র্যাকে যথাস্থানে ব্যাগটা রেখে, আলো নিবিয়ে সে শুয়ে পড়ল। এবার যন্ত্রণা আসবে তার মাথার মধ্যে, বুকের মধ্যেও।
পাঁচ
ছাদের উত্তর—পূর্ব কোণ থেকে সনৎদের দোতলার দুটো ঘর দেখা যায়। একটার দুটো জানালাই খোলা কিন্তু ঘর অন্ধকার, অন্যটার দুটো জানলায় পরদা ঝোলানো, ঘরে আলো জ্বলছে। পরদার উপরের দিকে ইঞ্চি দুয়েক ফাঁক, সেখান দিয়ে ঘরের একটা চিলতে অংশ সে দেখতে পাচ্ছে। একটা স্টিলের আলমারির অর্ধেক, তার পাশে একটা খাটের পায়ের দিক। লুঙ্গিপরা কেউ একজন শুয়ে রয়েছে। পা দুটো নাড়াচ্ছে। খাটে পা ঝুলিয়ে বসে রোগা এক স্ত্রীলোক, বাঁদিকে তাকিয়ে। একে সে কখনো দেখেনি। এই ঘরটা যদি সনতের হয়, পা দুটোর মালিক যদি সনৎ হয়, ওর যদি বিয়ে হয়ে থাকে, তাহলে এই স্ত্রীলোকটি নিশ্চয়ই ওর বউ। ওরা দুজন টিভি সেটের দিকে তাকিয়ে।
সনৎ ক্লাস নাইনে পড়ার সময় একদিন তাকে স্কুলের টিফিনের সময় বলেছিল, ‘বিবেকানন্দের মতো সন্ন্যাসী হব।’ ‘কেন হবি?’ ‘স্বামীজির মতো সারা ভারত ঘুরব, বক্তৃতা দোব, লিখব, দেশের অন্ধকার দূর করব, অস্পৃশ্যতা ঘোচাব।’ ‘তুই একা একা পারবি?’ ‘কেন পারব না!’ ‘স্বামীজি ধর্মের বই, ফিলজফির বই পড়েছিলেন, সংস্কৃত জানতেন।’ ‘সংস্কৃত না জানলেও চলবে, বেদ গীতা বাংলাতেও পাওয়া যায়।’ ‘স্বামীজি বিয়ে করেননি।’ ‘আমিও করব না।’ সনৎকে তারা বলত খ্যাপাটে।
দুলাল বাড়ি থেকে তাদের দুই ভাইয়ের জন্য টিফিন নিয়ে যেত। স্কুলের উঠোনের একধারে দাঁড়িয়ে তারা খেত। ডিমসেদ্ধ, কলা বা অন্য কোনো ফল, মাখন লাগানো পাঁউরুটি, দুটো সন্দেশ, এক গ্লাস দুধ। কোনো কোনো দিন ডিমের বদলে থাকত ঘুগনি বা আলুমরিচ। একদিন তার চোখে পড়ে দূর থেকে সনৎ তাদের খাওয়া লক্ষ করছে। ওকে কখনো টিফিনের সময় কিছু খেতে সে দেখেনি। তার মনে হল সনৎ ক্ষুধার্ত। সে টিফিন কেরিয়ারের বাটি হাতে ওর দিকে এগিয়ে যায়। ‘আমার খেতে ইচ্ছে করছে না, একদম খিদে নেই, তুই ডিম আর রুটি দুটো তুলে নে।’ সনৎ তুলে নিয়েছিল। ফিরে আসতেই দাদা বলেছিল, ‘দেবার কি দরকার ছিল, এবার থেকে রোজ দাঁড়িয়ে থাকবে। তুই দিবি?’ দাদা ভুল বলেনি,সনৎ টিফিনের সময় তার সামনে ঘোরাঘুরি করত। রোজ না হলেও প্রায়দিনই সে বাটি হাতে এগিয়ে গেছে। মিতার দাদা সনৎ, এটাই ছিল খাদ্য সরবরাহের প্রধান প্রেরণা। তা ছাড়া গোগ্রাসে খাওয়াটা দেখতেও তার ভালো লাগত।
সনৎকে সে একবার কুড়িটা টাকা ধার দিয়েছিল পোস্টাল অর্ডার কেনার জন্য। কোথায় যেন চাকরির দরখাস্তের সঙ্গে পাঠাবে। টাকাটা শোধ করেনি, সেও ফেরত চায়নি, সনৎ জানত মিতার সঙ্গে তার একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। জেনেও না জানার ভান করে থাকত। কিন্তু মিতার মা ছিল অন্য ধরনের, অতি বাস্তববাদী, ঠোঁটকাটা। একদিন, যখন সে ক্লাস টুয়েলভে, মিতার মা তাকে ধরল সিঁড়িতে। লাফিয়ে লাফিয়ে সে উঠছিল দোতলায়। তখন একতলার রান্নাঘরের দরজা থেকে গম্ভীর চাপা গলায় ডাক শুনল, ‘রঘু শোনো।’ শুনেই তার বুক ধড়াস করে উঠেছিল। ‘আর তুমি এ বাড়িতে এসো না।’ সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকেছিল। ‘মিতার সঙ্গে মেলামেশা আজ থেকে তোমাকে বন্ধ করতে হবে, নইলে তোমার কোনো ক্ষতি না হলেও ওর হবে। একদিন ওর বিয়ে হবে তো।’ তখন সে বলে ফেলেছিল, ‘আমি যদি বিয়ে করি।’ ‘না। তুমি বাচ্চচাছেলে, কী বলছ তুমি জান না। তোমাদের বাড়ি কেমন, তা আমি জানি। তোমরা ধনী, তোমাদের বড়োলোক আত্মীয়স্বজন, জাতেও আলাদা, আমাদের সঙ্গে কোনো তুলনাই হয় না। মিতাকে আজ থেকেই ভুলে যাও। এখন তোমাদের কম বয়স, ভুলে যেতে অসুবিধে হবে না।’
সত্যি কথাই বলেছিল মিতার মা। ভুলে যেতে তাদের অসুবিধা হয়নি। স্কুল যাবার পথে চিঠির আদান—প্রদান শুরু হয়। দুজনে ছাদ থেকে কখনো বা বারান্দা থেকে ইশারায় কথা বলত। সেটা ওর মা—র চোখে পড়ে। তারপরই মারধোর করে ওকে এলাহবাদ পাঠিয়ে দেওয়া হয়। মিতা ফিরেছিল গ্র্যাজুয়েট হয়ে। সে ওর ফেরাটা একদমই লক্ষ করেনি। একদিন ওদের ছাদে বাঁশ—ত্রিপল বাঁধতে দেখে সে দুলালকে কারণ জিজ্ঞাসা করে শুনেছিল, ‘ও বাড়ির মিতার বিয়ে। নেমন্তন্ন করে গেছে কত্তামশাইকে, যাবে তো?’ সে উত্তর দেয়নি। শুধু একঝলক মনে পড়েছিল মিতার মুখের পেঁয়াজের গন্ধটা। বিয়েতে বাবাকেই যেতে হয়েছিল কেননা নতুন বউকে নিয়ে সেই সন্ধ্যায় সে নান্দীকারের ‘তিন পয়সার পালা’ দেখতে যায়।
লুঙ্গিপরা লোকটা উঠে বসল। স্ত্রীলোকটি খাট থেকে উঠে গেল বোধ হয় ঘরের বাইরে। লোকটার খালি গা, মাথার চাঁদিতে চুল ফাঁকা, মুখ ফিরিয়ে জানালার দিকে তাকাল। এ কি, এই লোকটাই তো সন্তু, সনৎ! কাঁধটা সরু, বুকটা চাপা, পেটে বড়ো একটা ভুঁড়ি, মাথায় টাক পড়েছে, তার হাসি পেল। এ কি চেহারা করেছে! সে কলেজে ঢোকার পর থেকেই বা মিতার এলাহাবাদ চলে যাবার পর থেকেই সনতের সঙ্গে দেখা—সাক্ষাৎ কমতে শুরু করে। কদাচিৎ পথে দেখা হলে দুজনেই ফিকে হেসে মাথা হেলিয়েছে। বলেছিল, স্বামী বিবেকানন্দ হবে, দেশের অন্ধকার দূর করবে, বিয়ে করবে না। কথাগুলো মনে করিয়ে দেবার জন্য একবার ওর সঙ্গে দেখা করলে কেমন হয়। নিশ্চয় আঁতকে উঠবে তাকে দেখেই। রেপ কেসে জেলখাটা খুনির থেকেও, এরা বেশি বিপজ্জনক। কিন্তু সনতের বাড়িতে গিয়ে সে রেপ করবেটা কাকে? ওর রুগণ, পাটকাঠির মতো হাতওয়ালা বউকে?
