এর তিন বছর পর সে এসেছিল সেই জুন মাসের শনিবারে। রথতলার কাঁধে জোয়ালের ধাক্কা লেগেছিল, পারুলকে পিছন থেকে দেখেছিল রাস্তা ধরে হেঁটে যেতে, ওকে বাইকের পিছনে তুলে নিয়েছিল। পারুল বলেছিল, ‘ছোটোবেলায় খুব ইচ্ছে করত চড়তে, আজ শখটা মিটিয়ে নিলুম।’ কলেজে ভরতি হতেই বাবা মোটরবাইক কিনে দেয়, পারুলের শখ কি তখনই জন্ম নেয়? না হলে কচুবাগানে বস্তির মেয়ে ছোটোবেলায় আর কাকে বাইক চালাতে দেখেছে? পাড়ায় আর তো কারুর ছিল না!
ওই তিন বছরে সে অনেকবারই গোকুলানন্দে এসেছে, কয়েক ঘণ্টা থেকে ফিরে গেছে। তখন পারুলকেও দেখেছে, কিন্তু ও যে ‘সিড়িঙ্গে’ থেকে ধীরে ধীরে অন্য একটা কমনীয় শরীর পেতে শুরু করেছে, এটা তার নজরে আসেনি, হয়তো চারপাশের ফাঁকা জমি, খেত, আকাশ, গাছপালার পটভূমিতে দূর থেকে দেখলে মানুষের অন্য চেহারাটা ধরে পড়ে। কিংবা হয়তো গত রাতে বিবির কাছ থেকে পাওয়া উদাসীন অবহেলায় ভরা সম্পর্ক রক্ষা, যেটা ধর্ষণ ছাড়া আর কিছু নয়, যেটা তাকে গ্লানি আর রাগ ছাড়া আর কিছু দেয়নি।’ …সেটাই কি তাকে প্ররোচিত করেছিল পারুলকে একটু বেশি আকর্ষণীয় করে ভাবতে?…বিবির চোখের স্থির হয়ে থাকা দুটো মণি তার মনের মধ্যে হয়তো তখনও তাকিয়ে রয়েছিল। সেই নিষ্পন্দ চাহনিটাকে ঢেকে দেবার জন্যই কি সে এমন কারও খোঁজ করছিল, যার বড়ো বড়ো চোখ কথায় ভরে থাকবে?
পারুল কেরোসিন তেল নিয়ে ফিরে না আসা পর্যন্ত সে বাবলা গাছটার পাশে অপেক্ষা করেছে। ‘একি আপনি এখনও রয়েছেন!’ পারুল অবাক হওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু চেষ্টাটা দেখাবার জন্য হেসেও ছিল। ‘তেল পেলে?’ ‘হ্যাঁ।’ পারুল হাঁটতে শুরু করল। সে বাইকে স্টার্ট দিল। ওর পাশে বাইকটাকে এনে হাত বাড়িয়ে বলল, ‘ওটা দাও…দাও বলছি।’ প্রায় কেড়ে নিয়েই জারিকেনটাকে সে পেট্রল ট্যাঙ্কের ওপর রেখে হুকুমের সুরে বলে ‘উঠে পড়ো।’ পারুল তখন একবার মাত্র তার বড়ো বড়ো চোখের পূর্ণ চাহনি তার চোখে রেখেছিল। কী কথা ছিল ওই চাহনিতে? তার মনের মধ্যে একঝলক ঠান্ডা হাওয়া খেলে গেছিল। রাতের গ্লানি যতটুকু ছিল সেটা বেরিয়ে গিয়ে সে মুহূর্তে হালকা হয়ে উঠেছিল।
পারুল বাইকের পিছনে উঠে বসে। ‘এটা এবার কোলে নিয়ে একহাতে ধরে থাকো।’ অন্য হাতটা কীভাবে রাখবে সেটা আর সে বলেনি। পারুলের ডান হাত আলতো ভাবে তার কোমরে বেড় দিল। ডান দিকে তাদের বাড়ি যাবার রাস্তা, সে বাঁ দিকে বাইক ঘোরাল। পারুল অস্ফুটে কিছু একটা বলল। সেই গর্ভভরা ভাঙা রাস্তায় গতি বাড়াতেই পারুলের হাতের বেড় শক্ত হয়ে কোমর আঁকড়ে ধরল। রাস্তা দিয়ে অল্পস্বল্প লোক চলেছে, তারা কৌতূহলে তাকাচ্ছে। গ্রামের রাস্তায় এমন দৃশ্য সাইকেলে দেখলেও, মোটরবাইকের পিছনে মেয়েমানুষ তারা দেখেনি।
‘এবার ফিরুন, ঘরে ছেলেটা একা রয়েছে।’ সাত—আট মাস আগে পারুলের একটা ছেলে হয়েছে। ‘একা রয়েছে?’ ‘একটা বুড়িকে রেখেছি, বাসন মাজে, ছেলে দ্যাখে। …আর নয় ফিরুন।’ ‘শখ মিটে গেল?’ পারুল উত্তর দেয়নি। সে বাইক ঘোরাল। বাঁ দিকে একটা পুকুর আর বিশাল একটা অশ্বত্থ গাছ। ডান দিকে আমন ফসলের জন্য জমিতে লাঙল দিচ্ছিল এক চাষি। ‘এই জায়গাটার নাম কী?’ ‘বোধহয় রাইহাটা…আমি কখনো এতদূর আসিনি।’
রাস্তা থেকে একটা পুকুর, আমবাগান আর বাঁশবাগান, আর একটা বড়ো সবজি খেত পেরিয়ে শ্রীগোপালের খড়ের চালের ঘর, উঠোন, খামারবাড়িটা। দোতলায় পুবের জানালা দিয়ে উঠোন, খড়ের ঘরটা, সরু রাস্তার খানিকটা দেখা যায়, আমগাছ আর বাঁশ, তারপর আর কিছু দেখতে দেয় না। তার ভালো লাগে জানালাটায় দাঁড়াতে। কলকাতায় চোখ আটকে যায় একশো—দেড়শো মিটার পর্যন্ত দৃষ্টি গিয়েই। ফিকে হয়ে যাওয়া রঙ, নোংরা কালো রাস্তা, দুর্গন্ধ, পলেস্তারা ভাঙা দেওয়াল, রঙচটা দরজা জানালা, অবিরাম শব্দ, আঁস্তাকুড়,…কেমন যেন অবসন্ন করে দেয় চেতনা। এই জানালা থেকে সবুজ গাছের পাতা আর আকাশ দেখতে তার ক্লান্তি আসে না। বিশাল বিশাল আমগাছগুলোর অর্ধেকই তার বাবার আমলে নন্দকাকা বসিয়ে ছিল, ল্যাংড়া, হিমসাগর, ফজলি, বোম্বাই। বাকিগুলো আগেই ছিল। অন্তত দশ মিটার দূরত্বে এক—একটা গাছ, গাছতলা পরিষ্কার, পুকুরের দিকে একটু ফাঁকা জমি, ছোটোবেলায় স্কুলের সহপাঠীদের এনে পিকনিক করে গেছে ওখানে।
উঠোনে নেমে পড়ে পারুল। ষাট—বাষট্টি বছরের, মাথায় চুল ছেলেদের মতো করে কাটা, শীর্ণ ছোটোখাটো চেহারার এক বুড়ি পারুলের ছেলেকে কোলে নিয়ে দাওয়ায় বসে ছিল। ‘এত দেরি করলে বউ।’ পারুল জারিকেনটা দাওয়ায় রেখে ছেলেকে কোলে তুলে নেয়। একটা বছর ছয়—সাতেকের মেয়ে, খালি গা, নোংরা চুল, নাকের মধ্যে আঙুল ঢুকিয়ে বাইকটাকে ম্যাজিক দেখার মতো অবাক হয়ে দেখছে। ‘মামি, তুমি এটায় চড়ে এলে?’
‘মলম—টলম কিছু আছে, কাঁধটা জ্বালা করছে।’ পারুল ঘর থেকে একটা দোমড়ানো টিউব এনে বলল, ‘অনেক দিনের, টিপেটুপে বেরোয় কিনা দেখুন!’ প্রায় নিঃশেষিত টিউবটা দেখে সে বলেছিল, ‘কাজ চালাবার মতো বোধহয় পাওয়া যাবে… তুমি লাগিয়ে দেবে?’ বুড়ির হাতে ছেলেকে দিয়ে পারুল বলল, ‘খুলুন।’ সে পাঞ্জাবি, গেঞ্জি খুলে পিছন ফিরে দাঁড়ায়। টিউব থেকে পারুল আঙুলের ডগায় সামান্যই মলম পেল। ‘ইসস গত্তো হয়ে গেছে… গরম জলে ধুয়ে দোব? রক্ত জমে গেছে।’ ‘দরকার নেই, এমনিই লাগিয়ে দাও।’ পারুলের আঙুল কাঁধ থেকে কানের নীচে আলতোভাবে অনেকটা জায়গা নিয়ে ঘেরাফেরা করেছিল। ‘আপনার তিলটা আর বাড়েনি তো!’ ‘কোথায় তিল!’ ‘এই তো’ পারুল তার ডান বগলের পিছনে আঙুল ঠেকাল, ‘মানুষ বড়ো হবার সঙ্গে সঙ্গে তিলও তো বড়ো হয়!’ ‘তুমি আগে এটা দেখছ?’ পারুল উত্তর দেয়নি।’ আংটিটা তোমায় পরতে দেখি না তো।’ ‘এখানে পরে কাকে দেখাব?’ দেখাবার মতো কে আছে?’ ‘কেন শ্রীগোপাল তো আছে।’ পারুল উত্তর দেয়নি। …আপনি কিছু খাবেন?’ ‘একেবারে ভাত খেয়ে ঘুম দেব… শুধু ঝোল—ভাল, রাতেও কিন্তু খাব।’
