সে বিবির কথাগুলোকে ন্যায্য মনে করল। সাতাশ বছর বয়স থেকে ও একা। সে জবাব দিতে পারল না। সে জানে তার অপরাধটা নিছকই ব্যক্তিগত। সে যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুসেনা খতম করার মতো বা অত্যাচারী শাসককে হত্যা করার মতো বা স্ত্রী—পুত্র—কন্যাকে বাঁচাতে ডাকাত মারার মতো কাজ করেনি। তার কাজের সঙ্গে কারুরই স্বার্থ বা হিত জড়িয়ে নেই। তার কৃতকর্মের জন্য যে প্রতিক্রিয়াগুলো ঘটবে তার ফল তাকেই ভোগ করতে হবে। সে জানে, এটা তাকে মেনে নিতেই হবে। কিন্তু যুক্তির কথা আর একটা পুরুষমানুষের অন্তর, আবেগ, অনুভূতি, ব্যক্তিত্ব নাও মিলতে পারে। প্রত্যেকেরই মনের নিজস্ব চলন আছে। এভাবে বউকে হারাতে হবে সে কখনো ভাবেনি। কিন্তু বিবি হারিয়ে গেছে। ওর মনে তার জন্য এক মিলিমিটারও জায়গা নেই। দয়া ছাড়া আর কিছু ওর দেবার নেই।
‘বিবি, ন্যায়—অন্যায়ের প্রশ্ন তুললে, আমার কিছুই বলার নেই। কিন্তু আমি এসে দেখছি এই সংসারের সবাই অস্বাভাবিক, আমি আপন করে পেতে চেয়ে কাউকেই পাচ্ছি না। আমি খারাপ লোক, তাই বলে ছেলে কেন অপমান করবে? তুমি সেটা চুপ করে দেখে গেলে। বাবাকে শ্রদ্ধা করতে বলছি না কিন্তু একটা বয়স্ক লোকের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হয় সেটা সে শিখল না কেন?…আমি কি এর উত্তর তোমার কাছে দাবি করতে পারি? আমাকে ঘেন্না করতে শিখিয়ে তুমি ওদের ক্ষতি করেছ।’
এমন একটা প্রশ্নের জন্য বিবি তৈরি নেই বলে তার মনে হল। নয়তো মুখ নামিয়ে হাতের খাতাগুলো জড়ো করে টেবলে ঠুকে ঠুকে গোছানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ত না।
‘তুমি ওদের মন বিষিয়ে দিয়েছ আমার বিরুদ্ধে।’
‘আমাকে কিছুই করতে হয়নি। ওরা বড়ো হয়েছে, ওদের বাইরে বেরোতে হয়।’ বিবির মুখ তুলে তার চোখের দিকে তাকাল। ওর দৃষ্টিতে একই সঙ্গে অসহায়তা আর মর্মবেদনা সে দেখতে পেল।
‘ওদের বিচারবোধ গড়ে উঠেছে, ওরা অনেক কিছু শুনেছে, ওরা অস্বাভাবিক হয়ে উঠলে তার জন্য কে দায়ী?’
উত্তর দাবি করার ভঙ্গি নয়, বিবি যেন বিবৃতি দিল। বিবৃতিটা তার কাছে অপ্রত্যাশিত নয়। ‘মা বলে তোমার জন্যই রণো এমন হয়ে গেছে।’ গুলুকে সে বুকে টেনে নিয়ে বলেছিল, ‘তোর বাবাকে মাপ করে দে…তোদের ক্ষতি করেছি।’ সে গোরাকে যদি বুকে টেনে নিয়ে মাপ চায় তা হলে কী গোরা বলবে, ‘তুমি এতকাল না থাকার জন্য কষ্ট তো হতোই।’
খাতাগুলো নিয়ে বিবি ঘরে চলে গেল। অরুণা ট্রেতে রাতের খাবার নিয়ে এসেছে একতলা থেকে। টেবলে ঢাকা দেওয়া বড়ো বড়ো বাটিগুলো রেখে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনার খাবার এখন আনব?’
‘আর একটু পরে।’
ঘরে যাবার সময় সে রণোর ঘরের খোলা দরজা দিয়ে তাকিয়ে দেখতে পেল বাগানের দিকের বারান্দায় দাঁড়িয়ে রণো সিগারেট খাচ্ছে। নিজের ঘরে ফিরে সে বিছানায় শুয়ে পড়ল এবং এতক্ষণে অনুভব করল দেয়ালে ঘুঁষি মারাটা উচিত হয়নি..আঙুলের গাঁটে যন্ত্রণা হচ্ছে।
ছয়
স্কুল থেকে ফেরার সময় প্রায় প্রতিদিনই সে অন্নদা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে হয় আট আনার দই নয়তো একটা রাতাবি সন্দেশ কিনত। অন্নদার এই দুটি তল্লাটের নামকরা জিনিস। যারা মিষ্টির সমঝদার, দূর থেকে এসেও মাঝে মাঝে তারা বাক্সভরা রাতাবি কিনে নিয়ে যায়।
দোকানটার গড়ন একই রয়ে গেছে। ঘোষদা যেখানে বাবু হয়ে বসত, এখন সেখানে সেইভাবেই বসে আছে এক ছোকরা। সামনে দইয়ের দুটো আধখালি সরা। তার বাঁ দিকে কাচের আলমারিতে কয়েকটা সন্দেশের থালা। সাদামাটা একই দই—সন্দেশের দোকান। আলমারির পিছনেই মেঝেয় বসে দুটো বিশাল বারকোশে দুজন লোক সন্দেশের দুটো তাল মাখছে, লেচি কাটছে, হাতে পাকাচ্ছে, ছাঁচে চেপে আতা কী শাঁখ কী তালশাঁস বানিয়ে থালায় সাজিয়ে রাখছে। থালাটা চলে যাচ্ছে আলমারিতে, সেখান থেকে ফিরে আসছে খালি থালা। লোক দুটোর পিছনে ছোটো একটা তক্তপোশে বসে থাকত ঘোষদার বাবা। দিনে কতবার যে থালা চালাচালি হয় তার হিসেব একমাত্র জানে তক্তপোশে বসা লোকটি, যার কনুইয়ের নীচে একটা ময়লা কাঠের ক্যাশবাক্স। তার পিছনে একটা ছোট্ট ঘরে ভিয়েন। তক্তপোশে বসেই তৈরি হওয়া থেকে বিক্রি পর্যন্ত সবটাই লক্ষ রাখা যায়।
অন্নদার সামনে সে মিনিট তিনেক দাঁড়িয়ে শুধু দোকানটাকে দেখল। আলমারিতে নরম আর কড়া দু—রকম পাকের সন্দেশই থালায় রয়েছে। সে সেখল কড়াপাকের রাতাবি রয়েছে মাত্র কয়েকটা। তার দরকার দু—বাক্সে অন্তত চল্লিশটা। একটা বাক্স সনতের, অন্যটার মিতার জন্য।
‘রাতাবি কত করে?’
‘এক টাকা আর দেড় টাকা।’ দই কেটে ভাঁড়ে তুলে দিতে দিতে ছোকরা বলল। চোখ তুলে তাকাবারও ফুরসত তার নেই।
‘কখনকার তৈরি?’
‘বিকেলের।’
‘থালায় তো কয়েকটা মাত্র।’
‘আপনার কত চাই?’
‘দেড় টাকার চল্লিশটা, দুটো বাক্সে।’
ছোকরা দুটো কার্ডবোর্ডে ভাঁজ করে বাক্স বানিয়ে আলমারির পিছনে ছুড়ে দিয়ে বলল, ‘দেড় টাকার চল্লিশটা, দু—বাক্সে।’
সে একটু পাশে সরে অন্য খদ্দেরদের জন্য জায়গা করে দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তক্তপোশে আধ ময়লা ধুতি আর গেঞ্জি পরা একজন বসে। মুখে বসন্তের দাগ, চোখে পুরু লেন্সের চশমা। ক্যাশবাক্সের উপর একটা কাঁসার থালা, একটা ছুরি দিয়ে পেস্তা কুচোচ্ছে। সে ঘোষদাকে চিনতে পারল।
