‘আমার কাছে।’
‘আপনি ওকে ভালোবাসেন?’
‘নিশ্চয়।’
‘তা হলে বিয়ে দিলেন কেন? আমারও তো একটা জীবন আছে।’
‘সেই জন্যই ওকে ফিরে যেতে বলি। ঠিক এই কথাটাই ওকে বলেছি। ও শুনল না।’
‘পরিচিতদের কাছে এবার মুখ দেখাব কী করে!’
‘বলে দিন বাস চাপা পড়ে মারা গেছে, কিংবা কলেরায়।’
‘তা হয় না, পরে ওকে কেউ দেখে ফেললে আরও জানাজানি হবে।…অবশ্য আমার এতে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই…বউ যদি দুশ্চরিত্রা হয়, স্বামী কী করতে পারে?’
‘আপনাকে কেউ দোষ দেবে না?’
‘না, সবাই জানে আমি ভালো ছেলে।’
কথাটা বলেই অনন্তের বুকের মধ্যে একটা যন্ত্রণা শুরু হল। ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে এল তার মুখ। ফ্যালফ্যাল করে সে দিলীপ ভড়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে অস্ফুটে বলল, ‘কিন্তু সত্যিই কি আমি তাই!’
এগারো
প্রায় তিন ঘণ্টা হয়ে গেল অনন্ত এলোমেলো হাঁটছে। রাস্তায় ট্র্যাফিক কমে গেছে। একটা ট্রামের সামনে লাল বোর্ডে ‘লাস্ট কার’ লেখাটা চোখে পড়েছে। পথচারীরা প্রায় নেই। দু—একটা আধ ভেজানো দোকান, ভিতরে আলো জ্বলছে। বগলে চট নিয়ে দু—তিনজন শোবার জায়গা খুঁজছে ফুটপাথে। অনন্ত আলোজ্বলা গির্জার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে তারপর নিজের হাতঘড়ি দেখল। বন্ধ হয়ে আছে।
‘ইসস একদম ভুলে গেছি।’
ঘড়িতে দম দিতে দিতে সে আরও জোরে হাঁটা শুরু করল। হাঁটুর কাছে টান ধরেছে। কষ্ট হচ্ছে হাঁটতে। মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে গিয়ে হাঁটুর পিছনে শিরাটার হাত বুলোল, কিন্তু সে গতি কমাল না। জলতেষ্টা পাচ্ছে অসম্ভব। থুতু ফেলতে গিয়ে শুকনো জিবটা টাগরায় আটকে গেল।
দরজায় আস্তে টোকা দিল। জায়গাটায় আলো নেই, তখনও চোলাইয়ের গন্ধ ভাসছে। আবার সে টোকা দিল।
‘কে?’
‘আমি।’
দরজা খুলে একটা ছায়া দুই পাল্লার ফাঁকে ভেসে উঠল। তখন সে কাতর অনুনয়ে বলল, ‘আমি শক্তিপদর ছেলে, আমার এবার ভালোবাসা দরকার…দেবে?’
ছায়াসরণীতে রোহিণী
এক
লালবাজার মোড় থেকে প্রায় পঞ্চাশ মিটার পুবে বউবাজার স্ট্রিটে ট্রামের তার ছিঁড়ে পাঁচ—ছটা ট্রাম দাঁড়িয়ে পড়েছে। তাদের দু—পাশ দিয়ে বাস, মিনিবাস এবং অন্যান্য গাড়ি ফুড়ুত করে বেরিয়ে যেতে গিয়ে সামনে থেকে আসা ট্র্যাফিকের মুখোমুখি হয়ে রাস্তাটা এখন অচল করে ফেলায় গাড়ির পিছনে গাড়ি জমতে জমতে লালবাজার মোড় পর্যন্ত জ্যামের জের পৌঁছে গেছে। জনা চারেক ট্র্যাফিক কনস্টেবল ও একজন সার্জেন্ট ছুটে এসে কলকাতার এই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাটাকে চালু করার জন্য হিমসিম খাচ্ছে। কে জানে, পুলিশের কোন বড়োকর্তা বা কোন মন্ত্রী জ্যামে আটকে পড়ল কিনা!
অপেক্ষা থেকে নিস্তার পাবার জন্য কিছু গাড়ি পাশের গলিগুলোয় ঢুকে পড়ছে। তাড়া আছে এমন মানুষেরা গাড়ি থেকে নেমে হাঁটতে শুরু করেছে। পরনে হালকা নীলের উপর সাদা নকশা সুতির শাড়ি, গায়ে ফিকে গোলাপি কার্ডিগান এবং কাঁধে মোটা কাপড়ের একটি রঙিন ঝুলি নিয়ে এক রমণী ট্যাক্সির ভাড়া চুকিয়ে নামল। ফুটপাথ ধরে সে দ্রুতপায়ে বিবাদী বাগের দিকে এগোবার চেষ্টা করল ভিড়ের মধ্য দিয়ে।
যদিও জানুয়ারির শেষ, কিন্তু কলকাতায় এবার শীত তেমনভাবে আসেনি। এখন দুপুর আড়াইটে, রোদ ঝলমল করছে, কিন্তু মনে হচ্ছে যেন এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ। বিকেলে ফুরফুরে হাওয়া বইলে ভালোই লাগে। বোধহয় বসন্ত এবার দু—দিন সপ্তাহ এগিয়ে আসবে। অবশ্য লালদিঘিতে যে ক—টা গাছ রয়েছে তাদের ভাবগতিক দেখে কিছুই বোঝার উপায় নেই। ক্যালেন্ডারি মতে বসন্ত না এলে তারা যেন শীতবস্ত্র পা থেকে নামাবেই না। কিন্তু এই দুপুরে কর্মব্যস্ত অফিস পাড়ায় শীত—বসন্ত নিয়ে কেউই মাথা ঘামাচ্ছে না। ট্র্যাফিক অচল হওয়ায় সবাই বিরক্ত। এরই মধ্যে হালকা নীল ছাপা শাড়ির রমণী যেন একটুকরো বসন্ত। তার দিকে যারই চোখ পড়ছে, দ্বিতীয়বার তাকাতে হচ্ছে।
রমণীর দ্রুত গমন—চেষ্টা পদে পদেই ব্যাহত হচ্ছে। কলকাতার যেকোনো ফুটপাথের মতো এটিও টেলিফোন, ইলেকট্রিক, কর্পোরেশন, সিএমডিএ প্রভৃতি জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের দ্বারা ধর্ষিত। গর্ত, ঢিপি, ইট, কাদা প্রভৃতির জন্য পদক্ষেপে সতর্ক থাকায় বাধ্য হয়েই চলার বেগ মন্থর করতে হয়েছে। ফলে তার গমন ভঙ্গিতে কবুতরীর আদল এসেছে। তার উপর রমণীর দেহ পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি উচ্চচ, যেটা বাঙালি মেয়েদের গড়পড়তা উচ্চচতার থেকে বেশি। ঈশ্বরের এবং সেই সঙ্গে নিজের চেষ্টায় দেহ—কাঠামোটি যেভাবে ভরাট হয়ে রয়েছে, তাতে মনে হয় দুর্বলচিত্তের পুরুষদের সঙ্গে নির্মম রসিকতা করার জন্যই যেন এই দেহটি নির্মিত। বস্তুত এই ট্র্যাফিকের জট—সমস্যা সমাধানে যে সময় লাগবে, তার থেকেও দশ বা পনেরো সেকেন্ড সময় বেশিই লাগবে এবং সেজন্য কর্তব্যে ব্যস্ত সার্জেন্টটিকে দোষারোপ না করে এই রমণীর রচনাকারকেই দায়ী করা উচিত। সার্জেন্টের অনুসরণে মিনিবাসের ড্রাইভার অ্যাক্সিলেটরে পায়ের চাপে আন্দাজের গোলমাল ঘটিয়ে সামনের স্টেটবাসের পিছনে যে ঢুঁ মারল, বলাবাহুল্য সেজন্য একজনই দায়ী।
রমণীর কিন্তু ভ্রূক্ষেপ নেই। যেন সে জানেই, তার উপস্থিতি পুরুষ—চিত্তের কাজকর্মে কী ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে। মুখে হালকা প্রসাধন, কিন্তু সদ্য অসুস্থতা কাটিয়ে ওঠা রোগীর মতোই যেন তার দুগ্ধহীন কফি রঙের মুখের ত্বক দুর্ভাবনায় শুকনো। ভালো করে লক্ষ করলে দুটি চোখের ঘন কালো মণিতে ত্রাসের ছায়া দেখা যাবে। দূর থেকে যা বিনিদ্র রাতের ক্লান্তি বলে মনে হচ্ছে।
