বুলি রঙিন ফ্রক পরেছে, তাকে ডেকে পারুল কিছু বলল। মেয়েটা ছুটে আসছে, সিঁড়িতে পায়ের ধুপধুপ শব্দ হল, ‘মামি বলল তুমি চা খাবে?’ ‘খাব।’ …চট করে বড়ো একটা জায়গায় খাবার জল আর একটা গ্লাস আগে নিয়ে আয়।’ ‘বড়ো জায়গা… কলসীতে?’ সে হেসে ফেলে বলেছিল, ‘হ্যাঁ।’ সে বোতলে জড়ানো কাগজ মুঠোয় দুমড়ে ঘরের একধারে ফেলে দিয়ে ছিপির প্যাঁচ এক মোচড়ে খুলে মদের গন্ধ শুঁকতে নাকের কাছে ধরল। তার ভালো লাগল। টুলটা ছাদে নিয়ে গিয়ে ওখানে বসে খেলে কেমন হয়? সে ছাদে এসে দেখল বহু বছরের আবর্জনা, গাছের শুকনো পাতা, কাগজ, গাছের ডালের টুকরো আর ধুলো, বৃষ্টির জলে লেপটে রয়েছে। এতবার এসেছে অথচ ছাদটাকে কখনো সে নজরই করেনি। ছাদটা পরিষ্কার রাখার দায় শ্রীগোপালের, কিছুই দেখে না।
মাথায় কাচের গ্লাস বসানো একটা স্টিলের জাগ দু—হাতে আঁকড়ে বুলি এল। জাগটা ঝকঝকে, এখনও গায়ে টিকিট সাঁটা, আজই বোধহয় প্রথম ব্যবহার হচ্ছে। মেয়েটা দাঁড়িয়ে তার জল খাওয়া দেখল। ‘মামা এসেছে?’ ‘না।’ ‘মামি কী করছে?’ ‘কাপড় পরছে।’ ‘চা আনতে পারবি?’ একটু ভেবে বলল, ‘না।’ ‘তুই এবার যা।’ অনেকদিন আগে এই জানালা থেকে চেঁচিয়ে শ্রীগোপাল বলেছিল, ‘গ্লাস দিয়ে যাও।’ পারুল দুটো স্টিলের গ্লাস নিয়ে আসে। হতাশ স্বরে শ্রীগোপাল বলে ‘কি বুদ্ধি! এই গ্লাসে কেউ মদ খায় না, জল খায়। কাচের গ্লাস আনো।’ পারুল কাচের গ্লাস পাঠিয়েছে, ও তাহলে জানে সে এখন কী খাবে। নাকি তাকে খুঁচিয়ে দিল খাবার জন্য!
বোতল থেকে সে গ্লাসে হুইস্কি ঢেলে অল্প জল মিশিয়ে চুমুক দিল। কড়া হয়ে গেছে। আর একটু জল দেবে কি না ভাবল, ইতস্তত করে জল দিল না। সে তাড়াতাড়ি গ্লাস শেষ করে আবার ঢালল, অল্প জল দিল, এবারও তাড়াতাড়ি শেষ করে খাটে বসল। সে টের পাচ্ছিল তার ভিতরে কিছু একটা ঘটে চলেছে। একটা অস্থিরতা বুক থেকে নীচে নেমে যাচ্ছে, চোখ ঝাঁ ঝাঁ করছে। তাড়াতাড়ি নেশা হবে বলে শ্রীগোপাল এইভাবে খায়। সে কী তাহলে শ্রীগোপাল হয়ে গেল…ঘোড়ামুখো…করাপ্ট। সে জাগটা মুখে তুলে ঢকঢক করে জল খেয়ে খাটে বসল। মুখ ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে তাকাল। ঘোলাটে আকাশ ছাড়া আর কিছু দেখার নেই। শান্তভাবে আকাশটা অপেক্ষা করছে দিনের মৃত্যুর। রাতে হয়তো বৃষ্টি নামবে। সে চমকে দরজার দিকে তাকাল, পারুল!
ওর মুখের দিকে তাকিয়েই তার চোখ স্থির হয়ে গেছিল। প্রকৃতির মধ্য থেকে যেন বেরিয়ে এসেছে এই পারুল। দু—পাট করে টানটান আঁচড়ানো চুলের মাঝখানে সরু সিঁথিতে সিঁদুর, আলতো একটা খোঁপা ঘাড়ের উপর, কপালের ঠিক মাঝে বড়ো একটা লাল রঙের টিপ, পরনে সেই মুর্শিদাবাদী সিল্কের চওড়া পাড় সোনালি বুটি দেওয়া লাল শাড়ি, ওই কাপড়েরই ব্লাউজ, মুখটা তেলতেলে, খুব সূক্ষ্ম কাজল। পারুল সেজেছে। এক হাতে পিরিচে ঢাকা চায়ের কাপ, অন্য হাতে তার পাজামাটা। ‘শুরু করে দিয়েছেন….চা খাবেন না?’ সে শুধু স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেছিল। উত্তরে ছাদের দরজা দিয়ে দুর্বলভাবে আলো আসছে, পুবের জানালার চৌকো এক খণ্ড ঘোলাটে আলো, পারুল সামনের টেবিলে চায়ের কাপ রাখতে এগিয়ে এল। হালকা একটা মিষ্টি গন্ধ ওর শরীর থেকে সে পেল। কাপটা বাঁ হাতে তুলে তার দিকে এগিয়ে ধরে পারুল বলেছিল, ‘কষ্ট করে করলুম আর….।’
সে তাকিয়েছিল পারুলের আঙুলে আংটিটার দিকে। ‘সত্যিই চমৎকার দেখাচ্ছে।’ ‘কী চমৎকার?’ সে কাপটা হাতে নিয়ে টেবিলে রেখে পারুলের বাঁ হাত তুলে নিল। মাথা ঝুঁকিয়ে আংটির উপর আলতো চুম্বন করল। পারুল হাতটা টেনে নিয়ে দু—পা পিছিয়ে যেতেই সে উঠে দাঁড়াল। ঘরে এখনও যা আলো রয়েছে তাতে সে দেখতে পাচ্ছে পারুলের চোখ। বড়ো বড়ো চোখ দুটোয় ভয় নেই, বকুনি নেই। ‘তোমার সব শখ কি মিটেছে…পারুল?’ সে উত্তর পেল না। তখনই সে দু—হাতে কাঁধ ধরে পারুলকে বুকে টেনে নিয়ে ছিল। একটা কোমল ‘নাহহ’ ছাড়া আর কোনো প্রতিরোধ সে পেল না। উন্মাদের মতো সে চুম্বন করেছিল, পিষে দিচ্ছিল ওষ্ঠপুট। পাতলা সিল্কের উপর দিয়ে ছোটাছুটি করা তার করতল অনুভব করছিল পারুলের শরীর ধকধক করছে তার মোটরবাইকের ইঞ্জিনের মতো গরম, ঊর্ধ্বশ্বাসে বেরোবার জন্য প্রস্তুত। তার কাঁধে বসে যাচ্ছে পারুলের আঙুল, জ্বালা করছে জায়গাটা, এই সুখের অনুভূতিটা সে চেয়েছে বিবির কাছে…
শিক্ষা, রুচি, পার্সোনালিটি….ঝিয়ের মেয়ে, শ্রীগোপালের বউ…চুলোয় যাক…পারুলকে টেনে তক্তপোশের উপর ফেলে দিয়ে সে ওর বুকের উপর নিজেকে নামিয়ে দিয়েছিল। ‘ছাড়ুন’, ‘না’, ‘ছাড়ুন বলছি’, ‘না’। সে টের পাচ্ছিল তার দেহের নীচে শক্ত শরীরটা আস্তে আস্তে শিথিল হয়ে যাচ্ছে, দুর্বল হয়ে যাচ্ছে ঊরুর পেশি। ‘আমায় দেখে মুখ ঘুরিয়ে চলে যেতেন’, ফিসফিস করে পারুল বলেছিল ‘…মনে আছে?’ ‘আছে…সে ছিল অন্য মেয়ে।’ এরপরই সে টান দিয়ে শাড়িটা পারুলের ঊরুর উপরে তুলে দেয়।
‘মামি…’ ছিটকে দুজনে উঠে দাঁড়ায়। আঁধার ঢুকে পড়েছে ঘরে। দরজায় একটা ছায়া, বাইরে পাখিদের অবিশ্রান্ত কিচিরমিচির। ‘কি চাই তোর?’ পারুল ভাঙা গলায় ধমক দিয়েছিল দরজায় দাঁড়ানো বাচ্চচা মেয়েটাকে। ‘মামা এয়েচে, তোমার ডাকচে।’
