‘হ্যাঁ হ্যাঁ, জানব না কেন…অপূর্ব, আমার বিয়ের দিনই ওর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। খুব ভালো ছেলে, পড়াশুনোয় দারুণ, আমেরিকা থেকে ডক্টরেট করে এসেছে, ওর বউ তো ডাক্তার গাইনি।’ একটানা সে বলে গেল। উসকে ওঠার আগেই বউদিকে নিবিয়ে দেবার জন্য না বলে তার উপায় ছিল না।
‘আলাপ ছিল নাকি!’ বউদি চোখদুটো ছোটো করে তাকাল। ‘তুমি থাকতে ওকে এ বাড়িতে তো কখনো আসতে দেখিনি।’
‘দেখবে কী করে। তখন তো অপূর্ব আমেরিকায়।’
‘অ।’
‘আর কী খবরটবর…বলো।’ অন্য প্রসঙ্গে আসার জন্য সে বউদির কথার ধাঁচ বদলাতে চায়। বিবিকে দু—চক্ষে দেখতে পারে না। কিন্তু সেটা কখনো কখনো গোপনও করে না।
‘খবর আর কী…ভালো কথা, মিতাকে মনে আছে তোমার? শিবু বর্ধন লেনের সেই মেয়েটি, এখন বাপের বাড়িতেই রয়েছে। স্বামী ওকে নেয় না, আর একটা বিয়ে করেছে, খুব বাজে লোক…মিতা আলাদা থাকে মাকে নিয়ে।’
‘মিতা করে কী?’
‘চাকরি করে কোথায় যেন। সনৎ তো মাকে দেখে না, মা—ছেলের ঝগড়া তো লেগেই আছে।’
খালি প্লেটটা টেবলে রেখে সে জলের গ্লাস তুলে নিল। মিতাকে স্বামী নেয় না কেন? হালকা একটা দুঃখ তাকে ছুঁয়ে গেল। এই মিতা তার জন্যই মায়ের হাতে বেদম মার খেয়েছিল! ওকে একবার দেখতে ইচ্ছে করছে, তাকে কীভাবে মনে রেখেছে সেটা জানার বাসনা তাকে গ্রাস করেছে। পেঁয়াজের ক্ষীণ একটা গন্ধ তার মনে ভেসে এল। বিবেকানন্দ হবার স্বপ্ন দেখা সনৎ এখন মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে!
‘বউদি, এখন উঠি, দাদার আসতে তো দেরি হবে, পরে দেখা করব। আবার পুলি করলে খবর দিয়ো।’
‘ওরে বাবা, তোমার ঘরে খবর দিতে যাবে কে, তার থেকে তুমিই বরং খবর নিয়ে যেয়ো। আমার ঘরে মিষ্টি খেয়েছ এই খবর বিবির কানে গেলে দ্যাখো ও তোমায় কী বলে।’
‘কী বলবে?’ হঠাৎই এক ঝলক রক্ত তার মস্তিষ্কের কোষগুলোয় ঢুকে পড়ল। ‘আমার বাড়ির কর্তা আমি। যেখানে খুশি আমি যেতে পারি, পারি না কি?’
‘দুলাল মাঝে মাঝে আমার কাছে এসে গল্প করত। পুরোনো লোক, বয়সও হয়েছিল, তাই বলে সেজন্য বিবি ওকে তাড়িয়ে দেবে? অত বছরের পুরনো চাকর কলকাতা শহরে ক—টা লোকের বাড়িতে আছে?’
‘তোমার কি মনে হচ্ছে বিবি আমাকে তাড়িয়ে দেবে?’ বলে সে হাসল। তার সঙ্গে যোগ দিল শিবানীও। আর তখনই বুঝতে পারল, কথাটা বলে নিজের অসহায় অনিশ্চিত অবস্থানটাকে সে প্রকট করে দিল।
‘বিষয়—সম্পত্তি সব ওর নামে লিখে দিয়ে ঠাকুরপো তুমি যে কী ভুল করেছ! অবশ্য মামলার খরচ চালাবার জন্য তা না করে তোমার উপায়ও ছিল না। এখন তো একটা টাকার জন্যও বউয়ের কাছে তোমার হাত পাততে হবে।”
অদ্ভুত দৃষ্টিতে সে বউদির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। মুখে কোনো জটিলতা নেই। বউদি জানে এখন সে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে।
‘আমি আসি।’
দরজাটা ঠেলতেই খুলে গেল। খাওয়ার টেবলে কয়েকটা খাতা, বিবি কলম হাতে ঝুঁকে রয়েছে। তার মনে হল দরজা বন্ধের শব্দে বিবির পিঠ আড়ষ্ট হয়ে গেল। মুখ ঘুরিয়ে তাকাল না। বোধহয় তার জন্যই অপেক্ষা করছে, নয়তো ঘরে বসেই খাতা দেখতে পারত। শোবার ঘরে টেবল ল্যাম্প জ্বালিয়ে গুলু পড়ছে। গোরার ঘর থেকে টিভি চলার আওয়াজটা কানে এসে ধাক্কা দিল। বিবির পাশ দিয়ে সে গোরার ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। খাটের উপর গোরা পা ছড়িয়ে শুয়ে, দেয়ালে ঠেস দেওয়া দুটো বালিশে মাথা রেখে, সামনে টিভি সেট। হিন্দি সিনেমার গানের সঙ্গে একদল মেয়ে নাচছে। দরজায় তাকে দেখে গোরা চোখ সরিয়ে তার দিকে তাকাল।
‘সাউন্ডটা একটু কমাও। মা কাজ করছে, দিদি পড়ছে, ওদের ডিসটার্ব হচ্ছে।’
গোরা সেটের উপর চোখ ফিরিয়ে নিল। তার মধ্যে নড়াচড়ার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে সে বলল, ‘কী হল?’
‘কারুর ডিসটার্ব হচ্ছে না।’ গোরার চোখ সেট থেকে সরল না।
‘জানলে কী করে হচ্ছে না? এত জোরে চালালে পড়াশুনো করা যায় না।’
‘জোরে চলছে না। ওরা কেউ বলেনি ডিসটার্বড হচ্ছে।’ গোরা এবারও তার দিকে তাকাল না।
তার মাথার মধ্যে ঝনঝন করে উঠল। এতটা ঔদ্ধত্য গোরা দেখাবে সে আশা করেনি। তার ইচ্ছে করল সেটটা বন্ধ করে দিয়ে ওর গালে একটা চড় বসাতে। সে আড়চোখে বিবির দিকে তাকাল। বিবি মুখ তুলে তাকে দেখছে, চোখ বিব্রত।’
‘ওরা বলেনি তো কী হয়েছে, আমি বলছি। গম্ভীর এবং ঝাঁঝালো গলায় সে বলল। গোরা ভ্রূকুটি করে তার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে শান্ত গলায় বলল, ‘যাবার সময় দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে যাবেন। আমায় আর ডিসটার্ব করবেন না।’
সরাসরি এই প্রথম গোরা তাকে প্রত্যাখান করল। মাথা নীচু করে সে চোখদুটো বন্ধ করল।
‘তুমি ঘরে যাও।’ বিবি খাতার উপর আবার ঝুঁকে পড়ল।
সে বিবির পাশে এসে ওর কলমধরা হাতটা মুঠোয় চেপে ধরে মুখ নামিয়ে চাপা স্বরে বলল, ‘এসব কী হচ্ছে…বাড়িতে এসব কী হচ্ছে? …তুমি নিজের কানে শুনলে, দেখলে, তবু একটা কথাও ওকে বললে না! বাপকে অপমান করছে ছেলে, এ বাড়িতে এই প্রথম।’
বিবি হাত ছাড়াবার চেষ্টা করল না। চোখে চোখ রেখে ঠান্ডা গলায় বলল, ‘এ বাড়িতে আর কারুর কি আগে যাবজ্জীবন হয়েছিল?’
হাত ধরা মুঠোটা ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে এল। নিজের হাত থেকে বিবি মুঠোটা নামিয়ে দিল সন্তর্পণে। ‘ঘরে যাও।’
