‘দেখবে বাবা?…বড়ো কষ্টে আছে ছেলেটা, বয়স হয়ে গেছে, রোজগার নেই…।’ বুড়ির মুখের চামড়া গুটিয়ে ভাঁজ পড়েছে, চোখের রঙ ঘোলাটে, কষের দাঁত পড়ে গিয়ে গাল দুটো বসা। ‘তাহলে কবে তোমার কাছে বাবলুকে পাঠাব?’
‘না না পাঠাতে হবে না, আমিই দরকার হলে খবর দেব। আপনার বাড়ি তো আমি চিনি।’
‘চেনো? এই শিবু বর্ধন লেনে যাকে জিজ্ঞেস করবে বাবুলদের বাড়ি কোথায়, দেখিয়ে দেবে।’
‘আচ্ছা মাসিমা, আমার কাজ রয়েছে, আমি এবার যাব।’ সে হাতটা ছাড়িয়ে নিল বুড়ির মুঠো থেকে।
‘বাবা দেখবে তো? ছেলেটা দিন দিন কীরকম মনমরা হয়ে যাচ্ছে…।’
আর শোনার জন্য সে দাঁড়াল না। হন হন করে সে ফটক দিয়ে ঢুকে পড়ল। বাগান পর্যন্ত গিয়ে পিছনে তাকিয়ে দেখল বুড়ি চলে যাচ্ছে। তাকেও ওই গলিতেই সনতের বাড়ি যেতে হবে, বুড়িকে এগিয়ে যাবার সময় দিতে সে দাঁড়িয়ে রইল। …দিলীপদা বাড়িতে থাকত না, ছেলেটাকে চোখের সামনে রাখেনি…বউ বাগনানে…। সেজন্যই কি বাবুলের লেখাপড়া হল না? …বিবির চোখের সামনেই তো গোরা থাকত, তা হলে এমন হল কেন? কিশোর বাবুল রাজনীতির কিছু বুঝত কী?
শিবু বর্ধন লেনে বস্তিতে কিছু নকশাল ছেলে ঘাঁটি করেছে এটা সে শুনেছিল। পিস্তল হাতে সাদা পোশাকের পুলিশকে দুপুরে গলিতে ঢুকতেও দেখেছে। ঘরের বারান্দা থেকে দেখেছে বাড়ি বাড়ি জানালায়, ছাদে উঁকি দিচ্ছে বাড়ির মেয়েরা। তখন দু—তিনটে বোমা ফাটার শব্দও পেয়েছে। এইরকম পুলিশি হানায় হয়তো বাবুলকে তুলে নিয়ে গেছে। …দিলীপদা ছেলের দিকে নজর দিলে বাবুল আজ কী হতে পারত? আর যাই হোক, গোরা হত না।
বুড়ি আরও একটু এগিয়ে যাক। সে ফটকের কাছে এসে দাঁড়াল। বুড়ি কিন্তু একবারও জানতে চাইল না কেন কীজন্য সে জেল খেটে এল। নিশ্চয়ই জানে, তবুও কৌতূহল নেই। সাঁইত্রিশ কি আটত্রিশ বছরের নাতি মনমরা, প্রায় পঙ্গু…ঠাকুমার প্রাণ! এইরকম একটা প্রাণ কি বিবি পেতে পারত না?
সে ফটক ছেড়ে এগিয়ে শিবু বর্ধন লেনে উঁকি দিল। বুড়িকে দেখা গেল না। সনৎদের একতলায় বৃষ্টির অনুমানেই জানলাগুলো বন্ধ। সে দ্রুত গিয়ে জানালার পাশ দিয়ে একগজ চওড়া সিমেন্ট বাঁধানো গলিটায় ঢুকল। প্রথম দরজাটা সনৎদের, পরেরটা বঙ্কু পাইনদের।
দরজাটা খোলা রয়েছে। ঢুকেই সামনে রান্নাঘরটা। এরই দরজা থেকে মিতার মা ডেকেছিল, ‘রঘু শোনো।’ কী গম্ভীর গলায়। এখন রান্নাঘরের দরজায় শিকল তোলা। ডানদিকের ঘরের দরজাটা বন্ধ। বাঁদিকে সিঁড়ি সে দোতলার বারান্দায় উঠে এল।
‘সন্তু আছিস নাকি?’ কত বছর পর সে এইভাবে ডাকল? সন্তু তখন ঘর থেকে বলত, ‘আছি রে, আয়।’
আদুড়—গা বছর দশেকের একটা রোগা ছেলে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। পাজামা—পাঞ্জাবি, কাঁধে ঝুলি, দাড়ি, কটা চোখ আর ছ—ফুটের উপর লম্বা ভারী চেহারা, সব মিলিয়ে ছেলেটা হতভম্ব।
‘সনৎ আছে?’
কথা না বলে ছেলেটা ঘরে ঢুকে গেল। বারান্দাটা আগের মতো ছিমছাম নেই। একধারে নোংরা লাগা পুরোনো চটি আর জুতো, তার পাশে রেলিংয়ে গোঁজা রয়েছে ঘর মোছার ন্যাতা, তারে ঝোলানো প্যান্ট, জাঙ্গিয়া, গেঞ্জিগুলো ময়লা, ছেঁড়া। গামছাটারও সেই দশা। বারান্দার শেষ প্রান্তে বোধহয় রান্নাঘর। ওখানে একটা গ্যাসের সিলিন্ডার রাখা।
‘কে?’ খালি গায়, লুঙ্গির কষি আঁটতে আঁটতে বেরিয়ে এল সনৎ। তার পিছনে ছেলেটা আর ফ্রক পরা এক কিশোরী। ‘কাকে চাই?’ বলেই সে চিনতে পেরে কপালে ভাঁজ ফেলল। ‘রঘু!’
সে যা ভেবেছিল, সেটা ঘটল না, আঁতকে ওঠেনি তাকে দেখে।
‘অবাক হয়ে যাচ্ছিস তো?’
‘তা একটু হচ্ছি…ব্যাপার কী?’
‘এসে ডিস্টার্ব করলাম না তো?’
‘যোগব্যায়াম কচ্ছিলুম…শিরদাঁড়াটায় একটা রেগুলার যন্ত্রণা হয়… তোর ফেরার খবর পেয়েছিলুম ঠিকই…বসবি?’
‘একটু বসি।’
সনৎও তার ফেরার কথা জানে। পাড়ায় তা হলে তো সবাই জেনে গেছে। বলল, ‘একটু অবাক হচ্ছি’, আসলে যথেষ্টই হয়েছে। তারা দুজনে আলাদা কলেজে পড়েছে, আর তখন থেকেই তো তাদের বন্ধুত্বের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছল। আবার এত বছর পর একেবারে দোতলায় আচমকা তাকে দেখতে পেয়ে বোধহয় অস্বস্তিতে পড়ল।
সনৎ তাকে নিয়ে বসাল, শোবার ঘরে নয়, ছোটো একটা ঘরে। আলনায় রাখা পোশাক, ছোট্ট টেবলটায় রাখা বইপত্র থেকে বোঝা যায়, এ ঘরে ছেলে আর মেয়ে থাকে। দরজার ঠিক পিঠ করে রাখা ঘরের একমাত্র স্টিলের ফোল্ডিং চেয়ারটা দেখিয়ে সনৎ ‘বোস’ বলে নিজে বসল খাটে।
বসার পর ঝুলি থেকে সে রাতাবির একটা প্যাকেট বার করে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটির দিকে বাড়াতেই সে নিয়ে নিল।
‘আরে আরে, এসব কী…না না, দিতে হবে না…বাবু ওটা নিয়ো না।’ সনৎ যেভাবে আঁতকে উঠল তাতে সে একটা ধাক্কা খেল। ছেলের হাত থেকে বাক্সটা ছিনিয়ে নিয়ে সনৎ এগিয়ে ধরল তার দিকে। তার আসাটা পছন্দ করেনি বোধহয়।
‘আরে অন্নদার রাতাবি, আজ বিকেলের তৈরি!’
‘হোক, তুই এটা রেখে দে।’
টিফিন খাওয়ার সময় দূর থেকে সনতের চাহনিটাকে সে এখন ওর চোখে খুঁজল। আড়চোখে একবার তাকিয়ে দেখল সেই চাহনিটা রয়েছে ওর ছেলের চোখে। এখন সনতের চোখে গৃহস্থের সামাজিক বিপন্নতা। একটা খারাপ অপরাধী তার ঘরে এসে বসেছে। সে রেগে উঠবে নাকি মজা পাবে, ঠিক করে উঠতে না পেরে বাক্সটা হাত থেকে নিয়ে টেবলে রাখল।
