‘সিনেমা দেখতে পার। একটা টিভি সেট কিনে ফেল।’
‘ভাবছি। একটা সাদাকালো ছোটো সেট দু—হাজার দুই—আড়াই পড়বে। মা—র তাহলে চেঁচামেচি করাটা বন্ধ হবে।’
‘চেঁচামেচি! কার সঙ্গে?’
‘ওপরে দাদার সঙ্গে। আর বোলো না, তুচ্ছ জলকল, ছাদ নিয়ে প্রায়ই দুজনের লেগে যায়। আমি আসার পর থেকেই এই ঝঞ্ঝাটের শুরু। দাদা পছন্দ করেনি এখানে এসে থাকি। আসলে বাড়ির শেয়ার দিতে হবে, এটাতেই আপত্তি। দাদার ধারণা, তার অনুগ্রহে আমি এ বাড়িতে রয়েছি। বলেই দিয়েছে, অংশ দাবি করলে কোর্টে যাও। …যাক গে এসব কথা।’
এসব কথা শুনতে তারও ভালো লাগছে না। সে এসেছে মিতাকে দেখতে, কৌতূহল মেটাতে। দু—কাপ চা হাতে মাসিমা এল। ‘একেবারে খালি পেটে খাবে, মিতা চানাচুরের শিশিটা বার কর।’
তাকের পরদা সরিয়ে একটা পেটমোটা শিশি মিতা নিয়ে এল। খবরের কাগজটার উপর কিছুটা ঢেলে নিজে একমুঠো তুলে নিয়ে বলল, ‘এই একটা শখ আমার, কিনে এনে রেখে দিই আর মাঝে মাঝে খাই।’
‘তোমার শখের খাওয়া ছিল তো এন্তার পেঁয়াজ দিয়ে ঝালমুড়ি।’ সে মনে করিয়ে দিল ইচ্ছে করেই। মিতার স্মৃতিতে তার ছবি কতটা ঝাপসা হয়েছে সেটা সে জানতে চায়।
‘তোমার মনে আছে!’
মিতার চোখ ঝকঝক করে উঠল বাচ্চচা মেয়ের মতো। সে তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে খুঁজল সেখানে আরও কিছু দেখতে পাওয়া যায় কি না। অনাবিল সারল্য, মজা পাওয়া…লাজুক একটা ছায়া ভেসে গেল না। ও যদি ভুলে গিয়ে থাকে তা হলে সে হাঁফ ছাড়বে। এখন দুজনেরই বয়স হয়েছে।
‘টেবিলে ফাইল দেখছি, অফিসের নাকি?’
মিতা টেবলের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, ‘মাঝে মাঝে গল্প লেখার চেষ্টা করি। সময় কাটাতে হবে তো।’
‘ছাপা হয়েছে? আমি তো পড়াটড়ার ব্যাপারে…’ কথাটা শেষ না করে শুধু হাসল।
‘তিন—চারটে ম্যাগাজিনে পাঠিয়ে ছিলাম, একটাও ছাপা হয়নি।’
মিতাও হাসল। হাসিতে তিক্ততা নেই। ‘কাঁচা লেখা, বুঝতে পারি। তবুও পাঠিয়েছিলাম।’
‘একটা পড়াবে?’
‘ওরে বাবা! পড়বে আর হাসবে, আর মনে মনে বলবে কী অপরিণত, ছেলেমানুষি লেখা। দরকার নেই পড়িয়ে। কোথাও আর এখন পাঠাইও না।’
‘আচ্ছা আমাকে দেখে তুমি অবাক হওনি?’
‘হইনি মানে? এখনও হচ্ছি। গলগল করে কথা বলতে, আর এখন টিপে টিপে একটা দুটো করে মুখ থেকে বেরোচ্ছে।’
‘আমি ঠিক এইরকম অবাক হওয়ার কথা বলছি না। হঠাৎ এতদিন পর এলাম কেন, এটা তোমার জানতে ইচ্ছে করছে না।’
‘করছে, বলো কেন এসেছ?’
‘ভীষণভাবে তোমাকে দেখার ইচ্ছে হল বলে।’ বলে ফেলেই তার মনে হল, বলাটা ঠিক হয়নি। কথাটার অনেক রকম অর্থ করা যায়। ‘আসলে আমার পুরোনো দিনের আর এখনকার দিনের মধ্যে একটা বিরাট গর্ত রয়ে গেছে, সেটা ভরাট করার চেষ্টা করছি। কে কীরকম হয়ে গেছে সেটা দেখতে চাই।’
‘দেখে বুঝতে পারবে? আমাকে তো দেখছ, বলো তো আমি কী রকম হয়েছি? বাইরের চেহারা অনেক বদলে গেছে, সেটা নিশ্চয় ভরাট করার কাজে লাগবে না।’
সে মুখ নামিয়ে মিতার পায়ের কাছে মেঝেয় চোখ রাখল। কী বলবে? এলাহাবাদে গিয়ে কতদিন পর্যন্ত আমাকে মনে রেখেছিলে? …বিবি চার বছর আমার সঙ্গে দেখা করতে যায়নি, শেষ ছ—টা চিঠির উত্তর দেয়নি, বিবি আমার বউ!…শ্রীগোপাল বেঁচে থাকলে কী বলতো ‘রোঘো তোর জন্য করাপ্ট হয়ে গেলুম।’ …আমি কেন গুলুকে জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চাইলাম? …সন্দেশের বাক্সটা নিতে চাইল না, টিফিনের সময় আমার খাবারের ভাগ নিয়েছে…দিলীপদা যদি ছেলের কথা ভেবে…
‘কই বলো?’
‘কী বলব ভেবে পাচ্ছি না, এই তো কিছুক্ষণ মাত্র তোমায় দেখছি। তুমি কী ছিলে সেটাই জানি না, তোমার বদল হওয়াটা আমি ধরতে পারছি না, পারবও না।’
‘আমি কী ছিলাম সেটা তুমি জান না?’ প্রশ্ন করলেও সেটা অবাক হয়ে।
সে মাথা নাড়ল যেন গভীর ভাবনার মধ্যে ডুবে থেকে। যা মনে পড়ছে সেটা শুধু পেঁয়াজের গন্ধ।
দুটো ছোটো থালায় রুটি, বেগুনভাজা নিয়ে মাসিমা এল। একটা থালা দিল মিতাকে, তাতে কাঁচালংকা নেই।
‘আসার পর থেকেই দেখছি আপনি রান্নাঘরে, বসুন।’
মিতা গম্ভীর হয়ে গরম বেগুনভাজা আঙুল দিয়ে খোঁচানোয় ব্যস্ত। এতে তাড়াতাড়ি জুড়োয়। সে, গরমই খেতে চায়।
‘বসার আর ফুরসত কোথায় বাবা, একা হাতেই তো সব করতে হয়। ঘরমোছা, বাসনমাজার ঝি একটা আছে, দোকানবাজার তো আমাকেই করতে হয়, রান্নাবান্নাও। ….তোমার ছেলেমেয়েরা তো সব বড়ো হয়ে গেছে, করছে কী? পড়ছে?’
‘হ্যাঁ।’ রুটির ছেঁড়া টুকরোয় বেগুনভাজা তুলে মুখে দিল।
‘শিক্ষিত বউ, ছেলেমেয়েদের পড়াশুনো তো হবেই। ওপরে যাবে নাকি?’
‘গিয়েছিলাম।’
‘আমাদের কথা কিছু বলল?’
‘না।’ কাঁচালংকা দাঁতে কাটল।
‘সন্তুর বন্ধু ছিলে, তখন তুমি খুব আসতে।’
সে চট করে মিতার মুখের দিকে তাকাল। মুখটা নামিয়েই রয়েছে। তার মনে হল, কিছু একটা ভাবছে।
‘মিতার বিয়েতে তুমি আসনি।’
সে চুপ করে রইল। লংকাটায় ঝাল আছে। মিতা মুখ তুলে তাকে দেখে বলল, ‘খুব ঝাল?’
‘ঠিক আছে।’
‘মেয়েটার কী যে ভাগ্য… তাড়াহুড়ো করে বাপ এমন জায়গায় বিয়ে দিল, খোঁজখবরও ভালো করে নেওয়া হয়নি। …সবাই বলে খোরপোষের মামলা করতে। সন্তুই করতে দেয়নি। কাগজে খবর বেরোবে, চতুর্দিকে ঢিঢিক্কার পড়ে যাবে…তোমার কী মনে হয়?’
‘যদি কেস তেমন থাকে, তা হলে করা উচিত।’
