রবীন্দ্র সরণির মোড় পার হয়ে লালবাজারের পুলিশী সদর দফতর অতিক্রম করে সে রাধাবাজার যাওয়ার গলিতে ঢুকল এবং চলার গতি দ্রুত করল। কাঁধ পর্যন্ত সংক্ষিপ্ত কালো রেশমের মতো কেশ ঈষৎ আন্দোলিত হচ্ছে অথচ মহাদেবের ডমরু সদৃশ দেহটির গড়নে দ্রুত গমনজনিত কোনো বেতালা অসংগতি ফুটে উঠছে না। নিতম্বের উচ্ছ্বাস নিয়মিত ছন্দেই উত্থিত হয়ে স্তিমিত হয়ে চলেছে। নাভির নীচে শাড়ির ভাঁজগুলি প্রশস্ত সানুদেশের উপর বিছানো। তার দেহের দৈর্ঘ্যের সঙ্গে বিস্তারের কোনো বিবাদ নেই এবং অচঞ্চল ভঙ্গিতে গ্রীবা ও চিবুক তুলে সে হেঁটে চলেছে। পদক্ষেপের দৃঢ়তাই জানান দিচ্ছে তার পায়ের পেশি বলিষ্ঠ।
এই গলিতে নানাবিধ ঘড়ির দোকান দু—ধারে। মনোহারি দেওয়াল ঘড়িতে দোকানগুলি যেভাবে শোভিত, তা বহু লোকই গতি মন্থর করে দেখতে দেখতে যাচ্ছে। রমণী দোকানে ঢুকল। বিক্রয়কারিণী সিড়িঙ্গে চেহারার ঘোর কৃষ্ণবর্ণ এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান বালিকা। রাগী সিংহের মতো তার চুলগুলি ফাঁপানো। রমণী পরিচ্ছন্ন ইংরেজিতে তাকে বলল, ‘ছ—দিন আগে পুরুষদের একটি রিস্টওয়াচ সারাতে দিয়েছিলাম, আজ সেটি দেবার তারিখ।’ এই বলে সে ঝুলি থেকে একটি ছোটো চামড়ার পার্স বার করে তার থেকে বিল বার করল।
নম্বর দেখে শো—কেস থেকে একটি চৌকো স্বর্ণাভ দামি ঘড়ি তুলে নিয়ে বিক্রয়কারিণী সুন্দর করে হাসল। তার দাঁতগুলি শ্বেত প্লাস্টিকের মতো এবং সাজানো। সম্ভবত তার চাকুরি দাঁতের জন্যই। দাম চুকিয়ে রমণী দোকান থেকে বেরিয়ে দু—ধারে সন্তর্পণে তাকাল। তারপর আবার দ্রুতগতিতে ব্রেবোর্ন রোডে পৌঁছে উত্তর দিকে হাঁটতে শুরু করল।
বড়ো বড়ো কয়েকটি অফিস—বাড়ি এবং দুটি রাস্তা অতিক্রম করে সে সাততলা একটি বাড়িতে ঢুকল। দশ—বারোটি অফিস এই বাড়িতে, কিন্তু লিফট মাত্র একটি। লিফটের দরজায় লাইন দিয়ে জনা দশেক অপেক্ষমাণ। রমণী তাদের দিকে একনজর তাকিয়ে পাশের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করল।
লোকগুলি নেহাতই ষড়রিপুর দাস। তাই চোরাদৃষ্টিতে রমণীর সিঁড়িভাঙা দেখতে গিয়ে শ্বাস রোধ করে রইল এবং তাদের দ্রষ্টব্য বস্তুটি চোদ্দো ধাপ অতিক্রম করে সিঁড়ির বাঁকে অন্তর্হিত হওয়ার পর নিশ্বাস ফেলে হাঁপ ছাড়ল।
‘এতবড়ো বাড়িতে দুটো লিফট থাকা উচিত।’ এক মধ্যবয়সি মন্তব্য করল। ‘জরুরি কাজ রয়েছে অথচ—’
‘লিফটম্যানটা বরাবরই এইরকম, উঠলে আর নামতে চায় না, রিপোর্ট করা উচিত।’ যুবকটি এই বলে বন্ধ কোলাপসিবল দরজার কাছে এসে মাথা বাঁকিয়ে উপর দিকে তাকাল। ‘নাহ, পাত্তাই নেই…হেঁটেই উঠি।’ এই বলে যে লাইন ছেড়ে সিঁড়ি দিয়ে লাফাতে লাফাতে উঠে আড়াই তলা বরাবর পৌঁছে রমণীকে দেখতে পেয়েই লাফানোর বেগ কমাল। ধুতি—শার্ট পরা এক শীর্ণকায় লোক উপর থেকে নেমে আসছে, তাকে দেখে রমণী থেমে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল ‘সাহেব আছেন?’
‘আছেন,’ লোকটি মাথা কাত করল ঈষৎ সম্ভ্রমভরে।
রমণী তিনতলায় পৌঁছে বাঁদিকের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল। দরজার পাশে একটা কাঠের চৌকো টুকরোয় সাদা বড়ো অক্ষরে ইংরেজিতে লেখা: ইস্টার্ন ম্যাগাজিনস প্রাইভেট লিমিটেড। তার নীচে আর একটি কাঠে ইংরেজিতে লেখা: বরুণা প্রিন্টার্স। তার পাশের কাঠে উপর থেকে নীচে ইংরেজিতেই তিনটি ম্যাগাজিনের নাম: চিত্ররেখা। মহারানি। শৈশব। নামগুলি তিনরকম রঙে, হলুদ, গোলাপি ও গাঢ় কমলায় লেখা।
এই অফিস ইস্টার্ন ম্যাগাজিনসের বৃহৎ দেহকাণ্ডের শুধু মুখটুক। এখানে সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক তিনটি ম্যাগাজিনের সম্পাদকীয় দফতর ছাড়াও আছে সার্কুলেশন, অ্যাকাউন্টস ও বিজ্ঞাপন বিভাগ। এ ছাড়া বাঁধাই ও ছাপার এবং কম্পোজিং ও প্রসেসিংয়ের কাজকর্ম হয় বেলেঘাটায়। ফোটো বিভাগটিও সেখানে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে প্রায় এক বিঘে নিজস্ব জমিতে প্রেসবাড়ি, গুদাম ও গ্যারাজ। সম্প্রতি আর্ট বিভাগটিও সেখানে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ব্রেবোর্ন রোডের অফিস থেকে। বাচ্চচাদের জন্য শৈশব নামে একটি পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ হচ্ছে। দফতর করতে জায়গা চাই, তাই এই স্থানান্তর। প্রয়োজন হলে আর্ট ডিরেক্টর শম্ভু দত্তকে বেলেঘাটা থেকে ডেকে পাঠানো হয়।
বিরাট একটা ঘর, যার আয়তন দেড়খানা ভলিবল কোর্টের সমান। তিনতলার অর্ধেক নিয়ে ইস্টার্ন ম্যাগাজিনস। ঘরের দেওয়াল সংলগ্ন কাঠের পার্টিশান দেওয়া কামরাগুলিতে তিনটি ম্যাগাজিনের দফতর। মাঝখানটিও গলা—সমান উঁচু কাঠের দেওয়ালে ঘেরা। সেখানে মোটামোটা লেজার বই, স্টিলের চারটি আলমারি, লোহার র্যাক, আর নানান আকারের খাতা, ফাইল, চিঠিপত্র, ভাউচার ইত্যাদি নিয়ে ব্যবসায়িক কাজ চলে ছোটোবড়ো সাতটি টেবিলে।
ইস্টার্নের মালিক, কর্ণধার এবং ব্যবসাটিকে বিরাট করে তোলার জন্য সব কৃতিত্বের অধিকারী গঙ্গাপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কামরা ব্রেবোর্ন রোডের দিকে উত্তর—পশ্চিম কোণে। নীল কাপের্ট, এয়ারকুলার, দেয়ালে ফেল্টের বোর্ড, তাতে ম্যাগাজিনের মলাট পিন দিয়ে আঁটা ও মোটা কাচে ঢাকা টেবিল, যাতে ছয়জন বসে খেতে পারে। কাঠের গ্লাসে কলম, তাতে নানা রঙের ও ধরনের পেনসিল। লাল ও জলপাই রঙের দুটি টেলিফোন, টেবল ক্যালেন্ডার ও ডায়েরি এবং স্লিপের প্যাড, এই ক—টিই টেবিলের স্থায়ী জিনিস, অবশ্য সকাল ন—টায় গঙ্গাপ্রসাদ চামড়ামোড়া ঘূর্ণি চেয়ারে বসার পর থেকেই টেবল ভরে উঠতে শুরু করে নানান ধরনের দরকারি কাগজে। তিনটি চেয়ার ছাড়াও দেওয়াল ঘেঁসে আছে অতিথিদের বসার জন্য দামি কাপড়ে মোড়া পুরু ফোমের গদি আঁটা জলচৌকির মতো আসন ও ঠেস দেওয়ার বালিশ।
