বিজয় ঘোষ নিশ্চয় এখন আর এই থানায় নেই। সজল নামের সেই কনস্টেবলটাও নিশ্চয় নেই, যে তার কোমরে মোটা দড়ি বেঁধে, ভ্যান রিকশায় বসিয়ে সদর হাসপাতালে নিয়ে গেছিল। এতদিনে নিশ্চয় বদলি হয়ে গেছে, প্রোমোশন পেয়েছে। বিজয় ঘোষ বলেছিল, ‘বউটা আপনার এগেনস্টে রেপিংয়ের চার্জ এনেছে…পরীক্ষার জন্য আপনাদের দুজনকে হাসপাতালে পাঠাব।’ এই রাস্তা দিয়েই ভ্যান রিকশাটা গেছিল সদর হাসপাতালে। তার পিছনেই বাবু হয়ে অন্যদিকে মুখ করে বসেছিল পারুল! পথচারীরা অবাক চোখে দেখছিল।
খালপাড়ের টালির চালের ঘরগুলো একইভাবে রয়েছে। তার মনে হল দু—তিনটে ঘর বোধহয় বেড়েছে, জানালায় আগে পরদা দেখেছে বলে মনে পড়ল না। দুটো অ্যান্টেনা তাকে অবাক করল। এদের রোজগার তা হলে টিভি সেট কেনার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। শ্রীগোপাল খালপাড়ের ঘরে আসত পনেরো টাকা নিয়ে!
চাষখেতের জমিতেই তিনটে একতলা ছোটো পাকা বাড়ি। বারান্দায়, জানালায় গ্রিল। রাস্তা থেকে বিদ্যুতের তার গেছে। স্থানীয় লোকই করেছে, হয়তো রিটায়ার্ড। তার মনে পড়ল শরৎ বসাকের বাড়িটা। এই একমাত্র লোক যার সঙ্গে এখানে তার পরিচয় হয়েছিল। এখন তাকে দেখে লোকটা দরজা বন্ধ করে দেবে, নাকি আগের মতোই চা খাওয়াবে? দেখা করে পরীক্ষা করতে হবে। বোকাসোকা দেখতে হলেও চালাক লোক, নয়তো ব্যবসা করে পয়সা করল কী করে?
খালপাড় থেকে গ্রামের দিকে যাওয়া রাস্তাটায় মাটি পড়েছে, চওড়া হয়েছে। একটা মোটরগাড়ি চলে যেতে পারে। এইখানেই সে ষোলো বছর আগে, পিছন থেকে পারুলকে দেখেছিল খালি পায়ে, জারিকেন হাতে নিয়ে হেঁটে যেতে। সে কলকাতা থেকে আসছিল মোটর বাইকে। শব্দ শুনে পারুল রাস্তার ধারে সরে গিয়ে পিছনে তাকায়। সে বাইকটাকে ওর পাশে এনে বলেছিল, ‘যাচ্ছ কোথায়?’ পারুল দাঁড়িয়ে যায়। ‘কেরোসিন আনতে একজনের বাড়ি থেকে।’ ‘কত দূরে? …উঠে পড়ো, পৌঁছে দিচ্ছ।’ পারুল গম্ভীর হয়ে বলেছিল, ‘না’। ‘না কেন? বাইকে তো মেয়েরাও চড়ে!’ বাবুর সঙ্গে ঝিয়ের মেয়ে চড়ে না।’ পারুল হনহন করে হাঁটতে শুরু করে দেয়। সে বাইকটাকে ওর পাশে পাশে চালিয়ে বলেছিল, ‘এখন তুমি ঝিয়ের মেয়ে নও, শ্রীগোপালের বউ, শ্রীগোপাল আমার ছেলেবেলার বন্ধু, বন্ধুর বউ…উঠে পড়ো।’
পারুল থমকে দাঁড়ায়, চোখ কুঁচকে কিছু একটা ভেবে নিয়ে সে বাইকের পিছনে উঠে বসে। ‘ঠিক করে উঠে বসো। শাড়িটা হাঁটুর মধ্যে গুঁজে দাও…বাঁ হাতে জারিকেনটা নাও আর ডান হাতে আমার কোমর ধরো।’ পারুল কোমর ধরেনি। সে ইচ্ছে করেই বাইকটা এমন গতিতে ছেড়ে দিল যে পারুলের পড়ে যাবার মতো অবস্থা হয়, সামলাতে গিয়ে সে তার কাঁধটা আঁকড়ে ধরে। ‘কাঁধে একটা খোঁচা খেয়েছি একটু আগে, জ্বালা করছে।’ পারুল তাড়াতাড়ি হাত সরিয়ে নেয়। ‘রাস্তাটা খারাপ, ঝাঁকুনিতে পড়ে যেতে পারো…ডান হাত দিয়ে ধরতে বললাম।’ ‘আমাকে নামিয়ে দিন। আর একটুখানি, হেঁটে চলে যাব।’ সে বাইক থামায়নি, পারুলেরও নামা হয়নি। ওর কাঁধ তার পিঠে চাপ দিচ্ছে, রাস্তার বড়ো বড়ো গর্ত পাশ কাটিয়ে যেতে বাইককে এঁকেবেঁকে চালাতে হচ্ছিল। ‘এভাবে চালালে আমি কিন্তু পড়ে যাব।’ সে বাইক থামিয়ে মুখ পিছনে ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করে, ‘অনেক দূর এসেছি, আর কতটা?’ তাকে অবাক করে দিয়ে পারুল বলেছিল, ‘অনেকক্ষণ ছাড়িয়ে এসেছি।’ ‘বলোনি তো!’ ছোটোবেলায় আমার খুব ইচ্ছে করত চড়তে, আজ শখটা মিটিয়ে নিলুম।’ বলেই হেসে উঠল। ‘এবার ফেরান, দেরি হয়ে গেছে। ঘরে বাচ্চচা রয়েছে।’ ‘শ্রীগোপাল কোথায়? তুমি কেন কেরোসিন আনতে এতটা হেঁটে যাবে, ও কি করছে?’ ‘সকালেই বেরিয়েছে…কাল থেকে ঘরে তেল নেই, চলুন।’
বাইক ঘুরিয়ে নিয়ে আবার সে ফিরে এসেছিল মাটির রাস্তারই কাছাকাছি। একটা বাবলা গাছের পাশ দিয়ে নেমে গেছে পায়ে চলা পথ। কতকগুলো খড়ের বাড়ি। বাইক থামিয়ে সে বলেছিল, ‘কেরোসিন নিতে এখানে?’ পারুল বলেছিল, ‘এটা দোকানদারের বাড়ি, দোকানের তেল সব বাড়িতেই, ব্ল্যাকে বিক্রি করে। আপনাকে আর আসতে হবে না।’ জারিকেন হাতে পারুল সেই সরু পথটা দিয়ে হেঁটে চলে গেল। পিছন থেকে সে ওর দিকে তাকিয়েছিল। …এই সেই রোগা, লম্বা, হাইজাম্পারদের মতো দুটো পা—ওয়ালা পারুল, কার্তিকের মা—র মেয়ে! তাকে দেখলেই তখন চোখ নামিয়ে নিত। এখন ওকে দেখে কে বিশ্বাস করবে! শ্রীগোপাল বলল, ‘রোঘো, বিয়ে করে ফেললুম মেয়েটাকে।’ তার মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছিল ‘কাকে, পারুলকে?’ বিবিকে সে বলেছিল, ‘সিঁড়িঙ্গে একটা মেয়ে, ড্যাবড্যাবে চোখ।’
কেন যে পারুলের হেঁটে চলে যাওয়ার দিকে সে তাকিয়ে থেকেছিল, আজ ষোলো বছর পরেও তা বুঝতে পারছে না। …কোনো অশ্লীল ইচ্ছে জেগেছিল? …তার কোনো অভাব, অপূর্ণতার কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল?…একটা রুগণ, অপুষ্ট গাছকে হঠাৎ একদিন ফুলে ভরে যেতে দেখার চমক কি সেই তাকানোটাকে তৈরি করেছিল?
উনিশ বছর আগে শ্রীগোপাল বলেছিল ‘রোঘো বিয়ে করে ফেললুম…গোকুলানন্দে আয়, বউভাত খাওয়াব।’ সে আগাম না জানিয়ে খেতে গেছিল পরের রবিবারে। মোটর সাইকেলের পাশের ব্যাগে ছিল উপহার, শ্রীগোপালের জন্য টেরিলিনের প্যান্ট পরা শার্টের কাপড়, বড়ো এক বোতল হুইস্কি। পারুলের জন্য মুর্শিদাবাদী সিল্কের শাড়ি, ব্লাউজ পিস, আর নকল চুনীকে ঘিরে নকল মুক্তো বসানো একটা সোনার আংটি। বিবিকে সে বলেছিল, ‘শ্রী গোপাল যেভাবে আমাদের জমিজমা বাঁচিয়েছে, তাতে পাঁচ হাজার টাকার উপহার দেওয়া উচিত।’
