পায়ে পায়ে সে ছোটো ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। আলো জ্বালল না। ‘ঘরে যাও’! সেটা কি এই ঘর! অন্ধকারে দাঁড়িয়ে নিজেকে ধসে পড়তে না দেওয়ার জন্য সে দেয়ালে একটা ঘুঁষি বসাল, তারপর চেয়ারে বসল, দুই হাতের মধ্যে মাথাটা ধরে ঝুঁকে পড়ল।
‘তুমি কি ওর বাড়িতে এখন গেছলে?’ দরজার কাছে থেকে মৃদু গলায় বিবি বলল। সে উত্তর দিল না। বিবি ঘরে ঢুকল।
‘আমাকে একটু একা থাকতে দাও।’
‘আগে কথাটার জবাব দাও।’
‘কী জবাব দেব! তুমি তো জেনে শুনেই প্রশ্নটা করেছ। …হ্যাঁ গেছলাম তাতে হয়েছেটা কী?’ সে রুক্ষভাবে চেয়ারে ঘুরে বসল।
‘কী বলল তোমার বউদি আমার সম্পর্কে?’ অন্ধকারের মাঝে বিবি দাঁড়িয়ে। স্বরে উত্তাপ নেই।
‘অনেক কথা বলল, অনেক অনেক…. হয়েছে!’
‘হয়নি। আমি জানতে চাই কী বলল?’ বিবির স্বরে এবার ক্ষীণভাবে অধৈর্যতা প্রকাশ পেল।
‘তুমি দুলালকে তাড়িয়েছ, কেন!’
‘শুধু এই কথা বলল? …বলেনি আমি তোমার টাকা, বিষয়—সম্পত্তি হাতিয়ে নিয়েছি?’
‘হাতিয়ে নিয়েছ বলেনি, সব লিখে দেওয়াটা ভুল হয়েছে বলেছে।’
‘এই বাড়িটা এখনও তোমার নামেই আছে। …কারখানা অবশ্য লিজ দিয়েছি, গোকুলানন্দর কিছু জমি বিক্রিও করেছি, কিন্তু বাকি জমি তোমারই আছে। সেখান থেকে চাষ করিয়ে যা পাই তাই দিয়ে সারা বছরের সংসার খরচ চালাতে হয়, ও টাকা সংসারের।’
‘ব্যাংকের টাকা? সার্টিফিকেটগুলো?’
‘কিছু আছে, তবে ওতে কাউকে হাত দিতে দেব না। জনা আর রণোর ভবিষ্যতের কথা আমাকেই ভাবতে হত।’
‘তাহলে একটা টাকার জন্যেও তো এখন তোমার কাছে হাত পাততে হবে।’
সে উত্তর পেল না।
‘বাড়ি আমার! কথাটার কোন মানে হয়? খিদে পেলে বাড়ির ইট চিবিয়ে খাব? বাড়ির জানালা দরজা কি আমার পরনের কাপড় দিতে পারবে?’
‘বিক্রি করে দাও।’
‘তার মানে!’ সে অবাক হয়ে তীক্ষ্ন চোখে বিবির মুখ দেখার চেষ্টা করল। ‘বিক্রি? বাপ—ঠাকুরদার বাড়ি বিক্রি করব? তুমি বাইরের থেকে এ বাড়িতে এসেছ তাই এমন কথা উচ্চচারণ করতে পারলে।’
‘তাহলে রোজগার করো।’
সে চুপ করে রইল। অতি সাধারণ গ্র্যাজুয়েট, বয়সও হয়ে গেছে, তার উপর জেলখাটা, কোথায় সে চাকরি পাবে? বিবি এতসব জেনেও রোজগারের কথাটা ইচ্ছে করেই বলল তাকে, তার দুর্দশাটা বুঝিয়ে দিতে। বড়ো মর্মান্তিকভাবে সে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।
দালানে ফোন বেজে উঠল। কেউ রিসিভার তুলল। ‘মা তোমার ফোন…অপূর্ব মামা।’ দরজার কাছে এসে গুলু জানিয়ে দিল।
সে কান পাতল, দালান থেকে বিবির গলা শোনা যাচ্ছে। ‘…তিনটে টিকিট? রণো বোধহয় যাবে না, ও ক্ল্যাসিকাল গান একদমই পছন্দ করে না…গায়ত্রী সময় করে উঠতে পারবে তো, চেম্বারে তো ভিড় লেগেই আছে…না না, যতই সারুক…এয়ার কন্ডিশনড হল—এ তোমায় এখন বসতে হবে না, ভীমসেন আরও বহুবার কলকাতায় আসবেন, তখন শুনে নিয়ো…আমি না থাকলেও অরুণা কি জনা তো থাকবে, ওরাই রেখে দেবে। তুমি বরং দুটোই পাঠিয়ো, মিছিমিছি কেন একটা টিকিট নষ্ট হবে। …বাড়ি ফেরার ট্যাক্সি পাওয়াটাই তখন মুশকিলে ফেলে, তুমি থাকলে লিফট পাওয়া যেত…তোমার বউয়ের গাড়িতে চাপা মানেই ‘পেট্রলের দাম কী ভীষণ বেড়েছে’ সেই গপ্পো সারা পথ শুনতে হবে, রক্ষে করো…বুধ কী শুক্রবার ব্রিটিশ কাউন্সিলে যাব, তার আগে তোমাকে জানিয়ে দেব। …হ্যাঁ, হ্যাঁ, আচ্ছা…।’ বিবির স্বর হঠাৎ অস্পষ্ট হয়ে হেসে উঠল। সে আর ওর কথা শুনতে পাচ্ছে না।
বিবির কথা বলা শেষ হয়ে গেছে কি? সে চেয়ার থেকে উঠে দরজার কাছে এল। বিবির বাঁ কানে রিসিভার, মুখটা সামান্য নামিয়ে চোখে হাসি। ডান হাতে ধরা কলমটা অন্যমনস্কের মতো টেবলে আলতো করে ঠুকছে। একটু আগেই স্বামীর সঙ্গে যেরকম কঠিনভাবে কথা বলেছিল, তার ছিটেফোঁটাও ওর বসার শিথিল ভঙ্গিতে নেই। বিবি যেন এখন অন্য জগতে। কথা বলতে বলতে বিবি একবার ছোটো ঘরের দরজার দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকাল। তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই ভ্রূ কুঁচকে চাপা গলায় দ্রুত কয়েকটা কথা বলে নিয়ে রিসিভারটা রেখে দিল।
‘কিছু বলবে?’
‘কার সঙ্গে কথা বলছিলে?’ সে এগিয়ে গেল বিবির যতটা সম্ভব কাছাকাছি। দুটো ঘরে দুই ছেলেমেয়ে রয়েছে। গুলু যতই পড়ুক, গোরা যত জোরেই টিভি চালাক, দালানে বাবা—মায়ের মধ্যে কথাবার্তায় ওরা উৎসুক কান পাতবেই।
‘তা জানার কি খুব দরকার আছে তোমার?’
‘হ্যাঁ আছে।….এই অপূর্ব লোকটা কে?’
বিবির মুখের উপর রাগ ভেসে উঠেই বিরক্তির চাপে ডুবে গেল। ‘আমার বন্ধু…ছোটোবেলার বন্ধু।’
খাতাগুলো গুছিয়ে নিতে লাগল বিবি। তার ভঙ্গিতে ফুটে উঠেছে, ‘যথেষ্ট উত্তর দিয়েছি’—র মতো ভাব।
‘কখনো তো শুনিনি এর কথা!’
‘কার, অপূর্বর? …না শুনে থাকলে এখন শুনে নাও।’
‘তুমি কিন্তু এখনও বিবাহিতা।’
‘কী বলতে চাও?’ বিবির চোখ কঠিন হয়ে উঠল, চোয়ালের পেশী চেপে বসল। ‘যা বলার স্পষ্ট করে বলো, ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলা আমি সহ্য করতে পারি না।’
‘তুমি আমাকেও সহ্য করতে পারছ না…বোধহয় প্রথম থেকেই পারনি…কারণটা কী অপূর্ব?’ সে অতি ধীরে ধীরে প্রায় অস্পষ্ট স্বরে কথাগুলো বলল। খুব মন দিয়ে শুনলে তাতে বেদনার আভাস পাওয়া যাবে।
‘তোমার এইসব কথার আমি কোনো জবাব দেব না…দিতে বাধ্যও নই। একটা কথা মনে রেখ, জীবনের সেরা সময়ে ষোলোটা বছর লজ্জা, ঘেন্না আর যন্ত্রণা সঙ্গে নিয়ে কাটাতে বাধ্য হয়েছি, আমাকে বাধ্য করেছ তুমি। তোমার কোনো নৈতিক অধিকার নেই…।’ বিবি চুপ করে গেল। তার মনে হল, কথাগুলো দীর্ঘ সময় ধরে তিল তিল করে বিবির মনের মধ্যে জমেছে, নয়তো এত দ্রুত মুখ থেকে বেরোতে পারত না।
