পরদিন সকালে দালানে ওরা তিনজন খাচ্ছে। অরুণা পট থেকে চা ছেঁকে কাপে ঢালছে। সে গিয়ে বিবির পাশে বসল। এখানে এই সময় তার বসার কথা নয়। সবাই অবাক হয়ে তাকাল তার দিকে। অরুণা ইঞ্চিখানেক ঘোমটা বাড়িয়ে দিয়ে মৃদু গলায় বলল, ‘আপনার খাবার এখানে দোব?’
‘দাও।’
ওরা মুখ নামিয়ে খাওয়ায় ব্যস্ত হল। সে প্রত্যেকের মুখের দিকে তাকিয়ে খবরের কাগজটা তুলে নিল। অরুণা তার সামনে চায়ের কাপ রাখল। কাগজের প্রথম পাতায় চোখ বোলাতে বোলাতে আড়চোখে সে ছেলের দিকে তাকাল। কড়া করে সেঁকা পাঁউরুটির টুকরোর অর্ধেকটা মুখে ঢুকিয়ে দাঁতে কামড়ে চোখ বুজে চিবোচ্ছে! বাঁ হাতে ধরা ছাড়ানো কলায় কামড় দিয়ে আবার চোখ বুজল, চোখ খুলে সামনে তাকাল, মুখটা ফুলে উঠেছে। সামনে, টেবিলের অপর প্রান্তে অরুণা। গোরার চোখে তৃপ্তি, পা দুটো নাড়াচ্ছে। গালের পেশি দপদপাচ্ছে ডাঙায় তোলা মাছের কানকোর মতো।
একটা আঁশটে গন্ধে ঘিনঘিন করে উঠল তার ভিতরটা। সে কাগজের ওপাশ দিয়ে গুলুর দিকে তাকাল। একদৃষ্টে টেবিলে চোখ রেখে কাপে ছোটো চুমুক দিল। মেয়েটা কম খায়, হয়তো ছিপছিপে থাকার জন্য। ওকে বলা দরকার এতে শরীরের জোর কমে যায়, কিন্তু কে বলবে? বিবি উসখুস করছে।
‘ভেবে দেখলাম আমি গোকুলানন্দে গিয়েই থাকব।’ ঘোষণার মতো কথাটা সে বলল হাতের কাগজ নামিয়ে।
চকিতে সবাই তাকাল তার দিকে। সবার চোখে অবাক ধরবে এটা সে জানে। সে ঘাড় কাত করে বিবিকে বলল, ‘ডিসিশানটায় কোনো ভুল আছে?’
‘না। আমিও তাই ভাবছিলাম।’
‘ভাবছিলে!’
‘হ্যাঁ, এখানে তুমি অ্যাডজাস্ট করতে পারছ না আমাদের সঙ্গে।’
‘হ্যাঁ ঠিক, …তুমিই তো এ বাড়ির সব, আমি একটা ফালতু…তাই ঠিক করলাম।’ সে আবার চোখ বোলাল টেবিলের তিন পাশে। ‘এ বাড়িতে কোনো কিছুতেই স্টেপ নেবার অধিকার আমার নেই…মার্ডারার, রেপিস্ট…কে গ্রাহ্য করবে, কোনো সম্মান নেই। কাজে লোককে বরখাস্ত করার মতো জোরও আমার নেই।’
সে অরুণার মুখের দিকে তাকল। ‘ঘাড় ধরে একবস্ত্রে বার করে দিতাম, কিন্তু আমি তা পারব না।…তুমি অনেক কথা নাকি সবাইকে বলে যাবে, তাতে আমার বংশের সম্মান থাকবে না। সুতরাং…’
‘থাক আর বলতে হবে না।’ বিবি তাকে থামিয়ে দিল। ‘তুমি গোকুলানন্দে গিয়েই থাকো। হেমন্তকে পাঠাচ্ছি, তোমার থাকার বন্দোবস্ত করে আসতে। তোমার কোনো অসুবিধা, মনে হয় না হবে…পারুল আছে, সে তোমায় দেখবে।’
নামটা মাথায় থিতু হবার পরই সে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে উঠল, ‘কে দেখবে?’
‘যাকে তুমি বিধবা করেছ।…যাকে দেখার দায়িত্ব আমিই নিয়েছি। পারুলই এখন গোকুলানন্দর সব কিছু দেখছে। …হেমন্তকে কালই পাঠাব।’
সাত
রথতলার মোড়ে সে বাস থেকে যখন নামল, বিকেল তখন শুরু হয়েছে। ষোলো বছর পর। বোধহয় গত রাতে বৃষ্টি হয়েছিল। পিচ রাস্তার বাইরের মাটি ভিজে, বহু জায়গায় কাদা। বিকেলে বাজার বসত, আজও বসেছে। তবে কেনাবেচা এখনও জমেনি। সেই একই আনাজপাতি, রাস্তায় বসা দোকানগুলোয় একই জিনিস।
কিন্তু রথতলার অনেক বদলও ঘটে গেছে। রাস্তার দু—ধারে ব্যারাকের মতো টানা লম্বা পাকা দোতলা বাড়ি উঠেছে। একটা বাড়িতে ব্যাঙ্কের সাইনবোর্ড, তলায় টিভি সেট, টেপরেকর্ডার বিক্রির দোকান, তার পাশে গানের ক্যাসেটের। …বড়ো একটা ওষুধের দোকান, স্টেশনারি দোকানটা রঙবেরঙের জিনিসে ভরা। এর উলটোদিকে পাশাপাশি দুটো দোকানে শাড়ি আর রেডিমেড পোশাকের লম্বা কাউন্টারে লোক দাঁড়িয়ে। হিন্দি পপ গানের ক্যাসেট বাজছে…শস্য আর আনাজ বীজের…মিষ্টির দোকান ‘মুখোরুচি’, …কাঠের খাট, লক্ষ্মীর আসন, ড্রেসিং টেবিল…ফিনান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, পান—সিগারেটের দোকানে সফট ড্রিঙ্কসের বাক্স…নতুন সাইকেল, জুতো…সরকারি মৎস্য, কৃষি বিভাগ, তার পাশে নতুন ডাকঘর, উপরে টেলিফোনের তার, একটা বাড়ির দোতলায় ঢালাইয়ের কাজ চলছে…সে দেখতে দেখতে হেঁটে চলল।
রথতলা আর প্রায় চেনাই যায় না। দোকানগুলোর ভিতরে ফ্লুরোসেন্ট আলো দিনের বেলাতেও জ্বলছে। কাচে আলো লেগে দোকানগুলো ঝকঝকে। বিবি বলেছিল, ‘চিনে যেতে পারবে? সঙ্গে হেমন্ত যাক। সে হেসেছিল, ‘এতবার গেছি।’ রথতলা বদলেছে ঠিকই, কিন্তু না চেনার মতো নয়। রাস্তা ধরে আধ মাইল এগোলে বাঁ দিকে গোকুলানন্দের খালপাড়। রাস্তা নেমে গেছে। রাস্তার ধারেই সেই টালির চালের বাড়িগুলো, বাইকে যাবার সময় সে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখত বেশ্যাদের।
বাস, ট্রাক, অটো রিকশা তার সঙ্গে গোরুর গাড়ির, সাইকেল আর ভ্যান রিকশা, নিশ্চিন্তে রাস্তা দিয়ে হাঁটা যায় না। সে রাস্তা থেকে নেমে মাটির উপর দিয়ে হেঁটে চলল। এত লোক, দোকান, যানবাহন, কেউ তার দিকে তাকাচ্ছে না। এতে সে অবাক হল না। পাজামা, পাঞ্জাবি, দাড়ি কাঁধে ঝুলি থাকলেই যে দ্রষ্টব্য হয়ে যাবে কিংবা কটা চোখ, ছ—ফুটের উপর লম্বা, তামাটে হয়ে যাওয়া গায়ের রঙ হলেই যে সবাই তাকাবে, এমনটা সে আশা করছে না। রথতলা প্রতিদিনই নানান রকমের মানুষ দেখায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
থানাটা রথতলার মোড় থেকে উত্তরে খালেদনগরের দিকে চলে যাওয়া রাস্তার উপরে। ওইদিকেই হাইস্কুল আর থানা। একবার তার মনে হল, পিছিয়ে গিয়ে থানাটা দেখে আসবে কী না! চারটে সিঁড়ি ভেঙে টালির চালের খোলা দালান, তার পিছনে একটা বড়ো ঘর। সেখানে বসে দারোগা। ওই ঘরের পিছনেই হাজতঘর। সেখানে তাকে দুটো রাত কাটাতে হয়েছিল ষোলো বছর আগে। পরদিন ছিল রবিবার। সোমবার কোর্টে হাজির করে তাকে খালেদনগর সদর থানায় নিয়ে রাখা হয়। দারোগা বিজয় ঘোষ রবিবারই বলেছিল ‘পঞ্চাশ হাজার টাকার কমে বাঁচাতে পারব না।’
