সে বাইকের সাইড ব্যাগ থেকে সন্দেশের বাক্স আর খবরের কাগজ মোড়া হুইস্কির বোতল বার করল। ‘এটা তোমার আর এটা শ্রীগোপালের, তবে এটা এখন আমার কাছে থাকবে।’ বাক্সের গায়ে ছাপা নামটা পড়ে পারুল খুশি হয়ে বলেছিল, ‘অন্নদার মিষ্টি!’ বাক্স খুলে একটা গুজিয়া মেয়েটির হাতে দিয়ে বলল, ‘এ হল বুলি, বুড়ির নাতনি। মা নেই, বাপ আবার বিয়ে করেছে, দিদিমার সঙ্গে আমার এখানেই থাকে। একেবারে হাবাগবা, কোনো বোধবুদ্ধি নেই।’ ‘বয়স বাড়লেই বুদ্ধি বাড়বে, ও তো পিঠের তিল নয়। …আমি ওপরে যাচ্ছি। শ্রীগোপাল গেছে কোথায়?’ ‘ব্যবসার কাজে। ভোরেই খবর পেল দশ হাজার টাকার মাল পুলিশে ধরেছে, তাই ছুটেছে।’ সে অবাক হয়েই বলল, ‘দ—শ—হা—জা—র! তাহলে শ্রীগোপাল তো এখন বড়োলোক। ‘হ্যাঁ, রাতে ঘুমোতে পারে না।’
শ্রীগোপালের কাছ থেকেই সে মাসছয়েক আগে শুনেছিল, চোরাচালানের কারবারে নেমেছে। বিদেশ থেকে বাংলাদেশে যেসব রেডিমেড পোশাক সাহায্য বাবদ পাঠানো হয়েছে, সেগুলোই সীমান্ত পেরিয়ে চলে আসছে ভারতে। কলকাতায় চৌরঙ্গির ফুটপাথে সে দেখেছে স্তূপ হয়ে রয়েছে ফুলপ্যান্ট, গুদামে পচা অবিক্রিত সিন্থেটিক কাপড়ের আনকোরা জিনিস। পঁয়ত্রিশ—চল্লিশ টাকায় এত ভালো ভালো প্যান্ট বিক্রি হতে দেখে সে তাজ্জব হয়ে গেছিল।
‘চান করব। পরার মতো কিছু দিতে পার, শ্রীগোপালের লুঙ্গিটুঙ্গি যদি থাকে—’। ‘মলমটা মিছিমিছিই লাগালেন জলে তো ধুয়ে যাবে।’ পারুলের গলায় নরম বকুনি ছিল। ‘আর একবার নয় লাগিয়ে দিয়ো।’ পারুল ঘর থেকে একটা পাট করা সবুজ তাঁতের শাড়ি এনে বলল, ‘লুঙ্গি পরতে হবে না, বাসি নোংরা হয়ে আছে।’ শাড়িটায় বাক্সে তুলে রাখার গন্ধ। ‘তোমার শাড়ি পরতে হবে?’ ‘অন্যের বউয়ের শাড়ি পরতে হবে বলে কি লজ্জা করছে?’ ‘তা একটু করছে।’
ইঁদারা থেকে বালতিতে জল তুলে মাথায় ঢালার সময় তার মনে হয়েছিল, এমন হালকা কথাবার্তা বিবির সঙ্গে কখনো বলার সুযোগ তার হয়নি, তার সঙ্গে কেউ বলেওনি। পারুল তাকে সূক্ষ্মভাবে আশকারা না দিলে সে বোধহয় এমন ঠাট্টা—তামাশার স্তরে নিজেকে নিয়ে আসতে পারত না। এজন্য বিবি কি কৃতিত্ব দাবি করতে পারে না? কাল রাতে ওর মুখে ঘুষি মারতে ইচ্ছে করেছিল… ‘ওদের ঘুম যেন না ভাঙে’ শ্রীনাথই বলেছিল, ‘তোর বউয়ের খুব পার্সোনালিটি আছে, গ্র্যাভিটি নিয়ে চলে।’ কে যেন পিছনে দাঁড়িয়ে। মাথায় জল ঢালা বন্ধ রেখে সে পিছনে তাকায়। বুলি দাঁড়িয়ে। ‘কি চাই এখানে?’ ‘মামি বলল, তোমার পাজামাটা এখানেই রেখে যেয়ো, কেচে দেবে।’ ‘আচ্ছা, এখন পালা।’
ঘরে আয়না নেই, তাহলে সে দেখত শাড়ি কোমরে জড়িয়ে তাকে কেমন দেখাচ্ছে, জীবনে এই প্রথম। তাও এমন একজনের, যাকে দেখে বছর পনেরো আগেও সে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে! বাড়ি থেকে চিরুনি আনার কথাটা মনে ছিল না। সে জানালায় এসে শ্রীগোপালের ঘরের দাওয়ার দিকে তাকাল। পারুল থালা থেকে কাটা আনাজ তেলের কড়াইয়ে ঢালছে মুখটা পাশে ঘুরিয়ে রেখে। তার মনে হল পারুলের চোখ যেন জানালার দিকে। পাঞ্জাবিটা গায়ে দিয়ে নীচে নেমে এসে সে চিরুনি চাইল। পারুল চিরুনি দেওয়ার সময় বলে, ‘এখন কিন্তু আমি রান্নার হাতে মলম লাগাতে পারব না।’ সে জানে পারুলকে বললেই মলম লাগিয়ে দেবে তবে দু—বার অনুরোধ করার পর। উঠোনের একদিকে মাচায় দুটো কুমড়ো ঝুলছে। ‘কুমড়ো গাছ তুমি করেছ নাকি?’ ‘তা নয়তো কে করবে?’ এটা কী গাছ লাগিয়েছ, কাঁঠাল?’ ‘হ্যাঁ, দিন দশেক আগে। আমার খুব ভালো লাগে খাজা কাঁঠাল, মুড়ি দিয়ে খেয়েছেন?’ ‘খেয়েছি দারুণ…, হোক, এসে খেয়ে যাব।’
দাওয়ার পা ঝুলিয়ে বসে সে বলল, ‘শ্রীগোপাল চাষবাস ঠিকমতো দেখে তো? নাকি নিজের ব্যবসা নিয়েই ব্যস্ত?’ চাষ তো বলতে গেলে অনেকটা আমিই দেখি।’ ‘তুমি!’ সে অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকেছিল পারুলের মুখের চাপা গর্ব আর চোখের অস্ফুট হাসির দিকে। ‘না পারার কী আছে, আমাকে তো আর জমিতে নেমে কাজ করতে হয় না। ফুরোনে কাজ, ঠিকমতো কাজটা হচ্ছে কি না তদারকি করা। সার—টার কিনে আনা, সেচের জলের ব্যবস্থা, টেসকো দেওয়া সেসব ও করে। বাগান, পুকুর জমা দেওয়ার কথাবার্তাও আমি শুনে শুনে শিখে গেছি। তবে ছেলেটা হবার পর জমির দিকে আর তেমন যেতে পারি না। …সাহস করে এগোলে সবই করা যায়।’ তার কানে ‘সাহস করে এগোলে’ ফাঁকা কথা মনে হল না।
শ্রীগোপাল দুপুরেও ফেরেনি। সে একাই ভাত খেয়ে ঘরে ফিরল। জানালা দিয়ে চোখে পড়ল তার পাজামাটা, পারুল দড়িতে মেলে দিচ্ছে। তক্তপোশে পাতলা তোশকের উপর হ্যান্ডলুমের বেডকভার, শক্ত একটা বালিশ। সে শোওয়ামাত্রই ঘুমিয়ে পড়েছিল।
একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। পশ্চিম থেকে বিকেল শেষের রোদ—বৃষ্টি ধোওয়া গাছের পাতাগুলোকে ঝলসানো সবুজ করে তুলেছিল। ভিজে মাটি আর ঝোপঝাড় থেকে একটা গন্ধ তার ঘুম ভাঙা মস্তিষ্কের কোষগুলো সতেজতায় ভরিয়ে দেওয়ার কাজ শুরু করেছে। দু—হাত তুলে হাতের আঙুলের ডগা ধীরে ধীরে সে পায়ের পাতায় ঠেকাবার চেষ্টা করল হাঁটু না ভেঙে। সফল হতেই সে আমেজ বোধ করল। পিঠ, কোমর, বাহু, ঊরুর ভারী পেশিগুলোতে টান পড়ার ব্যায়াম কয়েক মিনিট করার পর ধীরে ধীরে একটা চমৎকার হালকা প্রফুল্লতা তার শরীর আর মন ছেয়ে এল। একেই বলে স্বাস্থ্য। এই সময় তার চোখে পড়ল কাঠের ছোটো টেবিলে রাখা কাগজে মোড়া বোতলটা। শ্রীগোপাল এতক্ষণে এসে গেছে কি? সে জানালায় দাঁড়াল। বৃষ্টি নামতেই কাপড়চোপড়গুলো দড়ি থেকে বোধ হয় তুলে রেখেছিল পারুল, এখন সেগুলো মেলছে। দুপুরে নিশ্চয় ঘুমোয়নি। উঠোনে হালকা হলুদ রোদের আভার মাধ্যে সে অন্য এক পারুলকে দেখল, যে বৃষ্টিভেজা এই বিকেল, মাটির গন্ধ, গাছের সবুজ, মেঘলা আকাশের আর প্রবল নৈঃশব্দ্যের সঙ্গে সূর্যকিরণের মতো একাকার। তার শরীরে রোমাঞ্চ লাগল।
