‘ঘোষদা ভালো আছেন?’
লোকটি মুখ তুলে ভুরু আর নাক কুঁচকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলল, ‘অনেকদিন পর দেখছি, তুমি ভালো আছ? দাড়ি কবে রাখলে?’
‘ভালো আছি। দাড়িটা এই তিন—চারমাস।’
ঘোষদা আবার মাথা নামিয়ে কাজে মন দিল। একটা হালকা ভাব তাকে এখন জড়িয়ে ধরল। ঘোষদা তাকে চিনতে পেরেছে দাড়ি থাকা সত্ত্বেও। এই লোকটার কাছে এখনও সে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরা ছেলেটা হয়েই রয়েছে। দই নেবার পর প্রতিবারই বায়না করত, ‘আর একটু ঘোষদা।’ তরুণ বয়সি দোকানি চামচটা দিয়ে অতি সামান্য একটা চাকলা তুলে ভাঁড়ে ঝাঁকিয়ে ফেলে দিয়ে বলত, ‘পালা এ বার।’
বাক্স দুটো ঝুলিতে ভরে সে গৌরচরণ ঘোষ লেন ধরে ফিরে এল সূর্য গাঙ্গুলি স্ট্রিটে। হনুমান পার্কের ফটকে ঘুগনি আর ফুচকার সামনে ভিড়। এতটা পথ সে এল, কেউ তার দিকে ভালো করে তাকালও না। প্রেসের সিসে চুরি করেছিল বলে তাদের পাড়ার একটা লোক তিনমাস জেল খেটেছিল। একদিন একটা লোক রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল, তাকে দেখিয়ে সনৎ বলেছিল, ‘ওই দ্যাখ নাড়ু চাটুজ্জে যাচ্ছে, সিসে চুরি করেছিল।’ ‘কবে?’ ‘অনেকদিন আগে, একবছর হবে!’ ‘তুই, জানলি কী করে?’ ‘কেন! সবাই তো জানে!’ সে যাবজ্জীবন খেটে বেরিয়ে এসেছে, কেউ তাকে চেনেই না! পাড়ায় এখন এত ভিড়, এত অচেনা লোক!
ধরেদের রকের স্টেশনারি দোকানের ছেলেটি এক বুড়িকে দু—তিনটে চিরুনি দেখাচ্ছে, একটি বউ বুড়ির পাশে, হাতে প্লাস্টিকের দুটো টিফিন বাক্সের কোনটে নেবে ঠিক করতে পারছে না। সামনের বাড়ির সালোয়ার—কামিজ পরা মেয়েটি স্টিলের গ্লাসে জল নিয়ে রাস্তা পেরিয়ে দোকানের ছেলেটির সামনে এল। ছেলেটি ব্যস্ত দুজন খদ্দের পেয়ে, মেয়েটি গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে রইল। হেমন্ত বোধহয় এই দোকান থেকেই তার জন্য চিরুনি আর টুথ ব্রাশ কিনেছে।
সে ছাব্বিশ নম্বরের ফটকের সামনে এসে দু—ধারে তাকাল। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়ছে। বিকেলে মেঘ দেখেছিল। তখন ঠান্ডা বাতাসও কয়েক মিনিট বয়ে ছিল। রাতে জোরে যদি নামে তা হলে সে ছাদে গিয়ে ভিজবে। দূর থেকে থলি হাতে হেমন্তকে সে আসতে দেখল।
‘তুমি রঘু না?’
সে চমকে ঘুরে দাঁড়াল। সেই বুড়ি, যে চিরুনি কিনছিল। কিন্তু একে তো সে চিনতে পারছে না!
‘তুমি তো জেলে গেছলে, কদ্দিন ছিলে?’
‘ষোলো বছর।’
‘ষো—লো—ব—ছ—র!…আমার নাতিটাকে পুলিশ তুলে নিয়ে সাতদিন রেখেছিল, এমন মার মেরেছিল যে চারমাস শয্যাশায়ী ছিল, ডান পা—টা খোঁড়াই হয়ে গেল, আজও ভালো করে হাঁটতে পারে না।’
‘কী করেছিল আপনার নাতি?’
‘নকশাল করত। তবু ভালো গুলিটুলি করে মেরে দেয়নি।…মাধ্যমিকটাও যদি পাশ করত। বাপের তো কোনো নজর ছিল না সংসারের দিকে, তখন তো বাড়িতেও থাকত না ওই নকশালদের ভয়ে।’
‘আপনাকে আমি ঠিক চিনতে পারছি না।’
‘এই শবু বর্ধন লেনের ভেতর দিকে থাকি, তোমাকে তো ছোটোবেলা থেকে আমি দেখেছি। আমার ছেলে দিলীপকে তো তুমি চেনো!’
‘ও হো, আপনি দিলীপদার মা।..দিলীপদা কী করছে এখন?’
‘সে তো ছ—বছর হল মারা গেছে, ক্যানসারে।’
সে অপ্রতিভ হয়ে পড়ল। ইতিমধ্যে কেউ যে মারা যেতে পারে, সেটা তার মনে কখনো আসেনি। এ বার থেকে খেয়ালে রাখতে হবে। হেমন্ত দাঁড়িয়ে তাদের দুজনকে দেখে বাড়ির মধ্যে চলে গেল। বৃষ্টির ফোঁটা আর পড়ছে না।
দিলীপের সঙ্গে তার কখনো আলাপ হয়নি। দিলীপদা কম্যুনিস্ট পার্টি করত। এক সন্ধ্যায় দেখেছিল, ছোটো একটা মিছিল নিয়ে স্লোগান দিতে দিতে এই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে। সে তখন মোটর বাইকে ফিরছিল, মিছিল দেখে দাঁড়িয়ে যায়। অযথাই দিলীপদা তার সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে স্লোগান দেয় : ‘ভিয়েতনামে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত ব্যর্থ করো…ব্যর্থ করো…ব্যর্থ করো।’ হঠাৎ যে কেন তার সামনেই ওর স্লোগান দেবার ইচ্ছে হল, সেটা কোনোদিনই সে বুঝে উঠতে পারেনি।
‘বাবুল তো ওরই ছেলে, যে খোঁড়া হয়ে গেছে।’
‘বাবুল করছে কী?’
‘কী আর করবে, ইস্কুলের পাশ তো হল না, একটা রোলের দোকান দিয়েছিল, চলল না। একজনকে ধরে জুতোর দোকানে একটা কাজ জুটিয়ে দিলুম। বলব কী বাবা, সেখানে এমন ধর্মঘট লাগল যে, দোকান সেই যে বন্ধ হল, আজও খুলল না। ওর মা বাগনানে একটা ইস্কুলে পড়ায়, তাতেই সংসার চলে। হ্যাঁ বাবা, তোমার তো অনেক চেনাজানা আছে। দ্যাখো না আমার নাতিটার জন্য…কত লোককে তো বললুম!’
সে প্রায় হতভম্ব হয়ে গেল বুড়ির কথা শুনে, ছুঁচ ফোটার মতো কষ্ট বোধ করল। এইমাত্রই শুনল ষোলো বছর সে জেলে ছিল, আর তার কাছেই নাতির জন্য কাজ যোগাড় করে দিতে বলছে! সে কোনোক্রমে বলল, ‘আমি কী করে কাজ দেব!’
‘কেন তোমার বাড়িতে যে ইস্টিলের আলমারি টেবিল তৈরি হয়, ওখানে বলে ঢুকিয়ে দাও না।’
‘ওটা আমার ব্যবসা নয়, আমি ওর মালিক নই।’
‘তোমার বাড়ির মধ্যেই তো, তুমি বললে ফেলতে পারবে না।’
বুড়ি তার হাত চেপে ধরল। অদ্ভুত একটা সিরসিরানি তার হাত বেয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে গেল। বুড়ি তার সম্পর্কে কতটুকু শুনেছে কে জানে, কিন্তু একটা মানুষ অন্তত ধরে নিয়েছে সে কিছু উপকার করতে পারে। বুকের মধ্যে কী যেন একটা কেঁপে উঠছে, দয়া, মমতা কিছু একটা হবে। কিংবা নিজের উপর আস্থা।
‘আচ্ছা আমি দেখব, কোথাও যদি কিছু করা যায়।’
