বোধহয় সনৎ বুঝতে পেরেছে, দৃষ্টিকটু রকমের ভদ্রতার অভাব সে ঘটিয়েছে তাই ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘চা খাবি?’
‘খাব।’ ইচ্ছে নেই তবু বলল। সনৎ নিশ্চয় আশা করেছিল সে ‘না’ বলবে, তা হলে তাড়াতাড়ি তাকে বিদেয় করার সুযোগ পেত। কিন্তু তার ক্ষীণ একটা ইচ্ছে জেগেছে একটা পরিবারের সঙ্গে কিছুক্ষণ কাটাতে।
‘বাবু, মাকে বল তো চা করতে।’
‘এক কাপ?’
‘না, দু—কাপ।’ ছেলে বেরিয়ে যেতেই সনৎ বলল, ‘তুই তো বেশ মোটা হয়েছিস, হলি কী করে? জেলে পাথর টাথর ভাঙতে হত না?’
‘না।’
‘আচ্ছা, তুই তো চোদ্দো বছরের বেশিই রইলি, কিন্তু আমি তো জানি যাবজ্জীবন মানে চোদ্দো বছর।’
‘যাবজ্জীবন মানে যাবজ্জীবনই। একটা লোক কতদিন বাঁচবে, সেটা তো আগাম বলা যায় না। তাই যাবজ্জীবন কথাটা ব্যবহার করা হয়। তবে কমপক্ষে চোদ্দো বছর কেটে যাবার পর অথরিটি রিভিউ করে দেখে লাইফারের আচার—আচরণ কেমন ছিল, ডিসিপ্লিন নিয়মকানুন ভেঙেছে কি না। সব কিছু ওদের মনোমতো হলে চোদ্দো বছর পরই ছেড়ে দেয়। তা ছাড়াও নানারকম ব্যাপারেও রেমিশন পাওয়া যায়।’
‘তাহলে তোর ষোলো বছর হল কেন?’
‘ওদের মনোমতো আমি হতে পারিনি।’ সে হাসল সনতের চোখে কৌতূহল জ্বলে উঠতে দেখে। সে বুঝল আরও বহু প্রশ্ন তাকে করবে।
‘কেন মনোমতো হতে পারিসনি?’
‘নানান রকম করাপশন, টাকা চুরি, ঘুষ, খাওয়াদাওয়া যা দেবার কথা দিত না, দাবি করলে নানা ছুতোয় মারধোর চালাত…এইসব নিয়ে প্রতিবাদ করেছিলাম, ক—জনকে সঙ্গে নিয়ে হাঙ্গার স্ট্রাইকও, তার ফলও পেলাম।’
এসব কথা বলতে তার ভালো লাগছে না। সে ভুলে যেতে চায় তার কারাবাসের জীবনটাকে, জীবনের কালো অধ্যায়টাকে। তবুও মাঝে মাঝে এক—একটা দেখে যাওয়া ঘটনা ফুলকির মতো ছিটকে ওঠে, জ্বালা ধরায়।
‘হ্যাঁরে রঘু,’ সনৎ দরজার দিকে চট করে তাকিয়ে নিয়ে ঝুঁকে চাপা গলায় বলল, ‘পারুল তো তোদের বাড়িতে বাসন মাজত!…ওর মা—র কাছে তো শ্রীগোপালের বাবা রেগুলার যেত!’
সে উত্তর না দিয়ে সনতের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কী বলতে চায় ও! চোখ দুটো ছোটো করে, ঠোঁট টিপে সনৎ একটা রহস্যকে গোপন রাখতে চাওয়ার চেষ্টা দেখাচ্ছে। সে জানে সনৎ কী ইঙ্গিত করতে চায়।
‘শুনেছিলাম নন্দ কাকা যেত।’
সনৎ আবার চট করে দরজার দিকে তাকিয়ে নিয়ে বলল, ‘পারুল হচ্ছে ওরই মেয়ে, সেটা জানিস?’
‘রোঘো আমি যা পাপ করেছি তার কোনো প্রায়শ্চিত্ত নেই…নিজের গলা নিজেই টিপে মরে যেতে ইচ্ছে করে।’
‘না, জানি না, তোকে কে বলল?’ ঠান্ডা গলায় সে জানতে চাইল।
‘হেঃ, এ তো সবাই জানে। দুজনের মুখের গড়নটা মনে করে দ্যাখ!’
‘তুই মনে করে দেখেছিস?’
‘ধ্যাৎ ধ্যাৎ, একটা প্রসের মেয়ের মুখ…’
‘কী আজেবাজে চিন্তা করছিস শ্রীগোপাল, তোকে নেশায় ধরেছে….আর খাসনি।’ ‘নেশা হনি আমার রণো, আমি এখন আরও খাব।’
‘ওর মুখটা কিন্তু ভালোই দেখতে ছিল।’
‘সেইজন্যই তুই…’ সনৎ বাক্যটা শেষ না করে চোখদুটোকে হাসাতে শুরু করল।
চা নিয়ে এল মেয়েটি, সুঙ্গে দুটো বিস্কিট। ‘তোমার নাম কী মা?’
‘পৌলমী।’
‘বাঃ বেশ নাম। সন্তু, মেয়ের মুখ তোর মতোই হয়েছে।’
সনৎ চুপ করে রইল। বিস্বাদ চা, দুটো চুমুক দিয়ে কাপটা টেবলে রেখে একটা বিস্কিট তুলে নিল। ‘মাসিমাকে দেখছি না যে, কেমন আছেন?’
‘মা নীচে আছে, ভালোই আছে।’ একটু থেমে সনৎ বলল, ‘নীচে মিতাও থাকে।’
‘তাই নাকি!’
‘স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে…আর বলিস না, মাকে নিয়ে হয়েছে যত ঝামেলা। পোস্টাপিসের কেরানি, কত আর মাইনে পাই, নিজের সংসার দেখব না বোনকে দেখব? তবু ভালো, একটা প্রাইভেট ফার্মে কাজ পেয়ে গিয়ে আমার ঘাড় থেকে নেমেছে।’ অনিচ্ছাভরে সনৎ খবরগুলো দিল।
‘তোর শিরদাঁড়ার ব্যথাটা যোগব্যায়াম করে কমেছে?’
‘অনেকটা।’ সনৎ কনুই ভেঙে ডান হাত ঘুরিয়ে পিঠে ঠেকাল।
‘তাহলে তোর ব্যায়ামে আর ব্যাঘাত ঘটাব না।’ সে উঠে দাঁড়াল। ‘তোর বউয়ের সঙ্গে পরিচয় হল না। …পরে একদিন আসব।’
সে ঘর থেকে বেরিয়েই দেখল, ছাদ থেকে সেদিন রাতে যাকে দেখেছিল, সেই স্ত্রীলোকটি দরজার পাশ থেকে ছিটকে শোবার ঘরে ঢুকে গেল। নিশ্চয়ই দরজা দিয়ে তাকে দেখার চেষ্টা করছিল। ধর্ষণকারীর মতো উত্তেজক জিনিস দেখার লোভ বেচারা সামলাতে পারেনি।
‘তুই মা—র সঙ্গে দেখা করবি নাকি?’
‘এলাম যখন দেখেই যাই।’
‘যা। আমার নামে এককাঁড়ি নিন্দে শুনবি।’ সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে সনৎ বলল, ‘ওরা নিজেরাই আলাদা হয়ে গেছে, আর লোকের কাছে বলে বেড়ায় আমি নাকি মা—বোনকে ভিন্ন করে দিয়েছি। তুই তো আমার মাকে হাড়ে হাড়ে জানিস।’
সনতের গলায় উৎকণ্ঠা। তার কৈফিয়তটা বিশ্বাস করল কি না সেটা জানার জন্য উদবেগ নিয়ে তাকিয়ে। ‘হাড়ে হাড়ে জানিস’ বলে পুরোনো কথা মনে পড়িয়ে দিতে চাইল? এতে কি তার মনটা তিক্ত, বিরোধী হয়ে উঠবে বলে ও আশা করে? জেলখাটা লোকের কাছে নিজেকে সুসন্তান বোঝাবার জন্য এই চেষ্টা কেন! সনতের মনের মধ্যে অপরাধ—বোধের গ্লানি যেন রয়ে গেছে, যাবজ্জীবন এটা থাকবে। বিবেকানন্দ হবার বাসনার কথাটা এখন আর নিশ্চয় ওর মনে নেই।
একতলায় নেমে এসে মিতাদের বন্ধ দরজার সামনে সে প্রায় এক মিনিট দাঁড়িয়ে রইল। টেবলে সন্দেশের বাক্সটা রেখে এসেছে, সেটা ফেরত দেবার জন্য যদি সনৎ ডাকে! তারপর সে দরজায় খুট খুট টোকা দিল গাঁট দিয়ে। চারবার টোকার পর ভিতর থেকে সাড়া এল, ‘কে?’
