তার জমির এক শতক পরিমাণও বেদখল হয়নি। কেন যে হয়নি সেটা জানার চেষ্টা সে করেনি। যদি ও বলে ‘রোঘো তোর জন্যই করাপ্ট হলাম।’ তাহলে কোনোদিন সে আর আয়নার সামনে দাঁড়াতে পারবে না। তবে সে লক্ষ করেছে শ্রীগোপাল কেমন যেন বদলে গেছে। তাকে হেয় করে অপমান করে কথা বলার প্রবণতাটার সঙ্গে বেড়েছে মদ খাওয়াও। একবার শ্রীগোপাল বলেছিল, ‘টাকা রোজগারের অনেক রাস্তা আছে রে রোঘো, ফিকিরটা শুধু জানতে হয়।’ ‘কীরকম ফিকির?’ ‘পলিটিক্স’, শ্রীগোপাল তেরছা চোখে তাকিয়ে বলেছিল ‘ভাবছি এবার ওটাই করব। …টাকা না থাকলে জীবনে কিছুই থাকে না, সুখ শান্তি, মানমর্যাদা, দাপট কিছুই জোটে না। বাপ—ঠাকুরদা পলিটিক্স বলতে যা বুঝত, ইংরেজ তাড়ানো, সে জিনিস নয়। এখন গরিবি তাড়ানোর পলিটিক্সে ঢুকতে হবে।’ আর একবার বলেছিল, ‘সততার কোনো দাম নেই রে রোঘো।’ ‘হঠাৎ এ কথা?’ ‘এমনিই বললুম। দুখিরাম গায়েনের পুকুরে কে ফলিডল ঢেলে মাছ মেরে দিয়েছে। ওর ধারণা আমিই এটা করেছি। …ওর দেড় বিঘের পুকুর জমা নিতে চেয়েছিলুম, দেয়নি, তাই রাগ মেটাতে আমি নাকি ওর মাছ মেরেছি। এখন বলছে পুকুরটা দেবে, ব্যাটা ভয় পেয়ে গেছে।’ শ্রীগোপালের বলার ধরন আর মুখ দেখে তখন তার মনে হয় কাজটা সম্ভবত ওরই করা, কিন্তু এ নিয়ে সে প্রশ্ন তোলেনি। কী জানি, কথায় কথায় যদি বলে বসে, ‘বেশ করেছি ফলিডল ঢেলেছি।’ তাহলে ওর অধঃপতনের জন্য নিজেকে ছাড়া আর কাকে সে দায়ী করবে?
.
ব্যাগটার মধ্যে আরও কয়েকটা কাগজের কাটিং রয়েছে। আর একটা তুলতে গিয়ে সে হাত টেনে নিল। সাপের গর্তে হাত ঢোকাতে যাচ্ছিল! বুকের ভিতরটা অবশ হয়ে যাচ্ছে, দ্রুত হয়েছে হৃদস্পন্দন। বিবি এগুলো কেটে রেখে দিয়েছে তাকে পড়াবার জন্য? ব্যাগটা এই ঘরে রেখেছি কি সেই উদ্দেশ্যেই, যাতে কৌতূহলবশে তুলে নিয়ে সে খোলে। তাকে আবার মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য?
তখন প্রত্যেকটা খবরের কাগজেই নিশ্চয় এইরকম রিপোর্টই বেরিয়েছে। তার চেনাশোনা, আধচেনা, একদমই অচেনা লক্ষ লক্ষ লোক পড়েছে। ‘পারুলবালা স্বামীকে রক্ষার জন্য ছুটে এলে রাঘবেন্দ্র তাকে ঘরের মধ্যে টেনে এনে ধর্ষণ করে।’ কী মারাত্মক একটা বাক্য। লক্ষ লক্ষ চোখের সামনে তাকে কুৎসিত নোংরা মানুষ করে দিয়েছে। ভাগ্যিস বাবা—মা তখন বেঁচে ছিল না।
কিন্তু এখন কি সবাই ঘটনাটা ভুলে গেছে? স্মৃতি নাকি ধূসর হয়ে যায়! ষোলো বছরে কি ধূসর হতে পারে? কালের প্রলেপে নাকি স্মৃতি ঢাকা পড়ে, মুছে যায়? কতটা সময়কে ‘কাল’ ধরা হয়? ষোলো বছর কী একটা ‘কাল’ হতে পারে? হয়তো তাকে সবাই ভুলে গেছে। কিন্তু ঘটনাটাকে তারা মনে রাখবেই। এখনও কাগজে এইরকম খবর বেরোয়, সেগুলো চোখে পড়লেই হয়তো তারা বলেছে, ‘দত্তদের রঘুও এইরকম ব্যাপার করে জেলে রয়েছে। যাবজ্জীবন …ফাঁসিও হতে পারত, তাই হওয়া উচিত এইসব বজ্জাতদের।’
ব্যাপারটা কীভাবে যে ঘুরে গেল! গোকুলানন্দ থানার দারোগা বিজয় ঘোষ তাকে সেই রাতেই থানায় বসে বলেছিল, ‘পঞ্চাশ হাজার টাকার কমে বাঁচাতে পারব না। সাক্ষী প্রমাণ সব ম্যানেজ হয়ে যাবে, ‘বেকসুর খালাস করিয়ে দোব।’ আরে মশাই বড়োলোক আপনি, এই ক—টা টাকা তো হাতের ময়লা। উঁচুঘরের লোক, মানসম্মানের কথা ভাববেন তো?’
সদর থানায় হাজতে বিবি তার সঙ্গে দেখা করে। চিন্তায় আর অনিদ্রায় বসে যাওয়া চোখ দুটো তার দিকে পৃথিবীর যাবতীয় ধিক্কার আর ঘৃণা নিয়ে তাকিয়ে থেকেছিল। সে কোনো কথা বলতে পারেনি। তার মনে হয়েছিল, মানমর্যাদা তার নয়, বিবিরই, ধুলোয় গড়াগড়ি দিচ্ছে। চাপা হিসহিসে স্বরে বিবি বলেছিল, ‘কোনো অজুহাত আমাকে দিয়ো না। কোনো কথা শোনার ইচ্ছে আমার নেই…তবে মামলা চালিয়ে যাব, তোমার যা বলার উকিলকেই বলো, আমাকে বলে কোনো লাভ নেই।’
বিবিকে সে বলতে পারেনি, দারোগাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে আমায় বাঁচাও। বললে বিবি হয়তো টাকা দেবার ব্যবস্থা করত। তার স্বামী নির্দোষ, ষড়যন্ত্র করে একটা বউ রাঘবেন্দ্রনারায়ণকে ফাঁসাবার জন্য মিথ্যা রেপ চার্জ এনেছিল, এটা সবাইকে জানানোর সুযোগ বিবি ছাড়ত না। ওর সব যন্ত্রণার উৎস ছিল এই একটি শব্দে—রেপ। কিন্তু খুনের অভিযোগটা? বিজয় ঘোষ বলেছিল, ‘বেকসুর খালাস করিয়ে দোব।’
এখন শুধু লজ্জা। গুলু, গোরা এদের সামনে রোজ তাকে মুখ দেখাতে হবে। মেয়েটা কথা বলবে মায়ের আড়ালে। মুখভাব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করবে। কিন্তু সে জানে, গুলুর মনের গভীরে কখনোই স্থির স্বচ্ছ উজ্জ্বল হয়ে তার বাবার ছবি থাকবে না। গোরা তাকে উপেক্ষা করে যাবে। বিবিও। কে এই অপূর্বমামা? গুলু বলল মা—র ছোটোবেলার বন্ধু, একই পাড়ায় বাড়ি, একই সঙ্গে পড়েছে। নিশ্চয়ই একসঙ্গে ওর ট্রেনে রোজ কলকাতায় যেত। একটি তরুণ একটি তরুণী…ওদের মধ্যে কি কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি? …বিবি ডিভোর্সি বলে নিজেকে চালাচ্ছে, কেন? এই অপূর্ব বিবিকে লেখাপড়া শুরু করিয়েছে অথচ বাবার অনুরোধ ও রাখেনি।
তার মাথার মধ্যে দপদপ করে উঠল। গত তিন—চার বছর হল তার মাথায় মাঝে মাঝে একটা যন্ত্রণা হয়। কপালের দু—ধারে হাতুড়ির মতো ঘা পড়ে। তখন সে ধাক্কাগুলোকে সহনীয় করার জন্য মাথায় ঘের দিয়ে শক্ত করে কাপড় কি দড়ি বেঁধে রাখে। সে বুঝতে পারছে মাথায় এবার যন্ত্রণাটা আসছে। সে একটা কাপড়ের টুকরো খুঁজল, ঘরের কোথাও দেখতে না পেয়ে গায়ের গেঞ্জিটা খুলে কপালে জড়িয়ে একটা গিঁট দিল। গোরার গেঞ্জি! ও যদি জানতে পারে তাহলে কী বলবে, ‘আমাদের সবার মাথায় একটা করে গেঞ্জি বেঁধে দাও।’
