তার বিষয়—আশয় দেখার ভার ছিল নন্দলাল বিশ্বাসের ওপর। এই ব্যাপারে তার দুই ছেলের থেকেও সে বেশি ভরসা করত তার পুরোনো বিশ্বস্ত লোকটিকে। বেঁচে থাকতেই অমিয় তার বিষয়সম্পত্তি গোপেন্দ্র ও রাঘবেন্দ্রকে ভাগ করে দিয়ে যায়। ওষুধের ডিলারশিপ, বসতবাড়ির সামনের অংশ, ভবানীপুর ও দর্জিপাড়ার বাড়ি পায় বড়োছেলে। বসতবাড়ির পিছনের অংশ ও বাগানের জমি আর গোকুলানন্দর জমিজমা পায় ছোটোছেলে। একমাত্র মেয়ে সরযূর বিয়েতে অমিয় দেড় লাখ টাকা খরচ করেছে, যৌতুকের মধ্যে ছিল গ্রে স্ট্রিটের বাড়িটা আর ডাক্তার জামাইয়ের চেম্বার সাজিয়ে দেওয়া। অমিয় উইল করে যায়, ক্যাশ সার্টিফিকেটে আর নগদে প্রায় চার লক্ষ টাকা তার দুই ছেলের মধ্যে ভাগ হবে আর স্ত্রী রাধারানীকে দেয় পঞ্চাশ হাজার টাকা। স্ত্রীর মৃত্যুর পর পঞ্চাশ হাজার থেকে যে টাকা রয়ে যাবে, তা সমানভাবে পাবে দুই পুত্রবধূ। এই টাকা রাধারানীর খরচের দরকার হয়নি, ফলে সুদে—আসলে যা দাঁড়িয়েছিল, তার অর্ধেক প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা বিবি পায়।
অমিয় তার ছোটোছেলেকে বলেছিল, ‘রঘু, তোকে গ্রামের জমিজমা দিলাম বলে মনে দুঃখ পাসনি তো? পুরনো ভাড়াটের বাড়ি থেকে কোনো লাভ হয় না। ডিলারশিপের কারবারটা গোপুই গড়ে তুলেছে, ন্যায্যত এটা ওরই পাওয়া উচিত।…. তোর স্বাস্থ্য আছে, খাটবার ক্ষমতা আছে, তুই কেন বসা কাজ করবি? চাষবাস ভালোভাবে করতে পারলে তাতে অনেক পয়সা, মাটি হল সোনা! কেমিক্যালস দিয়ে, ট্রাক্টর দিয়ে, সয়েল টেস্ট করে, উন্নত বীজ দিয়ে যেভাবে ইউরোপ আমেরিকায় হয়, সেইভাবে এগ্রিকালচারাল ফার্ম কর, এর ভবিষ্যৎ আছে। ফিশারিজ কর, পোলট্রি কর, ডেয়ারি কর… যদি তোর উদ্যোগ থাকে, বড়ো হবার স্বপ্ন থাকে…আমি তোকে জমি আর কিছু টাকা শুধু দিয়ে গেলাম—এবার তুই যা করার কর।’
বাবার কথা সে মন দিয়ে শুনে বলেছিল, ‘আমি দুঃখ পেয়েছি এমন ধারণা তোমার হল কী করে? তুমি তো আমায় সেরা জিনিসই দিয়েছ! গ্রাম তো আমার ভালোই লাগে।’ কিন্তু সে চাষ করতে গ্রামে যায়নি, তখন তার সদ্য বিয়ে হয়েছে। বউকে কলকাতায় রেখে গোকুলানন্দে গিয়ে বাস না করে বাড়ির বাগানের জমিতে স্টিলের অফিস—সরঞ্জাম তৈরির কারখানা খোলে। তবে বছরে দু—তিনবার সে গোকুলানন্দে যেত, যদি বিশেষ দরকার পড়ত। যুক্তফ্রন্ট আমলে চাষিরা যখন জমি দখলের লড়াই শুরু করে, বড়ো বড়ো রায়তদের সঙ্গে তখন শ্রীগোপাল ছুটে এসেছিল কলকাতায়।
‘রোঘো, তোর জমি আর বোধহয় বাঁচানো যাবে না। রাইহাটায় চাটুজ্যেদের জমিতে চারটে লাশ পড়েছে, আটকাতে পারেনি, জমিতে লালঝান্ডা পুঁতে দিয়েছে। কালোসোনায় দু—বার ধান কাটতে এসেছিল, মল্লিকরা কলকাতা থেকে গুন্ডা আর বন্দুক এনে হটিয়েছে, দুটো লাশ পড়েছে, জানি না শেষ পর্যন্ত কী হবে। শয়ে শয়ে মানুষ, বড়োজোর দু—তিন দিন আটকাতে পারব, তারপর?’
‘আমার তো আর দুশো কিংবা তিনশো বিঘে নয়, তাহলে আমার জমি নেবে কেন?
‘বারো বছর আগে কংগ্রেস সরকার ভূমিসংস্কার করে পঁচাত্তর বিঘের যে সিলিং বেঁধে দিয়েছিল, তার থেকে তো তোর চোদ্দ—পনেরো বিঘে বেশি রয়েছে। বাড়তি সেই জমিতো আজও চাষিরা পায়নি। এখন যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমল, এবার তো আর ছাড়ানছুড়িন নেই।’
‘তুই তো একটা কৃষক নেতা, কিছু একটা ব্যবস্থা কর।’
‘আমি! …তুই বলিস কী?’ শ্রীগোপালের দাঁতদুটো আরও বেরিয়ে আসে। ‘আমার লাশ পড়ুক, তুই কি চাস?’ ওর অবাক চাহনি ঘিরে রেখেছিল ভয়। উপরের ঠোঁট ধীরে ধীরে নেমে এসেছিল বেরিয়ে থাকা দাঁতদুটোর উপর। ‘জমির মালিক অথচ জমিতে কখনো যাস না। আমি শালা ওখানে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে মুখে রক্ত তুলে চাষ করাবো আর ধান বেচার, পুকর—আমবাগান জমা দেওয়ার টাকা বাড়ি বয়ে তোকে দিয়ে যাব, কি না দুটো টাকা আর থাকার একটা ঘর তোরা আমাকে দিচ্ছিস বলে?…যা, এবার গোকুলানন্দে গিয়ে জমি সামলা। …এই যে ছুটে এসে খবর দিলুম, এটা করাও আমার উচিত হয়নি।’
তাদের কথা হচ্ছিল বৈঠকখানার সামনে সদর ঘরে। শ্রীগোপাল চেয়ারে হেলান দিয়ে মুখ উপরে তুলে চোখ বন্ধ করে গভীর চিন্তায় ডুবে গেছিল আর সে চুলের মধ্যে আঙুল চালাচ্ছিল ওর মুখের দিকে তাকিয়ে।
‘আমি কি তাহলে গোকুলানন্দে যাব?’
‘একদম নয়…তোর সেফটির দায়িত্ব আমি নিতে পারব না।’
‘তাহলে?…জমি কি হাতছাড়া হয়ে যাবে?’
‘বাবা সারাজীবনটাই তোদের জন্য দিয়ে গেল…কী পেল?
আমাকে দয়া করে তোরা রাখলি, খেতে পরতে দিলি, স্কুলেও পড়ালি, কিন্তু কলেজে পড়তে দিলি না।’ আপনমনে শ্রীগোপাল বিড়বিড় করেছিল।
‘পড়াশুনো তোর লাইন নয় বলেই বাবা পড়ায়নি।’
‘তোর লাইনও কি ছিল? পড়ে কী হয়েছিস তুই? চেহারা দেখিয়ে, বাইক ফটফটিয়ে চলা ছাড়া আর কী পেয়েছিস?’
সে মাথা নীচু করে শ্রীগোপালের চোখ থেকে চোখ সরিয়ে রাখে। দুজনের কেউ অনেকক্ষণ কথা বলেনি।
‘একটা যাহোক ব্যবস্থা কর…তুই—ই পারবি।’ টেবিলে ঝুঁকে একটা হাত বাড়িয়ে সে শ্রীগোপালের হাত ছোঁয়ার চেষ্টা করে। হাতটার দিকে অদ্ভুতভাবে তার লম্বা মুখটা কুঁচকিয়ে সে তাকিয়ে ছিল।
‘তুই—ই আমাকে করাপ্ট করবি।’ কথাটা বলেই শ্রীগোপাল চেয়ার থেকে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে পড়ে। আর একটি কথাও না বলে দ্রুত পায়ে সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়। সে ওর পিছনে নাম ধরে ডাকতে ডাকতে ফটক পর্যন্ত ছুটে গেছিল। শ্রীগোপাল পিছু ফিরে তাকায়নি, হনহনিয়ে কচুবাগান বস্তির দিকে সে চলে গেল। তখন একবার মনে পড়েছিল, কয়েক বছর আগে বলা কথাটা : ‘ঘোড়ামুখো তুই আমাকে নষ্ট করলি!’
