‘এখুনি ছাড়ালে কাজের এমন একটা লোক পাব কোথায়?…অনেক চেষ্টায় পাওয়া।’
‘তাই বলে তুমি…!’ সে অবাক হয়ে বিবির বিরক্ত মুখের দিকে তাকাল।
‘তুমি অন্ধকারে যে কি দেখেছ…শুধু ওরা ছুটে পালাল, এটার উপর ভরসা করে কি কাউকে অ্যাকিউজ করা যায়?’
‘আপনি দেখলেন আসামি কাটারিটা আপনার স্বামীর ঘাড়ে বসাল…তারপর কী করল, ছুটে পালিয়ে গেল?’
‘না।’
‘তা হলে তখন কী করল আসামি?’
‘আমার দিকে এগিয়ে এল।’
‘গোরা একটা লোককে অন্ধকারের মধ্যে সদর দরজা দিয়ে ঢুকতে দেখে অন্তত ‘কে’ বলে এগিয়ে যাবে তো?
‘হয়তো ভয় পেয়ে গিয়ে থাকবে।’
বিবি মানতে চাইছে না, চাইবেও না। উলটে তার সম্পর্কেই বিরক্ত হয়ে উঠছে। হয়তো বলবে উদ্দেশ্য নিয়ে গোরার চরিত্রে কালি ছিটোচ্ছি। কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে আমার? একটাই তো, ছেলেকে বাপের মতো হতে না দেওয়া।
‘তুমি আসার পর থেকেই সবাইকে জ্বালিয়ে যাচ্ছ।’ চেয়ার থেকে ঝাঁকি দিয়ে বিবি উঠে দাঁড়াল। ‘এখানে তোমার আর থাকা উচিত নয়।’
ঘর থেকে বিবি প্রায় ছিটকেই বেরিয়ে গেল। দালানের দরজা খোলার শব্দে সে বুঝল নীচে যাচ্ছে। সম্ভবত রান্নাঘরে, অরুণার সঙ্গে কথা বলতে। সে ভিজে পাঞ্জাবিটা খুলতে খুলতে বেরিয়ে এল তোয়ালের জন্য। গোরার ঘরের দরজা ভেজানো। তার মনে হল, এখানে থাকলে সে নিজেই নিজেকে কুরে কুরে ফোঁপরা করে দেবে।
বিদ্যুৎ ফিরে এসেছে । খাওয়া শেষ করে খালি থালা আর বাটির সামনে সে বসে আছে অনেকক্ষণ। খেতে খেতেই সে লক্ষ করেছিল অরুণা দরজার কাছে দু—বার এসে ফিরে গেছে। দাদার টিভি—তে শেষ অনুষ্ঠান হচ্ছে বোধহয়, নয়তো সারা বাড়ি নীরব। এগারোটার মধ্যে বিবি শুয়ে পড়ে, ছেলেমেয়েদেরও অভ্যাসটা করিয়েছে। এঁটো বাসন নীচে নামিয়ে দিয়ে তবেই অরুণা শোয়। আজ সে দেরি করে খেয়েছে।
হাত ধোয়ার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে দেখল দালানে অরুণা দাঁড়িয়ে। কপালের কিনার পর্যন্ত ঘোমটা, সর্বাঙ্গ কাপড়ে ঢাকা, শুধু টেবিলে রাখা ডান হাতের আঙুলগুলো দেখা যাচ্ছে। তাকে দেখেই চোখ নামিয়ে নিল, কিছু একটা বলতে চায়। কী বলবে, আমি নির্দোষ, তাড়িয়ে দিলে আমার আর কোথাও জায়গা হবে না!
ঘরে ফিরে জলের গ্লাস তুলে নিয়েছে, পিছন থেকে অরুণা বলল, ‘দাদাবাবু আপনি বউদিকে বলেছেন আমাকে ছাড়িয়ে দিতে?’
‘হ্যাঁ।’ গ্লাস মুখে তুলল। অরুণার স্বরটা অপরাধীর মতো নয়।
‘বউদি আমাকে ছাড়াতে পারবে না!’
‘কেন?’
জবাব দিল না। সে তাকিয়ে রইল ওর মুখের দিকে। থালার উপর বাটি রাখা, এবার থালাটা তুলে নিলে ওর চলে যাবার কথা। কিন্তু যাচ্ছে না। আরও কিছু বলতে চায়। ‘কেন পারবে না?’
‘সে আমি বলব না, তবে বলছি পারবে না।’
‘তুমি গোরাকে নষ্ট করছ, এটা তার বাপ—মা সহ্য করবে না।’
‘আপনারা নিজের ছেলেকে খুব ভালো মনে করেন, না?’ বলার সঙ্গে সঙ্গে অরুণা ঘোমটা ফেলে কাঁধ থেকে আঁচল সরাল। ‘দেখুন।’
অরুণা যেখানে আঙুল রেখেছে সে সেখানে তাকাল। বাঁ কানের নীচে সরু গর্ত তাতে রক্ত জমে। বোধহয় দাঁত বসানোর দাগ। বাঁ গালে, গলায় কালো ছোপ। ‘ব্লাউজ খুলে দেখাব?’
‘নাহ।…এসব কী?’ সে স্পষ্টতই আর্তনাদ করল।
‘আপনার ছেলের কাজ। লোডশেডিং হতেই ঘাপটি দিয়ে ছিল সিঁড়ির কাছে অন্ধকারে। আমি ওপরে যাচ্ছিলুম, তখন ধরল…।’ অরুণা ফুঁপিয়ে উঠতে গিয়ে নিজেকে সামলে নিল। ‘আগেও দু—তিনবার চেষ্টা করেছে, বউদিকে বলতে লজ্জা করেছিল…এইটুকু ছেলে…।’
‘কাঁধের এই ইনজুরিটা কী করে হল?’ সদর হাসপাতালে এমার্জেন্সির মেডিক্যাল অফিসার জিজ্ঞাসা করেছিল। তখন সে পুরো উলঙ্গ হয়ে আউটডোরের পাশের ঘরে কাপড়ে ঘেরা জায়গাটায় দাঁড়িয়ে। সিলিং থেকে ঝুলছে একটা বালব, একটা খাট, টেবিলে কিছু শিশি, দেওয়ালে মহাদেবের ছবি দেওয়া ক্যালেন্ডার। তার সামনে মেডিক্যাল পরীক্ষার সাক্ষী হিসাবে ছিল হাসপাতালের অল্পবয়সি এক জমাদার, গোকুলানন্দ থানার কনস্টেবল, আর ফরসা, রুগণ, লম্বা এক সিস্টার, যার বয়স পনেরো থেকে পঁয়তাল্লিশ হতে পারে। সিস্টারের চোখ তার উলঙ্গ শরীরটা আর সবার সঙ্গেই দেখছিল। লজ্জায় সে চোখ বন্ধ করে ফেলে। নিজেকে তখন একটা গুয়েপোকা ছাড়া আর কিছু মনে হয়নি।
‘শনিবার সকালে রথতলায় একটা গোরুর গাড়ির জোয়ালের সঙ্গে ধাক্কা লেগেছিল।’
ডাক্তার টর্চ জ্বেলে কাঁধ পরীক্ষা করতে মুখটা কাছে আনে। তখন সে মনে মনে বলেছিল, ‘যেন ভুল না করে…ইনজুরিটা ধরতে পারে যেন।’ ডাক্তারের ভাবলেশ মুখের দিকে সে আতঙ্ক নিয়ে তাকিয়ে থেকেছিল। ‘এটা জোয়ালের ধাক্কাতেই’, কথাটা সে আর একবার বলেছিল।
‘আপনার ছেলেই এই সব করেছে।’ অরুণা আবার বলল, ঘোমটা মাথায় তুলে দিয়ে। ‘আমাকে ছাড়িয়ে দেবেন?…তা হলে আমিও অনেক কিছু দেখেছি, যাবার আগে সবাইকে বলে যাব।’ অরুণার চোখ দপ করে উঠল, উদ্ধত ভঙ্গিতে চিবুক তুলল। ঠান্ডা নম্র মানুষটার এ কী পরিবর্তন!
‘কী বলে যাবে?’
‘বউদিকে জিজ্ঞেস করবেন।’ থালা তুলে নিয়ে অরুণা বেরিয়ে যাবার সময় শেষ কথা বলল, ‘জোঁকের মুখে দেবার নুন আমার কাছে আছে, বউদি সেটা জানে।’
জরাগ্রস্তের মতো সে দাঁড়িয়ে। বিবি কী জানে? অরুণা তাকে প্রায় ধমকেই গেল। একটা ঝি তাকে চোখ রাঙিয়ে বলে গেল, তাকে ছাড়ানো যাবে না। বিবি কী জানে এই বাড়িতে এটাই প্রথম…ব্ল্যাক—মেইলিং!… ‘অনেক কিছু দেখেছি’, কী দেখেছে?…’এখানে আর তোমার থাকা উচিত নয়।’ বোধহয় উচিত নয়। কোথায় যাব…গোকুলানন্দে?
