তার মুখ তখন পুবের জানালাটার দিকে ঘুরে যায়। উঠোন থেকে চিৎকার করছে শ্রীগোপাল, ‘পারুল…পারুল।’
আট
‘তারপর আসামি আপনার দিকে এগিয়ে এসে কী করল?’
‘আমাকে পাঁজাকোলা করে তুলে ঘরের খাটে নিয়ে ফেলল।’
‘আপনি বাধা দেননি?…চেঁচাননি?’
‘ডান হাতটা আটকা ছিল বগলের নীচে, বাঁ হাতে কোনোরকমে ওর ডান কাঁধটা খামচে ধরি। …গলা দিয়ে তখন স্বর বেরোচ্ছিল না।’
‘খামচে ধরা ছাড়া আর কী করেছিলেন বাধা দেবার জন্য?’
‘ও তখন আমার বাঁ হাতটা মুচড়ে ধরে।’
‘হাসপাতালে মেডিক্যাল পরীক্ষার সময় ডাক্তারকে সে কথা বলেছিলেন?’
‘হ্যাঁ।’
ডাক্তারকে সে বলেছিল ‘এটা জোয়ালের ধাক্কাতেই।’ ডাক্তার টর্চ জ্বেলে মন দিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন…ডাক্তারবাবু আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, রিপোর্টে লিখেছিলেন ইনজুরিটা ভারী কিছুর ধাক্কা লাগার জন্য। উকিল আর পুলিশের শেখানো কথা পারুল কোর্টে দাঁড়িয়ে অম্লানবদনে বলেছিল। সে তখন স্তম্ভিত হয়ে দেখছিল শুধু আর—একটা পারুলকে, যাকে সে কোনোদিনই দেখেনি।
এইখানেই সে মোটরবাইকে বসে বলেছিল ‘উঠে পড়ো।’ খালপাড় থেকে খামারবাড়ির লালমাটি ফেলা রাস্তায় দাঁড়িয়ে সে দেখল বাঁশ আর আমবাগানটা একইরকম রয়েছে। পুকুরে কতকগুলো হাঁস, ঘাটলায় বসে ছিপ হাতে একটি লোক, তার পিছনে দাঁড়িয়ে হাফপ্যান্ট পরা শার্ট গায়ে রুগণ একটি ছেলে। তাকে দেখতে পেয়েছে ছেলেটা, পুকুরের ধার দিয়ে এগিয়ে আসছে। ছেলেটা ল্যাংচাচ্ছে বোধহয় পোলিয়ো।
‘কাকে খুঁজছেন?’
‘পারুল বিশ্বাসকে।’
‘কলকাতা থেকে আসচেন…মালিকের লোক?’
‘হ্যাঁ।’
‘এখানে থাকবেন বলে?’
‘হ্যাঁ। তুমি চেনো পারুল বিশ্বাসকে?’
‘আমার মা হয়…এই রাস্তা ধরে সোজা গেলেই আমাদের ঘর। …মা বলেছিল একজন কলকাতা থেকে আসবে, এখানে থাকবে।’
ছেলেটার মুখ দেখেই তার আন্দাজ করা উচিত ছিল। শ্রীগোপালের মতোই লম্বাটে, সামনের দুটো দাঁতও হয়েছে বাবার মতো। চোখদুটোয় সারল্য, কম বুদ্ধির ছাপ, কথা বলতে চায় লোকের সঙ্গে। বাঁ পা শুকিয়ে লাঠির মতো সরু। সে খুব ধীরে হাঁটতে শুরু করল, ছেলেটা তার সঙ্গ নিয়েছে।
‘লোকটা কীরকম দেখতে সে কথা মা বলেনি?’
‘বলেচে খুব লম্বা চওড়া, সাহেবদের মতো রঙ আর কটা চোখ।’
‘নাম বলেছে?’
‘না। …আপনার নাম কী?’
প্রশ্নটাকে গ্রাহ্যে না এনে বলল, ‘আমায় দেখে চিনতে পেরেছ?’
‘হ্যাঁ।’
‘তোমার নাম কী?’
‘শ্রীমন্ত…মন্তা।’ ছেলেটা মুখ তুলে তাকাল। দাঁত দুটো বেরিয়ে এসেছে। সে চোখ সরিয়ে নিয়ে সামনে তাকাল। এখন বিকেলের মাঝামাঝি, আকাশের আলোয় এখনও টান পড়েনি। খামারবাড়ির দোতলার জানালাটা দেখা যাচ্ছে। একটা কাঁঠাল গাছ, তার পিছনে খড়ে—ছাওয়া একটা ঘর। ঘরের পিছনে ঢালু একটা নীচু খড়ের চালা, ঢুকতে গেলে কুঁজো হতে হবে। নিশ্চয়ই গোয়াল।
‘পুকুরে হাঁস দেখলাম, কার?’
‘আমাদের, এগারোটা ছিল, এখন ন—টা। শ্যালে দুটো নিয়েছে।’
‘তুমি স্কুলে পড়ো?’
‘পড়ি…অঘোরনাথ প্রাথমিক বিদ্যালয়, কেলাস ফোর। বড়ো ইস্কুল সেই রথতলায় থানার পিছনে, আমার এই পা নিয়ে অতদূর যাব কী করে…এখানে ইস্কুল খুলতেই ভরতি হয়েছি।’ ছেলেটা হাসল। সরল বোকামিভরা হাসি। ওর বয়স এখন প্রায় সতেরো।
মন্তার উচ্চচারণে কলকাতার ছাপ, বোধহয় মায়ের সঙ্গেই সময়টা বেশি কাটে। পায়ের জন্য খেলাধুলা সম্ভব নয়, বন্ধুবান্ধব নিশ্চয় বেশি নেই। আমবাগানের পাশেই সবজির জমি, সেই জমির অর্ধেকটায় ধান লাগানো হয়েছে। ধানের মাথাগুলো সতেজ স্থির। চোখ জুড়ানো সবুজ। অথচ এখানে ছিল সরষে খেত, কলার বাগান, বেগুন, মুলো, টোমাটোর চাষও হত। পারুল চাষ বদলে দিয়েছে।
কাঁঠাল গাছটার বয়স সে জানে। ষোলো বছর দু মাস দশ দিন। একটা কালো গোরু গাছতলায়। দাওয়ায় পা ঝুলিয়ে বসে দুটি লোক পরনে রঙিন বুশশার্ট, ধুতি। পিছন ফিরে দাওয়ায় ওঠার সিঁড়ির ধাপে বসে এক স্ত্রীলোক, তিনজনে কথা বলছে।
‘মা।’ মন্তা চেঁচিয়ে উঠল, ‘এই দ্যাখো।’
স্ত্রীলোকটি মুখ ফিরিয়েই পিঠের উপর কাপড় টেনে দিয়ে উঠে দাঁড়াল, মাথায় তুলে দিল ঘোমটা। সে থমকে পড়ল অবাক চোখে। এই কি পারুল…এ কী চেহারা হয়েছে! একেই বোধহয় বলে দশাসই। গলায় ঘাড়ে চর্বি, মুখটা বড়ো দেখাচ্ছে, আঁচলে ঢাকা থাকলেও বোঝা যায় স্তনদুটো ঝুলে রয়েছে, কোমরের পরিধি দ্বিগুণ, দুটো হাত মসৃণ গোল, তলপেটে একটা ঢিবি। পরনে লাল ব্লাউজ, তুঁতে রঙের শাড়ি।
তার দিকে একপালক তাকিয়েই পারুল ঘরের মধ্যে চলে গেল। যাওয়াটা ওর দেহের ওজনের সঙ্গে একদমই খাপ খেল না, গতি আগের মতোই দ্রুত রয়ে গেছে। লোক দুটি তার দিকে তাকিয়ে। দেখে মনে হল চাষবাস করে, বয়স কম। পারুল ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ‘মস্তা এই নে চাবি, দোতলার ঘরটা খুলে দিয়ায়। …রাতে ভাত দিয়ে আসবে। টেবিলে হারিকেন দেশলাই আছে, কলসিতে জল ভরা আছে।’ শেষের কথাগুলো তাকে উদ্দেশ করে বলা। গলাটা একটু খরখরে এবং ভারী।
পারুল তার অবাক চাহনিটা নিশ্চয় লক্ষ করেছে, তাই মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। শরীরটা যে আগের মতো নেই, সেটা নিশ্চয় জানে। এজন্যই কি মুখ লুকোতে চাইছে, নাকি কোর্টে দাঁড়িয়ে মিথ্যা কথা বলার জন্য কিংবা স্বামীর খুনির প্রতি ঘৃণায়? সে মন্তার পিছনে খামারবাড়ির দিকে এগোল। একতলার বড়ো ঘরের কাঠের দরজাটা নেই, সেই জায়গায় বাঁশ আর চ্যাটাইয়ের একটা ঝাঁপ হেলান দিয়ে রাখা। মোটরবাইকটা এই ঘরে রাখা ছিল। এখনও রয়েছে কি? সে ঝাপের ফাঁক দিয়ে ভিতরে তাকাল। উত্তর দিকের দেওয়াল ভাঙা, জানালাটাও নেই। ঘরের অর্ধেকটা খড়ে বোঝাই, ধানের কয়েকটা বস্তা, ধান ঝাড়াইয়ের কাঠের পাটা…বাইকটা সে দেখতে পেল না।
