মনে হল মাসিমার গলা। ‘দরজা খুলে একবার দেখুন না।’
দরজার দুটো পাল্লা আধ হাত ফাঁক হল। মাসিমাই দাঁড়িয়ে। চশমা নিয়েছে, শরীর একটু ঝরেছে, সে হাসল। ‘চিনতে পারছেন মাসিমা? বলুন তো কে?’
‘রঘুদা!’
সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে শুধু বলল, ‘মিতা!’
‘দাড়িটাড়ি রাখলেও চিনতে ঠিকই পেরেছি।’
‘আমি পারিনি।’ কথাটা কুণ্ঠিত স্বরে বললেও মিতার ঝকঝকে চোখ তাকে স্বস্তি দিল।
‘ভেতরে এসো…মা দ্যাখো, কে এসেছে।’
‘কে রে?’ ঘর থেকে বেরিয়ে এল এক প্রৌঢ়া; স্থূল বপু, থান কাপড় ছাড়া আর সবই একরকম রয়ে গেছে। চাহনি বলে দিল চিনতে পারেনি।
‘চিনতে পারছ না?’
‘না তো…ওমমা, এ তো রঘু!’
সে প্রণাম করল। কত বছর পর? শেষবার বাবাকে খাটে তোলার আগে? …দাদাকে বিজয়ার দিনে? মাসিমাকে শেষ কবে দেখেছে মনে পড়ছে না। আজকের মিতার মতোই দেখতে ছিল। ঝুলি থেকে সন্দেশের বাক্সটা বার করে মিতার দিকে এগিয়ে ধরল।
‘অন্নদার!…অনেক দিন ওদের গুজিয়া খাইনি…এনেছ নাকি?’ বাক্সটা হাতে নিল মিতা।
‘রাতাবি।…গুজিয়ার কথাটা মনে ছিল না।’
‘তুমি আমাকে গুজিয়া খাওয়াতে।’ মিতার ঠোঁট ছড়িয়ে পড়ল। ছড়ানো ঠোঁটের ধাক্কায় পঁচিশ—তিরিশ বছর যে কীভাবে ধসে পড়ে সে অবাক হয়ে দেখল।
‘ঘরে নিয়ে বসা, দাঁড়িয়ে থাকবে নাকি?’
‘রঘু শোনো…আর তুমি এ বাড়িতে এসো না…’ বছর, বয়স, ঘটনা, মানুষকে কীভাবে পালটে দেয়! ‘তোমাদের কম বয়স, ভুলে যেতে অসুবিধে হবে না।’ ভুলে কে গেছে? জীবনের প্রথম ঘটনাগুলো ভোলা যায় না। এ বাড়িতেই তার প্রথম চুমু, প্রথম অপমান।
দুটো সিঙ্গল খাট ঘরের দু—ধারে। পরিষ্কার দুটো সাদা—সবুজ মোটা ডোরাকাটা বেডকভার, তার উপর একটা খবরের কাগজ, বোধহয় মিতা পড়ছিল। দেয়াল—তাকগুলো পরদা দিয়ে ঢাকা। জানলাগুলো খুলে পরদা নামিয়ে দেওয়া, পাখা ঘুরছে। ঘরে আসবাব বলতে একটা ছোটো টেবল আর চেয়ার, ট্রানজিস্টর রেডিয়ো, কিছু বইয়ের একটাকে মনে হল অভিধান, ছোটো একটা ঘড়ি, দু—তিনটে ফাইল, টেবল ল্যাম্প। অনেকটা বিবির ঘরের মতোই, তবে কমদামি। আলনাটা দাঁড়িয়ে আছে শাড়ি ব্লাউজ, ছাতা, হাতব্যাগ ঘাড়ে ঝুলিয়ে।
‘এই খাটটায় বোসো, ওটা মায়ের।’ মিতা বাক্সের রাবারব্যান্ড খুলতে খুলতে বলল, ‘মা—র একটু ছোঁয়াছুঁয়ির ব্যাপার আছে।’
সে মিতার মুখ থেকে পা পর্যন্ত চোখ নামাল। কালো পাড়ে জরির পটি, বেলের পানা রঙের জমি। শাড়িটা ওর শ্যামলা গায়ের রঙকে খুলে দিয়েছে। বাহু, ঘাড়, কবজি, গলা ডৌল বজায় রেখেছে। বিবিরই বয়সি, তবে তার মতো কোমরের নীচে চর্বি জমেনি। মিতা বদলেছে কী বদলায়নি তা সে জানে না। বস্তুত সম্পূর্ণ একটা নতুন মানুষকেই সে দেখছে। বহুকাল আগে কিছুদিনের জন্য তারা প্রেমিক—প্রেমিকা ছিল, এই পর্যন্তই। কিন্তু সেই সম্পর্কটাকে এখন টেনে আনা যায় না। সেও তো এদের কাছে নতুনই। মিতার মুখটা খোলামেলা, চোখদুটোয় অস্পষ্টতা নেই, শক্ত চোয়ালে স্বনির্ভরতা, কথা ঝরঝরে। একটু আগেই বোধহয় অফিস থেকে ফিরেছে, ক্লান্তি মুখে লেগে।
বাক্সটা খুলে চোখদুটো বড়ো করে মিতা একটা সন্দেশ তুলে মুখে দিল। ‘ভীষণ খিদে পেয়েছে…নাও ধরো।’ বাক্সটা তার মুখের কাছে ধরল।
‘আমি ছুঁলে মাসিমাকে দেবে কী করে?’
মিতা চট করে ঘরের বাইরে তাকাল। ‘মা এখন চায়ের জল বসাতে গেছে…তুলে নাও। মা—র এই ব্যাপারটা আমি সহ্য করতে পারি না, খিটিমিটি লাগে।’
সে একটা সন্দেশ তুলে নিল। বাক্সটা হাতে নিয়ে মিতা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সে এখানে এল কোন সুবাদে? ছেলের বন্ধু? মেয়ের বন্ধু? প্রতিবেশী? এরা নিশ্চয় জানে গত ষোলো বছর সে কোথায় ছিল, কিন্তু কৌতূহলের কোনো ছিটেফোঁটা আভাসও দেয়নি। দুজনেই যেন খুশি হয়েছে সে আসায়। এরা নিঃসঙ্গ বোধহয়।
‘ওমলেট খাবে?’ জলের গ্লাস এগিয়ে মিতা বলল।
‘না। ডিমে অ্যালার্জি।’ মিথ্যে বলল, ডিম তার প্রিয় খাদ্য।
‘তা হলে?’ বিপন্ন দেখাল মিতাকে। ‘কী দিই বলো তো?’
‘গরম রুটি আর বেগুন ভাজা হবে, সঙ্গে কাঁচালংকা?’
‘হবে। বেগুন আছে, কাঁচালংকা আছে কি না দেখি।’ মিতা দ্রুত বেরিয়ে গেল।
ফরমাস করে রান্না করিয়ে খাওয়া, শেষ কবে? মাকে সে প্রায়ই বলত ‘নারকোল ছোলা দিয়ে মোচার সেই ঘণ্টাটা!’ ‘কাল বাজার থেকে মোচা আনতে বলব।’ ইলিশের মাথা দিয়ে তেঁতুলের টক করলে না কেন?’ ‘এবার ইলিশ এলে করে দেব।’ আর কাউকে কী তারপর খাওয়ার ইচ্ছের কথা সে বলেছে?
মিতা ফিরে এল। ‘কাঁচালংকা আছে।’
‘থাকুক, তুমি বসো তো! মনে হচ্ছে, একটু আগেই অফিস থেকে ফিরেছ?’
‘কোথায় অফিস জানো, তারাতলা! কম দূর, দু—বার বাসে চড়তে হয়!’
দু—হাত ছড়িয়ে সে পিছনে হেলে বসল, মিতা বসেছে চেয়ারটা টেনে তার থেকে চার হাত দূরে। কীসের অফিস, সেখানে কী কাজ করতে হয়, এমন সব প্রশ্ন করার ইচ্ছে হলেও সে করল না। যদি পালটা জিজ্ঞাসা শুরু করে! মিতা দেখেছে শ্রীগোপালকে, এলাহাবাদ যাবার আগে ফ্রক পরা পারুলকেও। ষোলো বছর আগে মিতা শ্বশুরবাড়িতে, হয়তো খবরের কাগজে পড়ে থাকবে।
‘অফিস আর বাড়ি, আর কিছু নয়?’ কথা শুরু করার জন্য নতুন করে দুই সদ্য পরিচিত আর কী বলতে পারে?
‘আবার কী? যাতায়াতেই প্রাণ বেরিয়ে যায়। বাড়ি ফিরে ধপাস করে বিছানায় পড়া, তারপর স্নান। রেডিয়োটা খুলি, গল্পের বই হাতে পেলে পড়ি…ভারী কিছু মাথায় ঢোকাতে ইচ্ছে করে না। এক একসময় ইচ্ছে করে ছবি আঁকি। এলাহাবাদে গান শিখেছিলাম কিন্তু একা একা কি গান গাওয়া যায়?’
