কোনো অসুবিধে হবার কথা নয়। …সেদিনও কথা ছিল না যে সে পারুলকে জড়িয়ে ধরবে, চুমু খাবে, তাকে বিছানায় শুইয়ে দেবে…কথা ছিল না শ্রীগোপালের দশ হাজার টাকার মাল পুলিশে ধরবে, সেই মাল দু—হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে ছাড়িয়ে আনতে তার মাথায় রক্ত চড়ে যাবে, সারা দিন অভুক্ত থাকবে। তবু ঘটে গেল!
