‘ঘোড়ামুখো তোর বউভাত খেতে এলুম রে।’ উঠোনে মোটরবাইকে বসেই সে চেঁচিয়েছিল। খড়ের চালার ঘর থেকে শ্রীগোপাল খালি গায়ে প্রায় ছুটে বেরিয়ে আসে। ‘আরে রোঘো!’ আনন্দে শ্রীগোপালের সামনের চারটে দাঁত বেরিয়ে পড়েছিল। ‘বউকে রান্না চড়াতে বল।’ খামার বাড়িটা প্রায় পঞ্চাশ মিটার দূরে। বাইকটা একতলার খামারঘরে রেখে ব্যাগ থেকে জিনিসগুলো বার করে হাতে নিয়ে হেঁটে আসতে আসতে দেখল পারুল দাওয়ায় মাদুর পাতছে। ওকে সেই হনুমান পার্কে ঘুগনি কিনতে দেখার পর এই প্রথম দেখা, একইরকম রোগা, লম্বা রয়ে গেছে। তার দিকে পারুল তাকাল, সেই ড্যাবড্যাবে চোখ।
বোতলটা দেখেই শ্রীগোপাল হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বলেছিল, ‘কী জিনিস এনেছিস রে! অনেকদিন বিলিতি খাইনি। আজ মুরগি খাওয়াব তোকে।’ পারুল দাওয়ায় দাঁড়িয়ে দেখছিল, তার কাছে গিয়ে সে শাড়ির বাক্সটা হাতে দিয়ে আংটির কৌটোটা খুলে সামনে ধরল, ‘পছন্দ হয়?’ পারুল মাথায় ঘোমটা তুলে ছোট্ট করে মাথা হেলায়। ‘হাতটা দাও, পরিয়ে দিই।’ সে নিজের হাত বাড়িয়ে দেয়, পারুল আঁচলের নীচে হাত লুকিয়ে ফেলে শ্রীগোপালের দিকে তাকায়। বোতলের ছিপির প্যাঁচ মুচড়ে খোলায় ব্যস্ত শ্রীগোপাল বলেছিল, ‘পরিয়ে দিচ্ছি পরে নাও, রোঘোর ছোঁয়া লাগলে কী গায়ে ফোস্কা পড়বে?…উপহার এটা।’
পারুল বাঁ হাত বাড়িয়ে দিল। ওর তালুটা মুঠোয় ধরতেই তার মনে হল, হাতটা যেন কেঁপে উঠল। মুখের দিকে তাকাতেই পারুল চোখ নামিয়ে নিল। আংটিটা অনামিকায় খাপ খেয়েছে। পারুল হাতটা টেনে নিচ্ছিল সে চে পে ধরে বলল, ‘দেখি একটু কেমন লাগছে…বাহ, চমৎকার দেখাচ্ছে…শ্রীগোপাল দ্যাখ তো।’ পারুলের হাতটা সে তুলে ধরল। ‘বিউটিফুল…সোনার জিনিস…দুটো গ্লাস দাও তো, চট করে একটু খেয়ে নিশিদার বাড়ি যাই, ওর মুরগির টেস্ট ভালো।’ ‘তুই এই সকালে এখন মদ খাবি?’ ‘সকাল বলছিস কিরে রোঘো, দশটা তো কখন বেজে গেছে।’ পারুল দুটো কাচের ক্লাস আনে, শ্রীগোপাল একটায় প্রায় সিকি গ্লাস ঢেলে, অন্যটায় ঢালতে যাচ্ছে তখন সে গ্লাসটা তুলে নিয়ে বলল, ‘থাক, এখনও আমার সকাল চলছে।’ ‘তা হলে চলুক তোর সকাল। বড়োলোকের ছেলে, শরীরের দিকে নজর তো থাকবেই।’
শ্রীগোপাল এক ঢোঁকে প্রায় অর্ধেকটা নামিয়ে দিয়ে চোখ বুজল। মুখটা দু—তিনবার দুমড়ে গিয়ে ক্রমশ থমথমে হয়ে গেল, কপাল ভিজে ভিজে দেখাচ্ছে। চোখ খুলে হাঁফাল দু—তিনবার। সে দেখল পারুল উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়ে। ‘ভালো জিনিস জল দিয়ে নষ্ট করতে নেই, খেলে নিট খাওয়া উচিত, বাবা তাই খেত। জানো পারুল, রোঘোকে আমিই প্রথম মদ চাখিয়েছি। তখন ও ক্লাস এইটে, আমি সিক্সে। ও খেয়ে বলেছিল আমি ওকে নষ্ট করলুম।’ শ্রীগোপাল হাসতে শুরু করে। ‘আমরা কীরকম বন্ধু জান?’ দ্বিতীয় ঢোঁকে বাকি মদটুকু শেষ করে শ্রীগোপাল পারুলের দিকে তাকিয়ে চোখ পিটপিট করে বলে ‘আমাদের বিয়ের আগে, এই ঘরে বসে একদিন বললুম তোর ঠাকুরদার কেপ্ট ছিল, তুইও একটা রাখ। তাতে ও কী বলল জান, তুই বিয়ে কর তোর বউকে কেপ্ট রাখব। …এবার যাই।’ শ্রীগোপাল সোজাভাবে হেঁটে মুরগি আনতে চলে গেল।
তখন নোংরা একটা লজ্জায় তার মাথা ঝুঁকে পড়েছিল। সেই সময় পারুলের মুখ দেখার মতো সাহস তার ছিল না। শ্রীগোপাল যে এতটা মাথামোটা এর আগে কখনো তার মনে হয়নি। চতুর, ধূর্ত, যেকোনো খারাপ কাজ অবলীলায় করতে পারে, এটাই তার জানা ছিল। হয়তো রসিকতা ভেবেই কথাটা বলেছে, কিন্তু বুঝল না কী বিশ্রী চেহারায় পারুলের সামনে তাকে দাঁড় করাল। কোনোদিনই সে আর ওর কাছে পরিচ্ছন্ন একটা মানুষ বলে গণ্য হবে না।
‘মামলেট করে দোব, খাবেন?’ আচমকা পারুলের স্বাভাবিক গলা শুনে সে তাড়াতাড়ি বলে ফেলে ‘খাব’। ‘চান করবেন?’ ‘হ্যাঁ করব, আমার ঘরের চাবিটা দাও। …কোথায় চাবি আছে জান তো?’ পারুল জবাব না দিয়ে ঘর থেকে চাবি এনে দেয়। সে ছুটেই প্রায় পঞ্চাশ মিটার দূরের খামারবাড়িতে পৌঁছয়। দোতলার বন্ধ ঘরের তালা খুলে ভ্যাপসা বাসি গন্ধটা কাটাতে সে পুবের জানালাটা খোলে। জানালা থেকে দেখতে পেল দাওয়ার একধারে রান্নার জায়গায় বসে পারুল তখন উনুনে কাঠ দিচ্ছে। তার মনে হল পারুলের চোখ উনুনের দিকে নয়, জানালার দিকে।
পারুল একটা মোটা ওমলেট কাঁসার থালায় তাকে দোতলার ঘরে দিয়ে গেছিল। ‘আমাদের ভাত কিন্তু মোটা চালের।’ ‘জানি, আগেও খেয়ে গেছি।’ ‘খেতে কিন্তু দেরি হবে, মুরগি নিয়ে কখন ফিরবে তার ঠিক নেই। …পেটে পড়েছে তো।’ ‘দেরি করবে না, বোতলটা তো এখানে। …শেষ করতে হবে তো? শুধু মুরগির ঝোল আর ভাত আর কিছু রেঁধো না।’ কথা বলতে বলতে সে অনেকটা সহজ হয়ে যায়। তবে একবার ভেবেছিল, একটা কোনো কৈফিয়ত দিলে ভালো হয়, যেমন শ্রীগোপাল যে তোমাকেই বিয়ে করবে সেটা জানলে অমন কথা বলতাম না বা এই ধরনের কিছু। কিন্তু পারুলের স্বাভাবিক স্বচ্ছন্দ তার অস্বস্তি কাটিয়ে দেয়।
সন্ধ্যায় কলকাতা রওনা হবার জন্য সে মোটরবাইকটা যখন খামারঘর থেকে ঠেলে বার করছে তখন শ্রীগোপাল এসে দাঁড়ায়। ‘নেশাটা হঠাৎ এমনভাবে ধরে নিল যে তোর সঙ্গে বসে খাওয়াটাও হল না। পারুল তোকে ঠিকমত খাইয়েছে তো?’ ‘খুব ভালো মুরগিটা রেঁধেছে।’ ‘যাক…তুই যে সত্যি সত্যিই আসবি ভাবিনি, বউদিকে একদিন আনিস কিন্তু। ঝিয়ের মেয়ে বলে পারুলের একটা কমপ্লেক্স আছে, সেটা তা হলে কেটে যাবে।’ ‘আনব…তুই এখন শুয়ে থাক, বড্ড খেয়েছিস খালি পেটে।’ ‘হুইস্কি অনেকদিন খাইনিরে, দিশিই জোটে এখানে…রাস্তাটা খারাপ, দেখে চালাস।’ সে বাইকে স্টার্ট দিল। ‘রোঘো একটা সত্যি কথা বলবি?’ শ্রীগোপাল তার কাঁধে হাত রাখল। গলার স্বর জটিল সমস্যায় ভরা। ঝুঁকে মুখটা কাছে এনে বলল, ‘ঠিক করে বল তো, আমার আর পারুলের মুখের মিল আছে কি না? ঠিক বলবি।’ শুনেই ধড়াস করে উঠেছিল তার বুক। শ্রীগোপাল কি কিছু শুনেছে? ‘কই, কোনো মিল তো আমার চোখে পড়েনি!’ তার মনে হল, শ্রীগোপাল ভয়ংকর একটা গর্ত ডিঙোবার চেষ্টা করছে। ‘চোখ, নাক, ঠোঁট, কপাল? ওর দাঁত আমার মতো নয় কিন্তু চোখ কুঁচকোলে, হাসলে?…কোনো মিলই নেই? তুই তো আমাদের দুজনকে কবে থেকে দেখছিস, কখনো মনে হয়নি?’ ‘একবারও নয়…ছাড় এবার যাব। নেশা এখনও তোকে ধরে আছে, আবোলতাবোল বকছিস।’ মোটরবাইকের হেডলাইটটা সে জ্বালল। উঠোনে দাঁড়িয়ে পারুল। আলোর তীব্রতায় চোখ বন্ধ করে কয়েক পা সরে গেল। ‘আর একটা কথা, জাস্ট ওয়ান ওয়ার্ড…বাবাকে তো জন্ম থেকেই দেখেছিস, পারুলের মুখের সঙ্গে…’ সে ধাক্কা দিয়ে শ্রীগোপালকে ঠেলে সরিয়ে বাইক চালিয়ে দিয়েছিল। ‘পারুল চললাম…ওকে শুইয়ে দাও, বাজে বকছে।’ ‘আবার আসবেন।’ উঠোন পেরিয়ে রাস্তায় পড়ার সময় সে শুনতে পায় শ্রীগোপালের চিৎকার ‘রোঘো, দেখে চালাস।’
