এবারের হাসিটা তার মুখে ছড়িয়ে গেল। দেখা করতে যেতে হবে একদিন। পিছনে একটা শব্দ হল। চমকে ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখল ছাদের দরজায় গুলু দাঁড়িয়ে।
‘কী ব্যাপার?’
‘কিছু না, দেখতে এলাম।’
‘কী দেখতে, পালিয়ে গেছি কিনা?’
‘কাউকে বলে বেরোওনি তো, মা তাই বলল খুঁজে দেখতে।’
‘তুই এখন কী করছিস? গল্প করার ইচ্ছে হচ্ছে রে, আমার অনেক কিছু মনে পড়ছে।’
‘আমি পড়ছি এখন…যাই।’ খাপছাড়াভাবে গুলু চলে গেল।
গুলু ভালোই জানে মা পছন্দ করবে না বাবার সঙ্গে কথা বলা। বিবি চায় না সে ঘরের বা বাইরের লোকের সঙ্গে কথা বলে, বা বাড়ির বাইরে যায়। তাহলে সারা দিনরাত, হপ্তার, মাসের, বছরের পর বছর সে করবে কী, কীভাবে সময় কাটাবে? রাত্রে ছাদে এলেও তার খোঁজ করা হবে! এটা কি জেলখানা?
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে দেখল দাদার দরজা দিয়ে ওদের ঝি বেরোচ্ছে, দরজা বন্ধ করতে গিয়েও বউদি শিবানী পাল্লাটা আবার খুলল।
‘বউদি কেমন আছ?’ হঠাৎই কথাগুলো তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল। সামনাসামনি হয়ে এত বছরের চেনা মানুষের সঙ্গে কথা না বলা মানে নিজেকে আসামি করে রেখে দেওয়া।
‘ভালো আছি, তুমি কেমন আছে? ফিরেছ যে সেটা আমি পরের দিনই জেনেছি। দাড়ি দেখে ভাবলুম এই কাবুলিওয়ালাটা ছাদ থেকে নামছে কেন? বুকটা ছ্যাঁত করে উঠেছিল…ভেতরে এসো।’
শিবানীর সঙ্গে সে বসার ঘরে এল। ঘরটাকে নতুন করে তার মনে পড়ল। দাদার অংশে শেষ এসেছিল সে বাবার শ্রাদ্ধের সময়। এই উপলক্ষে দুটো অংশ একাকার হয়ে গেছিল আত্মীয়স্বজনের ভিড়ে। এই ঘরে বসেই সে দাদার সঙ্গে শ্রাদ্ধের জন্য খরচ—খরচার খসড়া করেছিল। কুড়ি বছর হল কি? …বোধহয় উনিশ। সোফাটা একই জায়গায়, শুধু ঢাকনার কাপড়টার রঙ বদলেছে। দেয়ালে বাবা—মার ছবি একই জায়গায়। ছবিতে শুকনো মালা ঝুলছে, সাদা চন্দনের ফোঁটা। বিবির ঘরের দুটো ছবিতে এসব নেই।
‘দাদা কোথায়, দোকানে? ভালো আছে?’
‘তেমন আর ভালো আছে কোথায়! ওনার ব্লাডপ্রেশার তো ছিলই, এখন আবার ঘাড়ের কাছে একটা ব্যথা শুরু হয়েছে। ডাক্তার বলছে স্পন্ডালিসিস না কি যেন হয়েছে। …তুমি চা খাবে?’
‘না।’
‘ছাদে গেছিলে?’
‘হ্যাঁ।’
‘বাইরে বেরোওনি?’
সে সজাগ হয়ে উঠল। প্রশ্নটার উত্তর বউদিকে আরও অস্বস্তিকর প্রশ্নের সুযোগ এনে দিতে পারে।
‘বেরিয়েছিলাম। এদিক—ওদিক হাঁটলাম। সবই তো দেখছি একইরকম রয়েছে, তোমাদের এই ঘরটার মতো।’
‘একই রকম। কী বলছ ঠাকুরপো? এই আমাকেই দ্যাখো না, আরও মুটিয়ে যাইনি? তোমার দাদা অ্যাম্বাসাডার বিক্রি করে মারুতি কিনেছে, এটাও বদল। অপু—নুপুর বিয়ে হয়ে গেছে, ওরা না থাকায় আমার আর তো হাতে কিছু কাজই নেই…এসব কি বদল নয়? …একটু বোসো, আজ ক্ষীরের পুলি বানিয়েছি।’ শিবানী উঠে দাঁড়াল, ‘দুটো চেখে যাও।’
সে চুপ থেকে সম্মতি জানাল। শিবানীর ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে তার মনে হল সত্যিই বদল ঘটেছে, নইলে তাকে ডেকে ঘরে বসিয়ে বউদি ক্ষীরের পুলি খাওয়াচ্ছে, স্বপ্নেও কি ভাবা যেত! আর একটা ব্যাপারও লক্ষ করার মতো, তার গত ষোলো বছর নিয়ে কোনো কৌতূহল দেখায়নি। এটাই তাকে সহজ করে দিচ্ছে।
চারটে পুলি আর একটা চামচ আকাশি নীল লতাপাতার ছাপ তোলা বোন—চায়নার প্লেটে, অন্য হাতে কাচের গ্লাসে জল নিয়ে শিবানী ফিরে এল। এইরকম প্লেট কুড়ি বাইশ বছর আগে তাদের বাড়িতে সে দেখেছে। বাবা কিনে দিয়েছিল বড়ো বউকে। আজও রয়ে গেছে। বউদি খুব যত্নে রাখে জিনিসপত্র। পুলিগুলোর আকার সরু ঢ্যাঁড়শের মতো। সে চামচ দিয়ে কেটে একটুকরো মুখে দিয়ে চোখ বুঁজল।
‘কেমন হয়েছে?’
চোখ খুলে দেখল বউদির উদবিগ্ন দৃষ্টি। ‘কাজ খুঁজছ? একটা মিষ্টির দোকান করো। কলকাতার কোন দোকান এত ভালো করতে পারবে না।’
‘মেয়েরাও বলে, মা—র হাতের মিষ্টি খেলে দোকানের মিষ্টি আর খেতে ইচ্ছে করে না।’
‘দোকান যদি না করো তো বই লেখো, মিষ্টান্ন রন্ধন প্রণালী।’
‘ওরে বাবা, বইফই লিখব কী, মেয়েকে চিঠি লিখতেই কলম ভেঙে যায়।’ শিবানী খিলখিল করে হেসে উঠল। বহু বছর পর সে হাসির শব্দ শুনল। অবাক হয়ে সে বউদির মুখের দিকে তাকাল।
‘বই লিখতে পারবে তোমার বউ, তবে রান্নার বই পারবে না।’
‘বিবি তো ভালোই রাঁধে।’
‘কোনোদিন তো রান্নাঘরে ঢুকতে দেখলুম না। খালি তো হটর হটর করে বাইরে বেরোনো।’
‘একা মেয়েমানুষ, দুটো বাচ্চচা, না বেরোলে চলবে কেন?’
‘একবারও বিবি আমাদের কাছে এসে দাঁড়ায়নি। তোমার দাদা দুঃখু বলে বলেছিলেন, বউমা যদি একবার এসে বলত তাহলে যত টাকা লাগে আমি খরচ করতুম, বাড়ির বউকে ছোটাছুটি করতে হত না। হাজার হোক রঘু আমার মায়ের পেটের ভাই।’
‘ওর কথা ছেড়ে দাও বউদি। জানই তো আমাদের বাড়ির অনেক ব্যাপার বিবি ঠিক বোঝে না। ও অন্য কালচারে মানুষ হয়েছে।’
‘তা হবে। তবে ওর বাপের বাড়ির লোকেরা দুঃসময়ে কিন্তু খুব করেছে। মামলা তো ওরাই চালাল, টাকা অবশ্যই তোমারই, তা হোক গতর খাটানোর ব্যাপার তো আছে! তারপর বিবিকে আবার পড়াশুনো করানো।’
তার মুখে হয়তো খানিকটা বিস্ময়, খানিকটা জিজ্ঞাসা ভেসে উঠে থাকবে। বউদির চোখে সেটা ধরা পড়ল। ‘বাপের বাড়ির পাড়ার কে বন্ধু, সেই তো রোজ এসে পড়াত। কেন, তুমি জান না?’
