‘আমিও তাই বলি। ছেলেটা আবার বিয়ে করেছে, আগে থেকেই নাকি মেয়েটার সঙ্গে ভাবসাব ছিল।’
‘বিয়েটা করা উচিত হয়নি।’ দুজনেই অবাক চোখে তার দিকে তাকাল। মাসিমা কিছু বলে ওঠার আগেই সে যোগ করল, ‘দুজনেরই।’
পাওয়ার কাট। অন্ধকার ঘরে মাসিমা বিরক্ত স্বরে বলল, ‘এই এক জ্বালা, কবে যে শেষ হবে কে জানে।’
মিতা উঠে গিয়ে তাক থেকে মোমবাতি—দেশলাই এনে জ্বালল। পাখাটা মন্থর হতে হতে শেষ চক্কর দিচ্ছে। সিলিংয়ে শকুন ওড়ার ছায়া ঘুরছে। গোকুলানন্দে সে শকুনকে মরা গোরুর পেটের উপর বসে মাংস ছিঁড়তে দেখেছে। কাগজে তো তারও খবর বেরিয়েছিল, খোরপোষ চাওয়ার থেকেও বড়ো খবর। কিন্তু সবই তো এখন স্বাভাবিক।
‘হাত ধোব।’
‘এসো।’ মোমবাতি হাতে মিতার পিছনে সে কলঘরে এল। এটা তার চেনা জায়গা। সিঁড়ির পাশে টিনের পাল্লা দেওয়া ঘেরা জায়গাটা চৌবাচ্চচা। মেঝেয় সম্প্রতি সিমেন্ট করা হয়েছে। দড়িতে গামছা ঝুলছে।
‘হাতে তেল লেগে, সাবান দাও।’
কাঠের র্যাক থেকে সাবানদানিটা মিতা তার হাতে দিল। ক্ষয়ে প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া গোলাপি সাবানে জুঁইয়ের গন্ধ।
‘কী শুঁকছ?’ মিতার এক হাতে জলভরা মগ। জল ঢালার জন্য তার কাছ ঘেঁষে নীচু হল। ওর গায়ে বাসি ঘামের টক গন্ধ, বিবির গায়ে কখনো সে ঘামের গন্ধ পায়নি।
‘গন্ধটা বেশ লাগে।’
‘ও কথা বললে কেন, বিয়ে করা উচিত হয়নি?’
‘তোমাকে বলিনি, তোমার স্বামীর জন্য বলা।’ হাত ধুয়ে হাত দুটো ঝাড়ছিল, মিতা আঁচল এগিয়ে ধরল। হাত মুছে আঁচলটা ফিরিয়ে দিয়ে বলল, ‘একটা পুরুষ না হয়ে এ ক্ষেত্রে যদি মেয়ে হত, তা হলে কী করত?’
‘মানে?’
‘মানে কিছুই নয়, এমনিই মনে হল। তোমার স্বামীর মতো—মেয়েটা তার স্বামীকে ত্যাগ করে তার লাভারকে বিয়ে করতে পারত কি?’
‘মেয়েদের অনেক অসুবিধে।’
‘কেমন?’ সে তীক্ষ্ন নজর রাখল মিতার মুখে। কিছু বলার জন্য ঠোঁট দুটো নড়ে উঠলেও কথা বেরোল না। কোনো আবেগকে যেন দমিয়ে রাখার চেষ্টায় ওর চোখ ছলছল করে উঠল। কৈশোরের ছেলেমানুষি আবার ফিরিয়ে আনার জন্য সে ইঙ্গিত দিচ্ছে, মিতার এমন ধারণা হলেও হতে পারে! কষ্টকর, নিঃসঙ্গ, একঘেঁয়ে বর্তমান অনেক সময় বুদ্ধিকে ঘোলাটে করে দেয়।
চড়বড় শব্দ করে বৃষ্টি নামল। এবার তাকে বাড়ি ফিরতে হবে। সে নিজেকে কথা দিয়েছে, বৃষ্টিতে ভিজবে ছাদে দাঁড়িয়ে। মিতা তার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে ভালোই করেছে, তা হলেই কথা বেড়ে গিয়ে সময় খরচ হবে।
‘তাড়া আছে আমার, বৃষ্টিটা যদি জাঁকিয়ে নামে, তাহলে ফিরতে পারব না।’
‘কতদূরে বাড়ি যে ফিরতে পারবে না? ছাতা আছে।’
সে ব্যস্ত হয়ে ঘরে এসে শূন্য ঝুলিটা কাঁধে তুলে নিল। ‘মাসিমা আমার তাড়া আছে, একজনের আসার কথা…আর একদিন আসব, মিতা চলি।’
মিতার মুখ দেখে বুঝল, ‘একজনের আসার কথাটা বিশ্বাস করেনি। তার এই হঠাৎ ফেরার তাড়া ওকে অপ্রতিভ করে দিয়েছে। নিশ্চয় তার এই আচমকা আসা আর বেমানান বিদায় নেওয়ার কারণ খুঁজতে অনেক রাত পর্যন্ত হাতড়াবে…বিবিও অনেক রাত পর্যন্ত জেগে তার অসুবিধেগুলোকে হয়তো নাড়াচাড়া করেছে।
মোমবাতি আর ছাতা হাতে মিতা সদর দরজা পর্যন্ত এল। ‘আজ আমার ভিজতে ইচ্ছে করছে, ছাতার দরকার নেই।’
‘সত্যি দরকার নেই?’
‘সত্যিই নেই।’ হয়তো মিতা চায়, ছাতা ফেরত দিতে সে আবার আসুক। তার বলতে ইচ্ছে করল, ‘একটু এগিয়ে দেবে?’
জমাট অন্ধকার আর বৃষ্টিধারায় তৈরি চাদরে ধাক্কা দিয়ে মিতার হাতে ধরা মোমবাতির আলো ফিরে এল। তাদের বাগানের পাঁচিলটা দেখা যাচ্ছে না। কেউ একজন ছুটে গেল ছপছপ শব্দ তুলে। আগে জল জমত শিবু বর্ধন লেনে, এখনও হয়তো জমে। চটি জোড়া খুলে সে থলিতে ভরল।
‘বহু বছর পর তুমি এলে রঘুদা।’ মিতার স্বর গভীর, অস্পষ্ট।
সে বৃষ্টির মধ্যে অন্ধকারে নেমে পড়ল। সিমেন্ট বাঁধানো গলি, গর্ত বা ঢিবি নেই তবে পেরেক বা মাছের কাটা পড়ে থাকতে পারে। আলতো করে পা ফেলে সে এগোল। শিবু বর্ধন লেনে পা দেবার আগে সে পিছন ফিরে তাকাল। হাতের তালুতে মোমবাতির শিখা আড়াল করে মিতা মাথা হেলিয়ে তাকে দেখার চেষ্টা করছে। অযথা চেষ্টা, তাকে দেখা যাবে না।
খালি পায়ে সে ছুটে ছাব্বিশ নম্বরের ফটকে পৌঁছল। চোখটা সইয়ে নিয়ে আবার এক ছুটে পৌঁছল সদর দরজায়। এইটুকু ছুটেই সে হাঁফিয়ে পড়েছে। থলি দিয়ে মুখের জল মুছে সে দরজা ঠেলতেই সেটা খুলে গেল। ভিতরে ঘন অন্ধকার। শুধু উঠোনে যাবার দরজাটা আধখোলা, সেখান দিয়ে দেখা যাচ্ছে রান্নাঘরের হারিকেনের আলো। একটা অস্ফুট চমকে ওঠার শব্দ। দ্রুত পায়ে কেউ সিঁড়ির দিকে চলে গেল। উঠোনের দরজা দিয়ে একজন নিঃসাড়ে প্রায় পিছলে ঢুকে গিয়ে দরজাটা ভেজিয়ে দিল। পাল্লা দুটো পুরো বন্ধ হয়নি। ফাঁক দিয়ে সে দেখতে পেল রান্নাঘরে ঢুকল অরুণা।
অন্ধকারে কী করছিল অরুণা! কে উঠে গেল দোতলায়! থলি থেকে চটি বার করে মেঝেয় ফেলল। পা গলিয়ে বুঝতে পারল, ভেজেনি। চেনা সিঁড়ি। দোতলায় উঠে দরজা ঠেলতেই খুলে গেল। এমার্জেন্সি লাইট জ্বালিয়ে বিবি খাতা দেখছে। এই সময় দালানে বসে ওর কাজ করা মানেই তার জন্য অপেক্ষা করা। ঘরে চিমনি লাগানো পিতলের কেরোসিন ল্যাম্প জ্বালিয়ে গুলু পড়ছে।
