‘আমার আগে কেউ কি নীচের থেকে এল?’ গলা নামিয়ে সে জিজ্ঞাসা করল।
‘হ্যাঁ, রণো…কেন?’
‘কিছু না।’ সে একবার গোরার ঘরের দিকে তাকাল। দরজা আধ—ভেজানো, ঘর অন্ধকার।
‘কোথায় গেছলে তুমি?’ শান্ত গলা, কৌতূহল নেই।
‘সনতের কাছে।’
‘এত লোক থাকতে ওর কাছে! কী দরকার পাড়ার লোকের বাড়িতে যাওয়ার।’ কথার ভঙ্গিটা পরামর্শ দেওয়ার মতো।
‘তাতে কী হয়েছে?’
‘মুখরোচক কথাবার্তা আবার শুরু হবে, এই যা!’
‘হয় হবে।’ সে ছোটো ঘরের দিকে এগোল।
‘শোনো।’ এবার গলায় কর্তৃত্বের দাপট, নীচু স্বরে। সে ফিরে তাকাল। ‘তুমি কোনো দিন কি আমার ফোন ধরেছিলে?’
‘একদিন, হ্যাঁ…বেজে যাচ্ছিল, ধরার কেউ ছিল না, তাতে হয়েছে কী?’
সে বিবির মুখ কঠিন হতে দেখল। আন্দাজ করতে পারল কেন দপ করে উঠল চোয়ালের পেশি। ‘তোমায় কী জিজ্ঞাসা করেছিল?’
‘আমি কে…কে কথা বলছি।’
‘কী বললে তুমি?’ বিবি সোজা হয়ে বসল।
‘বললাম জাহ্নবীর স্বামী বলছি।’ বলেই সে কাঠ হয়ে গেল বিবির মুখটা দেখে।
থম হয়ে গেছে। তিক্ত চাহনির মধ্য দিয়ে ও কী বলে চলেছে! কলমটাকে মুঠোয় গুঁড়িয়ে ফেলার চেষ্টাটা কেন? ডিভোর্সি পরিচয় দিয়ে বিবি কী সুবিধে পায়?…কোনো পুরুষের সঙ্গে যদি ওকে দেখা যায়, তা হলে কেউই সেটা দোষের মনে করবে না! ডিভোর্সির স্বাধীনতা আছে প্রেমিক সংগ্রহের। এই সুবিধাটাই কি সে বানচাল করে দিয়েছে! বিবিকে কি কলিগদের ফিসফাস শুনতে হয়েছে।… নিশ্চয় সেই রমা ঘোষ বলেছে, ‘রাঘবেন্দ্র দত্ত লোকটা কে বলো তো?’ ‘কে রাঘবেন্দ্র?’ ‘ওই যে ফোনে বলল তোমার বৈধ স্বামী।’ আমার আগের স্বামী, এখনও তোমায় ভুলতে পারছে না, এখনও মনে করে আমি ওর স্ত্রী…।’ ‘তোমার বাড়িতে ফোন ধরল যে, তোমার কাছেই থাকে নাকি?’ ‘মাথা খারাপ হয়ে গেছে, তাই কিছুদিন হল বাড়িতে রেখেছি। কী করব, বেচারার কেউ নেই।’
‘তোমার সঙ্গে দু—একটা কথা আছে।’ বিবি তার মুখের দিকে নিথর চোখ রেখে স্থির স্বরে বলল।
‘আমারও একটা বলার কথা আছে, ঘরে আসবে?’ সে ইঙ্গিত করল ছোটো ঘরের দিকে। বিবি উঠে দাঁড়াল।
দালান থেকে আলোটা দরজা দিয়ে যতটকু এসেছে, তাতে ঘরটাকে প্রায়ান্ধকার বলা যায়। খাটের দিকটা অন্ধকার, সে খাটে বসল। টেবল আর চেয়ারে ক্ষীণ আলো পড়েছে, বিবিকে চেয়ারে বসতে হল। সে বিবির মুখটা দেখতে চায়।
‘অরুণা মানুষটা কেমন?’
‘হঠাৎ এ কথা কেন?’ ভ্রূ কুঁচকে উঠল বিবির।
‘দরকার আছে। কোথা থেকে ওকে পেয়েছ, ওর অতীত সম্পর্কে কী জান?’
‘বুঝতে পারছি না হঠাৎ এই সব প্রশ্ন কেন! আমাদের কলেজের এক ক্লার্ক ওকে দিয়েছে। সোনারপুরে ওদেরই পাড়ার মেয়ে। বিধবা, গরিব, দাদার সংসারে থাকত। আমার কাছে দু—বছর রয়েছে, হাতটান নেই, পরিষ্কার—পরিচ্ছন্ন, যতটা সম্ভব মার্জিত কথাবার্তা, চালচলন…কারুর কোনো কমপ্লেন নেই ওর সম্পর্কে।’
সে চুপ করে রইল। একটা বিশ্রী কথা, নিজের সন্তান সম্পর্কে, বলতে তার সংকোচ হচ্ছে। বিবির প্রতিক্রিয়াটা কেমন হবে অনুমান করতে পারছে না। অরুণার উপর যে ওর প্রচুর আস্থা, সেটা একটু আগেই কথার মধ্যে ধরা পড়ল। গোরা সম্পর্কে কোনো কথাই কানে নেবে না, তার কথা বিশ্বাসই করবে না।
‘অরুণা কিছু করেছে কি?’ এবার বিবির স্বরে উৎকণ্ঠা ধরা পড়ল।
‘সদর দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই অন্ধকারে মনে হল কারা যেন রয়েছে। পায়ের শব্দে বুঝলাম একজন ছুটে উপরে উঠে গেল, আর একজন তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে চলে গেল।…উপরে যে উঠে এসেছে সে গোরা।’
চাপা মন্থর স্বরে বলা কথাগুলো শুনতে শুনতে ম্লান আলোতেই সে দেখতে পেল বিবির মুখ থেকে রক্ত সরে গেল, যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যেতে লাগল সারা মুখ। চামড়ার সঙ্গে ভিজে গেঞ্জিটা সেঁটে রয়েছে, পাঞ্জাবিটা সপসপে। পাজামার তলা জলে ভারী। এগুলো খোলার দরকারটা এখন তার কাছে বড়ো কথা নয়।…গোরা এখন বিপদে।
‘কী বলছ তুমি! ঠিক দেখেছ তো?…অরুণা আর রণো!…ওর ছেলে থাকলে সে তো রণোর বয়সিই হত!’
‘অরুণার যৌবন এখন ফুরিয়ে যায়নি।’
‘না ফুরোক, …তুমি যে ঠিক দেখেছ সেটা বিশ্বাস করব কীভাবে?…যেকোনো কারণেই হোক ওরা দুজন ওই সময় ওখানে অ্যাকসিডেন্টালি এসে গেছিল, এটাও তো হতে পারে?’
‘তা হতে পারে, কিন্তু তা হলে দুজনের ছুটে পালাবার তো কোনো দরকার ছিল না!’
বিবি মুখ নামিয়ে চিন্তায় ডুবে যাচ্ছে, দুশ্চিন্তায়। ডুবন্ত লোক বাঁচার চেষ্টায় হাঁসফাঁস করে উঠবেই, এক্ষেত্রে সেটা ছেলের চরিত্রকে পরিচ্ছন্ন মনে করার চেষ্টা। বিবি তা করবে, করতেই হবে। বিবি জানে না গোরার বয়সে তার বাবা কেমন ছিল। অকালে পূর্ণবয়স্কের শরীর, অথচ সেটাকে বাগ মানাবার মতো মনের গড়ন না থাকলে এইরকমই হয়। এটা হবেই। বাবার আকারটাই শুধু নই প্রবৃত্তিটাও গোরা পেয়েছে। মিতাকে তার মা সরিয়ে না দিলে ব্যাপারটা কতদূর গড়াত?…কে জানে!
‘তুমি ওকে কিছু বোলো না, তবে অরুণাকে এখুনি ছাড়িয়ে দাও। সামনে থেকে সরে গেলে গোরা দু—দিনেই ভুলে যাবে।…এখন কম বয়স, ভুলে যেতে অসুবিধে হবে না।’
মিতার মা ‘অসুবিধে হবে না’—ই বলেছিল। সে নিশ্চিত গোরা মনে রাখবে না কিন্তু মনে করে রাখবে বাবাকে, তার ভয় পেয়ে পালিয়ে যাওয়া একটা মুহূর্তের সাক্ষীকে। গোরা ডিস্টার্বড থাকবে। একই বাড়িতে পাশাপাশি ঘরে তারা দুজন,রোজই একবার অন্তত মুখোমুখি হবে, কেউ কথা বলবে না। চোখে চোখ পড়লেই একজন চোখ সরিয়ে নেবে।
